যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিনকার্ডের জন্য অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে ‘পাবলিক চার্জ’ বা সরকারি সুবিধার ওপর সম্ভাব্য নির্ভরতা নির্ধারণে নতুন নিয়ম কার্যকর হতে যাচ্ছে। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন পাবলিক চার্জ ফাইনাল রুল কার্যকর হবে। এর মাধ্যমে কোন পরিস্থিতিতে একজন আবেদনকারীকে পাবলিক চার্জ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে, সরকারি সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে এবং কোন কোন অভিবাসী এ নিয়ম থেকে অব্যাহতি পাবেন, সে বিষয়ে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
১৬ জুলাই ২০২৬ ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বা ডিএইচএস ২০২২ সালের বাইডেন প্রশাসনের পাবলিক চার্জ-সংক্রান্ত বিধিমালা বাতিল করে নতুন ফাইনাল রুল ঘোষণা করে। ২০ জুলাই এটি ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত হয় এবং ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। ইউএসসিআইএসের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন নীতিমালার উদ্দেশ্য হলো অভিবাসীদের আত্মনির্ভরশীল থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা এবং করদাতাদের অর্থে পরিচালিত নির্দিষ্ট সরকারি সুবিধার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো। তবে কোনো আবেদনকারী একটি সরকারি সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলেই তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাবলিক চার্জ হিসেবে গণ্য করা হবে না। প্রতিটি আবেদনকারীর সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পৃথকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নতুন নির্দেশনায় ‘টোটালিটি অব দ্য সারকামস্ট্যান্সেস’ বা সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউএসসিআইএস কর্মকর্তারা আবেদনকারীর বয়স, স্বাস্থ্য, পারিবারিক অবস্থা, সম্পদ ও আর্থিক সক্ষমতা, শিক্ষা ও দক্ষতাসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করবেন। পাশাপাশি কোনো ব্যক্তির পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক অন্য তথ্য থাকলে সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। সরকারি সুবিধা গ্রহণের ইতিহাসও নতুন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর মধ্যে আয়-নির্ভর নগদ সহায়তা, আবাসন সহায়তা, খাদ্য সহায়তা বা ফুড স্ট্যাম্প এবং একই ধরনের অন্যান্য ‘মিনস-টেস্টেড পাবলিক বেনিফিট’ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে সুবিধা গ্রহণের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ।
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর আগে কোনো আবেদনকারী মিনস-টেস্টেড পাবলিক বেনিফিট গ্রহণ করে থাকলে ইউএসসিআইএস মূলত আয় বজায় রাখার জন্য সরকারি নগদ সহায়তা এবং সরকারের অর্থায়নে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যার মতো নির্দিষ্ট সুবিধা বিবেচনা করবে। কিন্তু ১৮ সেপ্টেম্বর বা তার পরে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর কোনো সুবিধা গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট সব প্রাসঙ্গিক সরকারি সুবিধার বিষয় কর্মকর্তারা বিবেচনা করতে পারবেন। তবে কোনো সরকারি সুবিধা গ্রহণ করলেই গ্রিনকার্ডের আবেদন বাতিল হয়ে যাবে এমন নয়। কর্মকর্তারা আবেদনকারীর বয়স, স্বাস্থ্য, পরিবার, আর্থিক অবস্থা, শিক্ষা, দক্ষতা এবং সরকারি সুবিধা গ্রহণের ইতিহাসসহ সব তথ্য একসঙ্গে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। অর্থাৎ একটি মাত্র বিষয়কে কেন্দ্র করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাবলিক চার্জ ঘোষণা করার কথা বলা হয়নি।
আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ফর্ম আই-৮৬৪ ‘অ্যাফিডেভিট অব সাপোর্ট’ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এই ফর্মের মাধ্যমে একজন স্পন্সর বা আর্থিক সহায়তাকারী আবেদনকারীকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেওয়ার দায়িত্ব নেন। ফলে আবেদনকারীর নিজের আর্থিক পরিস্থিতির পাশাপাশি স্পন্সরের দায়িত্ব ও সক্ষমতাও মূল্যায়নের অংশ হতে পারে। সাধারণভাবে অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাসের মাধ্যমে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা বা গ্রিনকার্ডের জন্য আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে পাবলিক চার্জ গ্রাউন্ড অব ইনঅ্যাডমিসিবিলিটি প্রযোজ্য হতে পারে, যদি তাদের অভিবাসন ক্যাটাগরি আইনের আওতায় অব্যাহতি না পায়। এর মধ্যে বিভিন্ন পারিবারিক ও কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসন ক্যাটাগরি রয়েছে। ফলে শুধু পারিবারিক সম্পর্ক বা চাকরিভিত্তিক অভিবাসন আবেদন হলেই পাবলিক চার্জ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছাড় পাওয়া যাবে, এমন নয়।
অন্যদিকে আইনে নির্দিষ্ট কিছু অভিবাসী ও আবেদনকারীকে পাবলিক চার্জের ভিত্তিতে অযোগ্যতার নিয়ম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট অ্যাসাইলি, রিফিউজি, বিশেষ অভিবাসী, মানবপাচার বা নির্দিষ্ট অপরাধের শিকার কিছু নন-ইমিগ্র্যান্ট, ভিএডব্লিউএর অধীনে আবেদনকারী এবং আইন দ্বারা নির্ধারিত আরও কয়েকটি বিশেষ শ্রেণি। টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস বা টিপিএস, নির্দিষ্ট সরকারি কর্মী ও তাদের পরিবার এবং কিছু বিশেষ মানবিক বা ঐতিহাসিক আইনি ব্যবস্থার আওতাভুক্ত আবেদনকারীরাও নির্দিষ্ট শর্তে অব্যাহতি পেতে পারেন। তবে কোনো ব্যক্তি অব্যাহতির আওতায় পড়ছেন কি না, তা তার অভিবাসন ক্যাটাগরি ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
নতুন নিয়মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পাবলিক চার্জ বন্ড। কোনো ইউএসসিআইএস কর্মকর্তা যদি মনে করেন, একজন আবেদনকারী শুধু পাবলিক চার্জ হওয়ার সম্ভাবনার কারণে অযোগ্য হতে পারেন, তাহলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তাকে বন্ড দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এই বন্ড মূলত একটি আর্থিক নিশ্চয়তা, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সরকারি সুবিধার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়ার বিষয়ে আর্থিক গ্যারান্টি দেওয়া হয়। তবে যে কেউ ইচ্ছা করলেই পাবলিক চার্জ বন্ডের সুবিধা নিতে পারবেন না। ইউএসসিআইএস কর্মকর্তা আবেদনকারীকে বন্ড দেওয়ার সুযোগ দিলে এবং এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠালেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বন্ড জমা দিতে পারবেন। নগদ বন্ড অথবা অনুমোদিত সিউরিটি কোম্পানির মাধ্যমে সিউরিটি বন্ড দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে পারে।
বন্ডের পরিমাণও সবার জন্য একই নির্দিষ্ট অঙ্ক হবে না। ইউএসসিআইএস আগামী পাঁচ বছরে আবেদনকারী কত পরিমাণ সরকারি সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন এবং সম্ভাব্যভাবে কতটা সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন, তা বিবেচনা করে বন্ডের পরিমাণ নির্ধারণ করবে। এ ক্ষেত্রে ফর্ম আই-৯৪৫ ব্যবহার করা হবে। তবে ইউএসসিআইএস থেকে আমন্ত্রণ বা সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত আবেদনকারী নিজে থেকে আই-৯৪৫ জমা দিতে পারবেন না। নতুন পাবলিক চার্জ নির্দেশনা ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বা তার পরে পোস্টমার্ক করা কিংবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিকভাবে জমা দেওয়া সেই সব ফর্ম আই-৪৮৫-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যেগুলো পাবলিক চার্জ গ্রাউন্ড অব ইনঅ্যাডমিসিবিলিটির আওতাভুক্ত। একই সময় থেকে নতুন নির্দেশনা আগের সংশ্লিষ্ট পাবলিক চার্জ গাইডেন্সগুলোকে প্রতিস্থাপন করবে।
নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার কারণে যারা ১৮ সেপ্টেম্বর বা তার পরে অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাসের আবেদন করবেন, তাদের আর্থিক অবস্থা, বয়স, স্বাস্থ্য, পারিবারিক পরিস্থিতি, শিক্ষা ও দক্ষতা এবং সরকারি সুবিধা গ্রহণের ইতিহাস আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। তবে ইউএসসিআইএস বলছে, কোনো একটি বিষয় দেখেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হবে না; সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আবেদনকারীদের তাই নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগে নিজেদের অভিবাসন ক্যাটাগরি, আর্থিক পরিস্থিতি এবং সরকারি সুবিধা গ্রহণের ইতিহাস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে, ১৮ সেপ্টেম্বর বা তার পরে ফর্ম আই-৪৮৫ জমা দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে নতুন পাবলিক চার্জ নির্দেশনার পাশাপাশি আই-৪৮৫-এর নতুন ০৯/১৮/২৬ সংস্করণ ব্যবহার করতে হবে। ভুল সংস্করণের ফর্ম ব্যবহার করলে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, পাবলিক চার্জের প্রভাব ব্যক্তি ও আবেদনভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই আবেদন জমা দেওয়ার আগে ইউএসসিআইএসের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে যোগ্য অভিবাসন আইনজীবী বা অনুমোদিত প্রতিনিধির পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নিয়মে ব্যক্তিগত পরিস্থিতির সামগ্রিক মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও আবেদনকারীদের জন্য সঠিক তথ্য ও যথাযথ প্রস্তুতি এখন আগের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মন্তব্য করুন