জাহিদ হাসান
৩০ জুলাই ২০২৬, ৫:৪৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

১৫ আগস্ট: যে শোক আজও জাতির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়

আগস্ট এলেই বাংলার প্রকৃতি যেন এক গভীর বৈপরীত্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। বর্ষার জলে নদী ভরে ওঠে, মাঠে নামে নতুন সবুজের উৎসব, প্রকৃতি ফিরে পায় প্রাণের স্পন্দন। অথচ এই জীবনমুখর ঋতুর বুকেই লুকিয়ে আছে বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাবিধুর এক স্মৃতি। ১৫ আগস্ট-একটি তারিখ, যা কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা নয় বরং একটি জাতির দীর্ঘশ্বাস, একটি রাষ্ট্রের আত্মসমালোচনার আয়না এবং ইতিহাসের এমন এক রক্তাক্ত অধ্যায়, যার ক্ষত সময়ের প্রবাহেও শুকায়নি।

 

কিছু হত্যাকাণ্ড কেবল রক্তপাত নয় বরং একটি জাতির চেতনায় দীর্ঘস্থায়ী অভিঘাত সৃষ্টি করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ছিল তেমনই এক বিভীষিকাময় ভোর। সেই ভোরে শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়নি; রক্তাক্ত হয়েছিল সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্মিত অসংখ্য স্বপ্ন।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে দেখলে তাঁর ঐতিহাসিক অবস্থানকে সংকুচিত করা হয়। তিনি ছিলেন একটি জাতির দীর্ঘ রাজনৈতিক জাগরণের মুখপাত্র। ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার, ছয় দফার আত্মনিয়ন্ত্রণের দর্শন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের গণশক্তি, সত্তরের নির্বাচনের গণরায় এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ-প্রতিটি মোড়ে তাঁর নেতৃত্ব বাঙালির আত্মপরিচয় নির্মাণে নির্ণায়ক ভূমিকা রেখেছে। ইতিহাসে খুব কম নেতা আছেন, যাঁদের ব্যক্তিগত সংগ্রাম একটি জাতির সংগ্রামের সঙ্গে এত গভীরভাবে মিশে গেছে।

 

৭ মার্চের ভাষণ ছিল ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক উচ্চারণ। সেখানে স্বাধীনতার দর্শন কেবল ভূখণ্ডের সীমারেখায় সীমাবদ্ধ ছিল না; ছিল মানুষের মর্যাদা, অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় আত্মসম্মানের ঘোষণা। সেই ভাষণ বন্দুকের নলের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, কারণ তা মানুষের মন জয় করেছিল।

 

স্বাধীনতা অর্জনের পর শুরু হয় আরও কঠিন যুদ্ধ-রাষ্ট্র গঠনের যুদ্ধ। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি নতুন রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা ছিল এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, বিধ্বস্ত যোগাযোগব্যবস্থা, খাদ্যসংকট, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক পুনর্গঠন-সব মিলিয়ে স্বাধীনতার উচ্ছ্বাস খুব দ্রুতই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। সেই সময়ের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে ইতিহাসে বিতর্ক থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু একটি বিষয় ইতিহাসের আদালতে অটল-বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ও প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

 

এরপর আসে সেই কালরাত্রি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড শুধু একজন রাষ্ট্রনায়কের জীবনাবসান ঘটায়নি বরং এই হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় এক গভীর বিচ্ছেদরেখা টেনে দেয়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেল এবং পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের নির্মম হত্যাকাণ্ড মানবিকতার ইতিহাসেও এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে আছে।

 

১৫ আগস্টের অভিঘাত তাই কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি রাষ্ট্রচিন্তারও এক গভীর সংকট। একটি স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোন পথে এগোবে, মতভেদ কীভাবে মীমাংসিত হবে, ক্ষমতার রূপান্তর কতটা সাংবিধানিক হবে-এসব প্রশ্নের সঙ্গে ১৫ আগস্ট অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। ইতিহাস আমাদের শেখায়, রাজনৈতিক সহিংসতা কখনো স্থায়ী সমাধান আনে না; বরং তা দীর্ঘমেয়াদে অনাস্থা, বিভাজন এবং প্রতিহিংসার বীজ বপন করে।

 

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, তাঁর শাসনকাল নিয়ে বিতর্ক থাকবে, তাঁর নীতি নিয়ে গবেষণা চলবে-এটাই গণতান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ইতিহাসকে অস্বীকার করার অধিকার কারও নেই। ইতিহাসকে খণ্ডিত করে দেখা মানে ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। একটি পরিণত জাতি তার ইতিহাসকে পূজা করে না, আবার অস্বীকারও করে না; সে ইতিহাসকে সত্যনিষ্ঠভাবে বোঝে, বিশ্লেষণ করে এবং সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।

 

১৫ আগস্ট আমাদের আরেকটি কঠিন সত্য শেখায়-ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আদর্শ দীর্ঘজীবী। পদ, প্রতিপত্তি কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতা একদিন শেষ হয়ে যায়; কিন্তু যে নেতা একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণ করেন, তিনি সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে ইতিহাসের অংশ হয়ে যান।

 

হয়তো এ কারণেই আগস্টের বৃষ্টি আজও অনেকের কাছে কেবল বর্ষার জল নয় বরং যেন ইতিহাসের বুক থেকে ঝরে পড়া এক নীরব অশ্রু। সেই অশ্রু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-ইতিহাসের প্রতি অবহেলা ভবিষ্যতের প্রতি অবিচার। যে জাতি তার ইতিহাসকে ভুলে যায়, সে একসময় নিজের পথও হারিয়ে ফেলে।

 

তাই ১৫ আগস্ট কেবল শোকের দিন নয়; এটি একটি জাতির বিবেক জাগ্রত করার দিন। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-স্বাধীনতা অর্জন যত কঠিন, স্বাধীনতার আদর্শ রক্ষা তার চেয়েও কঠিন। ইতিহাসের প্রতি সত্যনিষ্ঠ থাকা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করা, সহিংসতার পরিবর্তে সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সত্য ইতিহাস পৌঁছে দেওয়াই হতে পারে এই দিনের প্রতি সবচেয়ে গভীর শ্রদ্ধা।

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ফিফার নতুন সভাপতি নিয়ে জল্পনা, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা

ব্রাজিলের তিন বোনের সম্মিলিত বয়স ৩১৬ বছর, দীর্ঘায়ুর রহস্য নিয়ে চলছে গবেষণা

৯৩ বছর বয়সেও ট্রাক চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি

৮৪ বছর বয়সে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন মিশরীয় নারীর

৯৬ বছর বয়সে ইনফ্লুয়েন্সার, গড়লেন বিশ্ব রেকর্ড

শৈশবের ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে বঙ্গভবনের অলিন্দ-ˆতমুর হোসেন বিপুলের দীর্ঘ অভিযাত্রা

যে নফল নামাজ জীবনে একবার হলেও পড়তে বলেছেন মহানবী (সা.)

বিশ্বনবীর (সা.) চোখে ১২ শ্রেষ্ঠ মানুষ

যে ৬ বিশেষ কারণে মুহাম্মদ (সা.) অন্য নবীদের চেয়ে আলাদা

বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ‘শাড়ি’ প্রতিপাদ্যে নিউইয়র্কে রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলা

১০

সভাপতি শাহীন, সাধারণ সম্পাদক নাছির অ্যাসাল লংআইল্যান্ড চ্যাপ্টারের অভিষেক ও বারবিকিউ আয়োজন

১১

‘রাজাকার’ লেখা ব্যক্তিগত গাড়ির নম্বরপ্লেট ঘিরে আলোচনা

১২

স্থায়ী হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড নীতি, সর্বোচ্চ জামানত ২০ হাজার ডলার

১৩

প্রবাসে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারে মিশিগান বিএনপির মতবিনিময় সভা

১৪

বিদেশি গ্র্যাজুয়েটদের চাকরিতে ১ লাখ ডলার ফি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র

১৫

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পুলিশ কর্মকর্তা দিদারুল ইসলামের নামে সড়ক

১৬

সাংবাদিকদের সঙ্গে মতিউর রহমান চৌধুরীর মতবিনিময় ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিকতাই সংকট উত্তরণের পথ: মতিউর রহমান চৌধুরী

১৭

আমাদের সচেতনতা সময়ের দাবি

১৮

পরাশক্তির শক্তি বনাম দুর্বল রাষ্ট্রের কৌশল: যুক্তরাষ্ট্র – ইরান সংঘাতের নতুন পাঠ

১৯

১৫ আগস্ট: যে শোক আজও জাতির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়

২০