বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁদের জীবন ও সাহিত্য একে অপরের পরিপূরক। তাঁদের মধ্যে অন্যতম মার্কিন সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। সাহস, প্রেম, যুদ্ধ, অভিযান এবং মানুষের অন্তর্গত সংগ্রামকে যিনি অনন্য ভাষাশৈলীতে রূপ দিয়েছেন সাহিত্যে। জন্মের ১২৭ বছর পরও তাঁর সাহিত্যকর্ম যেমন পাঠককে মুগ্ধ করে, তেমনি তাঁর জীবন ও মৃত্যুর রহস্যও গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
১৮৯৯ সালের ২১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ওক পার্কে জন্মগ্রহণ করেন আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে। তাঁর বাবা ক্লেরেন্স অ্যাডমন্ডস হেমিংওয়ে ছিলেন চিকিৎসক এবং মা গ্রেস হল হেমিংওয়ে ছিলেন একজন অপেরা শিল্পী। শৈশবেই প্রকৃতি, শিকার এবং মাছ ধরার প্রতি গভীর আকর্ষণ তৈরি হয় তাঁর। মিশিগানের বন-জঙ্গল ও হ্রদঘেরা পরিবেশে বাবার কাছ থেকেই তিনি শিখেছিলেন শিকার ও মাছ ধরার কৌশল, যা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যকর্মে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
হেমিংওয়ের কর্মজীবনের সূচনা সাংবাদিকতা দিয়ে। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর তিনি ‘দ্য কানসাস সিটি স্টার’ পত্রিকায় প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেন। এই পত্রিকার সংক্ষিপ্ত, সরল ও তথ্যনির্ভর লেখার নীতিই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যিক ভাষার ভিত্তি গড়ে দেয়। তাঁর বিখ্যাত ‘আইসবার্গ থিওরি’ বা ‘হিমশৈল তত্ত্ব’-এর মূল ধারণা ছিল- লেখার দৃশ্যমান অংশের চেয়ে অদৃশ্য অংশ অনেক বেশি শক্তিশালী।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯১৮ সালে তিনি ইতালিতে রেডক্রসের অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে কাজ করতে যান। যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুতর আহত হলেও আহত সৈনিকদের উদ্ধারে অসাধারণ সাহসিকতা প্রদর্শন করেন। এ জন্য ইতালীয় সরকার তাঁকে ‘সিলভার মেডেল অব ব্রেভারি’ প্রদান করে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক নার্সের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যদিও তা শেষ পর্যন্ত পরিণতি পায়নি। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’-এর অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
বিশের দশকে প্যারিসে অবস্থানকালে তাঁর সাহিত্যজীবনের প্রকৃত উন্মেষ ঘটে। সে সময় তাঁর সান্নিধ্যে এসেছিলেন সাহিত্য ও শিল্পজগতের কিংবদন্তিরা- জেমস জয়েস, এফ. স্কট ফিটজেরাল্ড এবং পাবলো পিকাসোর মতো ব্যক্তিত্ব। প্যারিসের সাহিত্যিক পরিবেশ তাঁকে নতুনভাবে চিনতে শেখায় মানুষ, সমাজ ও ইতিহাসকে।
হেমিংওয়ের সাহিত্যজীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’, ‘এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’, ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’ এবং ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’। বিশেষ করে ১৯৫২ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের শীর্ষ আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। কিউবার এক বৃদ্ধ জেলে সান্তিয়াগোর সংগ্রামের গল্পে তিনি তুলে ধরেছেন মানুষের অদম্য মনোবল ও আত্মমর্যাদার জয়গান। উপন্যাসটি তাঁকে এনে দেয় পুলিৎজার পুরস্কার এবং পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভের পথ সুগম করে।
সাহিত্যের পাশাপাশি হেমিংওয়ের জীবনও ছিল রোমাঞ্চে ভরপুর। যুদ্ধক্ষেত্র, ষাঁড়ের লড়াই, গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার, আফ্রিকার সাফারি সবকিছুই তাঁকে টেনেছিল প্রবলভাবে। আফ্রিকা সফরের সময় পরপর দুটি বিমান দুর্ঘটনায় প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন তিনি। জীবনের শেষভাগে কিউবায় দীর্ঘদিন বসবাস করলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহো অঙ্গরাজ্যের কেচামে ফিরে যান।
কিন্তু বাহ্যিক সাফল্যের আড়ালে হেমিংওয়ের ব্যক্তিগত জীবন ছিল গভীর অস্থিরতায় পূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। পরিবারে আত্মহত্যার ইতিহাসও ছিল। তাঁর বাবা, ভাই এবং এক বোন আত্মহত্যা করেছিলেন। গবেষকদের মতে, বংশগত মানসিক রোগ, সৃষ্টিশীলতা হারানোর ভয়, শারীরিক অসুস্থতা এবং মানসিক অবসাদ তাঁকে ক্রমশ একাকী করে তোলে।
হেমিংওয়ের আত্মহত্যা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও জীবনীকার অ্যারন এডওয়ার্ড হোচনারের মতে, হেমিংওয়ে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে তিনি আর আগের মতো লিখতে পারছেন না। একজন লেখকের জন্য এটি ছিল তাঁর অস্তিত্বের সংকট। অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত এফবিআইয়ের নথিপত্র থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন তাঁকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা নজরদারিতে রেখেছিল। তাঁর ফোনে আড়ি পাতা হতো, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র পর্যবেক্ষণ করা হতো। ফলে তাঁর মধ্যে ভয় ও সন্দেহ আরও বেড়ে যায়।
১৯৬১ সালের ২ জুলাই, মাত্র ৬১ বছর বয়সে, নিজ বাড়িতে শটগান দিয়ে আত্মহত্যা করেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। তাঁর মৃত্যু বিশ্বসাহিত্যের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে আসে। তবে মৃত্যুর পরও তাঁর সাহিত্যিক প্রভাব বিন্দুমাত্র কমেনি।
জুলাই মাসেই তিনি পৃথিবীতে আসেন এবং এই মাসেই চলে যান, নোবেলজয়ী অনন্য এই সাহিত্যিকের আগমনকে স্মরণ করি কেননা তিনি যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, প্রেমের বেদনা, মানুষের সংগ্রাম এবং জীবনের গভীর সত্যকে সাহিত্যের ভাষায় অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে প্রমাণ করে গেছেন একজন লেখক মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্টির ভেতর, তাঁর শব্দের ভেতর, তাঁর পাঠকের হৃদয়ে।
মন্তব্য করুন