বাংলা সংবাদ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৭ জানুয়ারী ২০২৬, ৯:৪২ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

গাজা ও ইউক্রেনের পর ভেনেজুয়েলা: যেসব কারণে জাতিসংঘ ‘পক্ষাঘাতগ্রস্ত’

জাতিসংঘ গত বছরের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠার ৮০ বছর পূর্ণ করেছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকাটা যে কোনো সংস্থার জন্য নিশ্চয়ই সম্মানের। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এর অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ঘটনাগুলোর মধ্যে আছে– ইউক্রেনে রাশিয়ার অবৈধ আগ্রাসন, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের হামলায় মানবিক বিপর্যয় এবং সবশেষ ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের বলপ্রয়োগ।

 

 

আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু গাজা, ইউক্রেন ও ভেনেজুয়েলার প্রেক্ষাপট প্রশ্ন তুলেছে, সংস্থাটির আদৌ কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে? এটি কি পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে? এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তরে পৌঁছানোর আগে তাকাতে হবে কাঠামোগত ত্রুটির দিকে, যা জাতিসংঘকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করেছে।

 

 

নিরাপত্তা পরিষদ

বলা হয়, নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘের মূল অঙ্গ হলো নিরাপত্তা পরিষদ। সংস্থাটির সনদ অনুযায়ী, কোথাও সামরিক অভিযান চালাতে হলে অবশ্যই নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন লাগবে। অভিযানের উদ্দেশ্য হতে হবে আত্মরক্ষার। পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় হস্তক্ষেপ না করা পর্যন্ত আত্মরক্ষার অধিকার বৈধ।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ গঠিত ১৫টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে। পাঁচটি স্থায়ী সদস্যকে (চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র) পি-৫ বলা হয়। দুই বছরের মেয়াদে নির্বাচিত হয় ১০টি অস্থায়ী সদস্য। পরিষদে কোনো প্রস্তাব গৃহীত হতে হলে কমপক্ষে ৯টি সমর্থনসূচক ভোট প্রয়োজন এবং স্থায়ী সদস্যদের কারও ভেটো থাকা চলবে না। এমন নিয়মের কারণে শান্তি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ থাকে পি-৫-এর হাতে।  এই কাঠামোটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল ইচ্ছাকৃতভাবে, যাতে পরাশক্তির (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘বিজয়ী’ দেশগুলো) বিরুদ্ধে জাতিসংঘ ব্যবস্থা নিতে না পারে। এর আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল, পরাশক্তিগুলোর উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ভারসাম্য বজায় রাখা। কিন্তু এই ভারসাম্য কেবল তখনই কার্যকর থাকে, যখন পি-৫ দেশগুলো নিজেরা নিয়মকানুন মেনে চলে। তাই স্থায়ী সদস্যরা নিয়ম ভাঙলে প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসংঘের নিন্দা জানানো ছাড়া কিছু করার থাকে না।

 

 

ভেটো ব্যবস্থার কি সংস্কার সম্ভব

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন যতই গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হোক না কেন, ভেটোর ক্ষমতা নিরাপত্তা পরিষদকে অকার্যকর করে দিতে পারে। এ কারণে ভেটো ব্যবস্থার প্রয়োগ নিয়ে প্রায়ই সমালোচনা হয়। কোনো সদস্য রাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থে ভেটো দিলে অন্যরা কেবল এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে আপত্তি তুলতে পারে, বৈধতা নিয়ে নয়। কারণ, জাতিসংঘ সনদে ভেটো ব্যবহার নিয়ে কোনো আইনি সীমা আরোপ করা হয়নি। এখানেই জাতিসংঘ ব্যবস্থার অন্যতম বড় এবং ইচ্ছাকৃত ত্রুটি নিহিত।

 

 

জাতিসংঘ সনদ পি-৫ ভুক্ত দেশগুলোকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে। তারা যে কোনো নিয়ম সংস্কারের চেষ্টার বিরুদ্ধেও ভেটো দিতে পারবে। এ অবস্থায় কেবল তাত্ত্বিকভাবে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ব্যবস্থা সংস্কার করা সম্ভব। সনদের ১০৮ ও ১০৯ অনুচ্ছেদে সে সুযোগ আছে। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব। একমাত্র বিকল্প হলো, বর্তমান সনদ বাতিল করে নতুন সনদের অধীনে জাতিসংঘকে ভেঙে পুনর্গঠন করা। তবে সেটির জন্য যে মাত্রার বৈশ্বিক ঐক্য দরকার, তা এই মুহূর্তে নেই। বরং পি-৫ ভুক্ত এক বা একাধিক দেশ তাদের ভেটো ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কায় যে কোনো সংস্কার বা পুনর্গঠনের উদ্যোগ আটকে দিতে পারে। এ সম্ভাবনাটাই বেশি।

 

 

একটি অস্বস্তিকর সত্য

মোট কথা হলো, পি-৫ ভুক্ত কোনো দেশ নিজেই যখন আগ্রাসন চালায়, তখন নিরাপত্তা পরিষদ হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এ কারণে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে জাতিসংঘকে ব্যর্থ মনে হতে পারে। এই ব্যর্থতা মূলত সংস্থাটির গঠনতন্ত্রের কারণে বেশি দেখা যাচ্ছে।  শুধু নিরাপত্তা পরিষদের দিকে তাকালে জাতিসংঘের অন্য ভূমিকাগুলোর প্রতি অবিচার করা হবে। পরাশক্তিগুলোর সংঘাতে সংস্থাটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হলেও একেবারে শূন্য বা ফাঁপা প্রতিষ্ঠান নয়।

 

 

অন্য ভূমিকাগুলোর মধ্যে আছে– শান্তিরক্ষা ও রাজনৈতিক মিশনগুলোকে সহায়তা দেওয়া, আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন, মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সে বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি, মানবিক ত্রাণ সমন্বয়, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাসহ আরও অনেক কিছু। বিশেষ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ এমন কাজ করে, যা একক রাষ্ট্রের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এই কাজগুলোর কোনোটির জন্যই নিরাপত্তা পরিষদের সরাসরি সম্পৃক্ততা দরকার হয় না। সবগুলোই হয় জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো মেনে (নিরাপত্তা পরিষদ এই কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য)।

 

 

অস্বস্তিকর সত্যটি হলো, জাতিসংঘের টিকে থাকা অনেকটা মন্দের ভালোর মতো। তারা সবকিছু নিখুঁতভাবে করে বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু সংস্থাটি হারিয়ে গেলে হয়তো পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এ অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যাতে জবাবদিহির বাইরে যেতে না পারে সে ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশের প্রকাশ্য ভণ্ডামির কারণে জাতিসংঘকে একেবারে ছুড়ে ফেলা উচিত নয়।

 

 

(গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধের প্ল্যাটফর্ম ‘দ্য কনভারসেশনে’ লেখাটি প্রকাশ হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। যৌথভাবে লিখেছেন, অস্ট্রেলিয়ার ডেকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ল’ স্কুলের সহযোগী অধ্যাপক ট্যামসিন ফিলিপা পেইজ ও অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক জুলিয়েট ম্যাকইনটায়ার। ভাষান্তর: সাদিকুর রহমান)

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে গ্রিন কার্ড বাণিজ্য, নিউইয়র্কে ফেডারেল অভিযানে ১১ গ্রেপ্তার

তথ্য বিক্রিকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নতুন আইনি লড়াই

হোয়াইট হাউসে বড় রদবদল, প্রেস সেক্রেটারির পদ ছাড়ছেন লেভিট

নিউইয়র্কে ২০২৭ থেকে মেডিকেইডে নতুন শর্ত, ঝুঁকিতে যেসব সুবিধাভোগী

মিনেসোটার পঞ্চম আসনে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে বড় জয় ইলহান ওমরের

সব বিষয়ে এ+; রোদেলার চোখে এখন সাদা অ্যাপ্রনের স্বপ্ন

মিশিগানে বাংলা সংবাদ কার্যালয়ে সৈয়দ উতবার সৌজন্য সাক্ষাৎ

আবদুল এল-সায়েদ নির্বাচিত হলে নাতনিদের স্কুলে বোরকা পরে যেতে হবে: ন্যান্সি মেস

নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের নেতৃত্বে প্রথম সাউথ এশিয়ান ইউনিটি প্যারেড

অবশেষে বিয়ে করলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো

১০

২৩৮ মিলিয়ন ডলার লোকসান গুনল ট্রাম্পের মিডিয়া কোম্পানি

১১

শিশুদের টিকা নীতিতে ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগ নিয়ে চিকিৎসকদের উদ্বেগ

১২

যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা বাতিল করল ট্রাম্প প্রশাসন

১৩

মিশিগানে বাংলা প্রেস ক্লাবের ৫ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও ফ্যামিলি ডে উদযাপন

১৪

ইরানের হামলার আশঙ্কায় খাবারের কার্টে করে তুরস্ক ছাড়েন ট্রাম্প

১৫

মিশিগানে ১৫ আগস্ট শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী ফুলমুন ইসলামিক কালচারাল ফেস্টিভ্যাল

১৬

মিশিগানে আম-কাঁঠালি উৎসবে বাঙালির মিলনমেলা

১৭

মিশিগানে মুনার দাওয়াহ কনফারেন্স অনুষ্ঠিত অংশ নেন হাজারো মানুষ

১৮

৬১% মার্কিনি চান সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলোর ওপর বাড়ুক নজরদারি

১৯

হরমুজ খুলে দিলে এখন পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াই ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে রাজি ট্রাম্প

২০