ইকবাল ফেরদৌস
২ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৪০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

শৈশবের ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে বঙ্গভবনের অলিন্দ-ˆতমুর হোসেন বিপুলের দীর্ঘ অভিযাত্রা

রাজনীতির মঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মানুষদের কথা ইতিহাস সহজেই মনে রাখে। কিন্তু এমনও কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে নীরবে রেখে যান গভীর ছাপ। তৈমুর হোসেন বিপুল তেমনই এক ব্যক্তিত্ব। ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি, বিরোধীদলীয় নেতার কার্যালয় থেকে বঙ্গভবন, রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসা, সংস্কৃতিচর্চা ও সমাজসেবায় সক্রিয় সম্পৃক্ততা-তাঁর দীর্ঘ পথচলা যেন দায়িত্ব, আদর্শ ও মানবিকতার এক অনন্য উপাখ্যান।

 

সম্প্রতি বাংলা সংবাদের কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাতে এসে সম্পাদক ইকবাল ফেরদৌসের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় তিনি তুলে ধরেন জীবনের নানা অধ্যায়। স্মৃতিচারণের পাশাপাশি বর্তমান রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা, তরুণ প্রজন্ম, সংস্কৃতি, নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে অকপটে কথা বলেন তিনি। পুরো আলাপচারিতাজুড়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয়েছে, তা হলো-ক্ষমতার চেয়ে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতি তাঁর গভীর বিশ্বাস।

 

আলাপের একপর্যায়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় কী? কোনো দ্বিধা ছাড়াই তিনি উত্তর দেন, “মানুষের ভালোবাসা। এর চেয়ে বড় পরিচয় আমার জীবনে আর কিছু নেই।” তাঁর দীর্ঘ জীবনের দর্শন যেন এই একটি বাক্যেই সংক্ষেপে ধরা পড়ে।

 

তৈমুর হোসেন বিপুলের জন্ম কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে হলেও তাঁর বেড়ে ওঠা সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালে পরিবারের সঙ্গে চলে আসেন ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা এলাকায়। সে সময়ের ফেঞ্চুগঞ্জ ছিল দেশের অন্যতম পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের সহাবস্থান ছিল একটি অনন্য অভিজ্ঞতা।

 

বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে উদার করেছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, মানুষকে কখনো অঞ্চল বা পরিচয়ে নয়, মানুষ হিসেবেই দেখার শিক্ষা তিনি শৈশবেই পেয়েছেন। এই শিক্ষা পরবর্তী জীবনে রাজনীতি ও সমাজসেবার ক্ষেত্রেও তাঁকে প্রভাবিত করেছে।

 

পারিবারিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ততার কথাও উঠে আসে আলাপচারিতায়। তিনি জানান, তাঁদের পরিবারে ২৮ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ফলে দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা তাঁর কাছে বইয়ের পাতা থেকে নয়, পারিবারিক পরিবেশ থেকেই অর্জিত।

 

তিনি মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয় বরং এটি একটি জাতির নৈতিক ভিত্তি। সেই চেতনা ধারণ করেই একটি উন্নত, মানবিক ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

 

ফেঞ্চুগঞ্জে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে তিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজে ভর্তি হন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক হিস্ট্রি বিভাগে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনেই জাতীয়তাবাদী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি এবং পরে সিলেট জেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

 

ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, সুস্থ ছাত্ররাজনীতি নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, সংগঠন পরিচালনা এবং মতের ভিন্নতাকে সম্মান করার শিক্ষা দেয়। তাঁর মতে, সমস্যাটি রাজনীতিতে নয়, বরং রাজনীতির অপব্যবহারে।

 

 

তৈমুর হোসেন বিপুলের কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করার অভিজ্ঞতা। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর তাঁর সঙ্গে পরিচয়, যা পরবর্তীতে আস্থার সম্পর্কে পরিণত হয়।

 

১৯৯৮ সালে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিরোধীদলীয় নেতা থাকাকালে তিনি সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। পরে ২০০১ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বঙ্গভবনেও তাঁর সঙ্গে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান।

 

রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি শুধু প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নয় বরং রাষ্ট্র পরিচালনা, কূটনীতি, প্রোটোকল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জটিলতা খুব কাছ থেকে দেখার একটি বিরল সুযোগ ছিল। তাঁর মতে, রাষ্ট্র পরিচালনা বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা অনেক বেশি দায়িত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক।

 

ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর প্রসঙ্গ উঠলে তাঁর কণ্ঠে আবেগের ছোঁয়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবেই বদরুদ্দোজা চৌধুরী তাঁকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছেন।

 

তাঁর সৌম্য ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, বইপড়ার অভ্যাস এবং মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপির প্রথম মহাসচিব হিসেবে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর অবদান আরও গভীর গবেষণা ও যথাযথ মূল্যায়নের দাবি রাখে।

 

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তৈমুর হোসেন বিপুল বলেন, সময়ের সঙ্গে রাজনীতির ভাষা ও নেতৃত্ব বদলায়, কিন্তু সততা, জবাবদিহি, জনকল্যাণ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কখনো পরিবর্তিত হয় না।

 

তাঁর মতে, রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা। আজকের মানুষ শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান কাজ দেখতে চায়। রাজনৈতিক দলগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের আস্থা অর্জন ও ধরে রাখা।

 

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হলেও মতের ভিন্নতা যেন বিভাজনের কারণ না হয়। রাষ্ট্র, সংবিধান ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সব রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য থাকা প্রয়োজন।

 

বর্তমান প্রজন্মের প্রতি তাঁর বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, শুধু উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেই চলবে না বরং একজন ভালো মানুষ হিসেবেও নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। দেশপ্রেম, সততা, নৈতিকতা, সংস্কৃতিচর্চা এবং আধুনিক জ্ঞান-এই পাঁচটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

 

তাঁর মতে, ইতিহাস জানতে হবে, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, প্রযুক্তিকে সৃজনশীল কাজে ব্যবহার করতে হবে এবং বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। একই সঙ্গে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

 

তাঁর ভাষায়, “সফল মানুষ হওয়ার আগে ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কারণ মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসাই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন।”

 

দীর্ঘ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আজও আশাবাদী তৈমুর হোসেন বিপুল। তাঁর বিশ্বাস, ইতিহাস, শিক্ষা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের সমন্বয়ে নতুন প্রজন্মই বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ, আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারবে।

 

আলাপের শেষ প্রান্তে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, নতুন প্রজন্মের জন্য একটি বাক্যে কী বার্তা দিতে চান?

 

কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি বলেছিলেন-

“নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলুন, যাতে আপনার পরিবার আপনাকে নিয়ে গর্ব করে, সমাজ আপনাকে বিশ্বাস করে এবং দেশ আপনার অবদানে উপকৃত হয়।”

 

এই একটি বাক্যই যেন তাঁর সমগ্র জীবনদর্শনের সারাংশ। শৈশবের ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে বঙ্গভবনের অলিন্দ, সেখান থেকে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়ার যে দীর্ঘ যাত্রা-সেখানে মানুষের জয়গানই মুখ্য।

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ব্রাজিলের তিন বোনের সম্মিলিত বয়স ৩১৬ বছর, দীর্ঘায়ুর রহস্য নিয়ে চলছে গবেষণা

৯৩ বছর বয়সেও ট্রাক চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি

৮৪ বছর বয়সে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন মিশরীয় নারীর

৯৬ বছর বয়সে ইনফ্লুয়েন্সার, গড়লেন বিশ্ব রেকর্ড

শৈশবের ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে বঙ্গভবনের অলিন্দ-ˆতমুর হোসেন বিপুলের দীর্ঘ অভিযাত্রা

যে নফল নামাজ জীবনে একবার হলেও পড়তে বলেছেন মহানবী (সা.)

বিশ্বনবীর (সা.) চোখে ১২ শ্রেষ্ঠ মানুষ

যে ৬ বিশেষ কারণে মুহাম্মদ (সা.) অন্য নবীদের চেয়ে আলাদা

বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ‘শাড়ি’ প্রতিপাদ্যে নিউইয়র্কে রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলা

সভাপতি শাহীন, সাধারণ সম্পাদক নাছির অ্যাসাল লংআইল্যান্ড চ্যাপ্টারের অভিষেক ও বারবিকিউ আয়োজন

১০

‘রাজাকার’ লেখা ব্যক্তিগত গাড়ির নম্বরপ্লেট ঘিরে আলোচনা

১১

স্থায়ী হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড নীতি, সর্বোচ্চ জামানত ২০ হাজার ডলার

১২

প্রবাসে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারে মিশিগান বিএনপির মতবিনিময় সভা

১৩

বিদেশি গ্র্যাজুয়েটদের চাকরিতে ১ লাখ ডলার ফি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র

১৪

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পুলিশ কর্মকর্তা দিদারুল ইসলামের নামে সড়ক

১৫

সাংবাদিকদের সঙ্গে মতিউর রহমান চৌধুরীর মতবিনিময় ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিকতাই সংকট উত্তরণের পথ: মতিউর রহমান চৌধুরী

১৬

আমাদের সচেতনতা সময়ের দাবি

১৭

পরাশক্তির শক্তি বনাম দুর্বল রাষ্ট্রের কৌশল: যুক্তরাষ্ট্র – ইরান সংঘাতের নতুন পাঠ

১৮

১৫ আগস্ট: যে শোক আজও জাতির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়

১৯

নিউইয়র্কে মেয়র মামদানির ঘোষণা সিটি পরিচালিত মুদি দোকানে নিত্যপণ্যে ৩০% ছাড়!

২০