
বাংলাদেশের ১৬৭টি চা-বাগানের শ্রমিকেরা ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে কাজে না গিয়ে নিজ নিজ এলাকায় সভা সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করছে। চা শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে দাঁড়াচ্ছে সম্প্রতি ঘুরে দাঁড়ানো চা শিল্প। ধর্মঘটের কারণে বাগানে চা-পাতা তোলা বন্ধ থাকায় চা উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে। চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৩০০ টাকা করার দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য এ ধর্মঘট পালন করছেন শ্রমিকেরা। মজুরি বৃদ্ধির জন্য বাগান মালিক কর্তৃপক্ষ, মজুরি বোর্ড, চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকের পরও দাবি পূরণ না হওয়ায় ধর্মঘট অব্যাহত আছে। বর্তমান সময়ে বাজারমূল্যের দিকে তাকালে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির এই দাবি একেবারেই যৌক্তিক। প্রতি দুই বছর পরপর চা-শ্রমিক ও বাগান কর্তৃপক্ষের মধ্যে মজুরি সংক্রান্ত চুক্তি নবায়নের রীতি আছে, যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মজুরি নির্ধারণে বাস্তবে একতরফাভাবে বাগান কর্তৃপক্ষই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তারপরও গত ১৯ মাস ধরে চা-শ্রমিকরা মজুরি চুক্তির বাইরে রয়েছে।
সম্প্রতি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস উঠায় চা-শ্রমিকেরা তাদের ন্যায্য দাবি পূরণের ব্যাপারে মালিকপক্ষকে সময়সীমা বেঁধে দেন। কিন্তু মালিকপক্ষ তাতে সাড়া দেয়নি। এরপর লাগাতার চার দিন দুই ঘণ্টা করে প্রত্যেক বাগানে কর্মবিরতি পালিত হয়েছে। তাতেও মালিকপক্ষ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তাই, বাধ্য হয়ে ধর্মঘটের ডাক দেয় চা শ্রমিকেরা। অথচ কিছুটা হুমকির সুরে এ বিষয়ে বাংলাদেশীয় চা-সংসদের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আন্দোলনে যাওয়ার কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু, শ্রমিকেরা যা করছেন, তা শ্রম আইনবিরোধী। এভাবে তাঁরা আন্দোলনে যেতে পারেন না। এতে চা-শিল্পের পাশাপাশি তাঁদেরও ক্ষতি হচ্ছে। মালিকপক্ষ বর্তমান মজুরির সঙ্গে আরও ১৪ টাকা যোগ করে মোট ১৩৪ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। শ্রমিকেরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন চা সংগ্রহের ভরা মৌসুম। চা-পাতা সময়মতো তোলা না গেলে মালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, সেইসাথে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সরকার। চা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে রপ্তানী হয়। দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে চা শ্রমিকরা। অথচ তাঁদের দিকে ফিরে তাকানোর তেমন কোন প্রয়োজনই অনুভব করছেন না কেউই। দৈনিক ১২০ টাকা মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিলো ২০১৯-২০ সময়ের জন্য বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন ও চা-বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চুক্তির ওপর ভিত্তি করে। এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বরে। করোনা অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে কোন আলোচনাই করছে না সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।
শ্রমআইন ২০০৬ অনুসারে, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘‘জীবন যাপন ব্যয়, জীবনযাপনের মান, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য, মুদ্রাস্ফীতি, কাজের ধরন, ঝুঁকি ও মান, ব্যবসায়িক সামর্থ, দেশের এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা’’ করার কথা বলা হলেও এই ব্যাপারে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য কোনো উপায় না থাকায় বরাবরই বিভিন্ন সংঘবদ্ধ শক্তির ক্ষমতার জোর ও অস্বচ্ছতার মধ্যদিয়ে বিভিন্ন সেক্টরের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ বা পুননির্ধারণ করা হয়। টি বোর্ডের প্রথম বাঙালি চেয়ারম্যান হিসেবে চা-শিল্প উন্নয়নে উদার নীতিমালা নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫৬ সালে চা-শ্রমিকদের হাত ধরে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের দুঃখের সব খবরই রাখি। এসব দুঃখ দূর করার জন্য আমরা খুবই চেষ্টা করব’।
চা-শিল্পের বিকাশে এবং চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর অবদান কখনও বিস্মৃত হওয়ার নয়। দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রাখা সত্ত্বেও চা বাগানে যুগ যুগ ধরে বসবাসরত অবহেলিত চা শ্রমিকদের কল্যাণার্থে বঙ্গবন্ধুর পর তেমন কোনো বৈপ্লবিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। অবিলম্বে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাপনের ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মালিক পক্ষ ও সরকারের উচিত শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়া এবং ধর্মঘটে বিরাট আর্থিক ক্ষতির মুখে দাঁড়ানো চা শিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা। চা পাতা সংগ্রহের এই ভরা মৌসুমে এমন আন্দোলন কখনই কাম্য নয় তারপরও শ্রমিকের পীঠ দেয়ালে ঠেকেছে বলে তাঁরা বাগান ফেলে রাস্তায় শ্লোগান দিচ্ছে। এমন ন্যায্য দাবি মালিক পক্ষের উচিত দ্রুত মেনে নেওয়া নতুবা এর খেসারত মালিক পক্ষকেই দিতে হবে।
জাবেদুল ইসলাম সবুজ : ‘চা বাগান হেরিয়া’ গ্রন্থের লেখক
মন্তব্য করুন