পৃথিবীর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মধ্যে পঞ্চদশ শতাব্দীর আমেরিকা আবিষ্কারের ঘটনা একটি। বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শক্তি আমেরিকা শাসন করেছে। প্রচলিত তথ্য মতে ১৪৯৩ সালের ১৫ মার্চ কলম্বাস আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেন। তবে কলম্বাস যে সর্বপ্রথম এ মহাদেশ আবিষ্কার করেছিলেন তা কিন্তু নয়। কারণ ভাইকিংরা কলম্বাসের অনেক আগেই এই মহাদেশে যাতায়াত করেছে বলে জানা যায়। তবে কলম্বাসের হাত ধরেই আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যবাদীদের বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্কের সূত্রপাত ঘটে।
বহু ঘটনার পর ১৬০৭ সালে ব্রিটেন জেমসটাউনে সর্ব প্রথম কলোনি স্থাপন করতে সক্ষম হয়। ব্রিটিশরা স্থানীয় অধিবাসীদের বোঝাতে সক্ষম হয় যে, তারা হিস্পানিকদের মত স্থানীয়দের শোষণ করবে না বরং তারা ব্যবসা-বাণিজ্য ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন বিশ্ব সৃষ্টি করে অধিবাসীদের কল্যাণ সাধন করবে। আমেরিকায় ব্রিটিশদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় আরও কিছু দিক ছিল। দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশ ছিল স্প্যানিশদের হাতে। ব্রিটিশরা চাচ্ছিল, এসব দেশ থেকে স্প্যানিশদের হটিয়ে তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে। তাই বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। পাশের দেশ কানাডাও তখন ছিল স্প্যানিশদের দখলে। এদিকে ব্রিটিশ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত লোকেরা নতুন বিশ্ব বলে খ্যাত আমেরিকায় মাইগ্রেট হতে শুরু করে। মূলত আজকের আমেরিকান যারা তাদের একটি বড় অংশই ব্রিটেন থেকে স্থানান্তরিত।
এখন যদিও ৫০টি অঙ্গরাজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গঠিত, আগে কিন্তু এমনটি ছিল না। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জন করতে তেরোটি অঙ্গরাজ্য এক হয়ে একটি শক্তিশালী কেন্দ্র তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
ঐতিহাসিকদের মতে, ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকার দূরত্ব ও ঔপনিবেশিকবাদের উন্মেষ আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল। এ ছাড়া প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে অন্যান্য যুদ্ধের ব্যয়বহুল ঋণভার আমেরিকার উপনিবেশের ওপর বিভিন্ন বাণিজ্যিক কর আরোপ করে নাগরিক জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। যার ফলে আমেরিকানরা ব্রিটিশ নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে দীর্ঘ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়।
১৭৭৪ সালে ফিলাডেলফিয়ায় এক সম্মেলনে ঔপনিবেশিক তেরোটি রাজ্যের মধ্যে জর্জিয়া বাদে বারোটা রাজ্য একত্রিত হয়ে ব্রিটিশদের নিজেদের দাবি ও অধিকার আদায়ের আবেদন করেন। কিন্তু আবেদন ফলপ্রসূ না হওয়ায় ১৭৭৫ সালে তেরোটি উপনিবেশ মিলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। জর্জ ওয়াশিংটনকে করা হয় প্রধান সেনাপতি এবং ওই বছরই ল্যাকজিন্টনে আমেরিকানরা ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এবং খুব সহজেই ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাজিত করতে সমর্থ হয়। ১৭৭৬ সালে জর্জ ওয়াশিংটন বিরাট বাহিনী নিয়ে প্রচুর শক্তি সঞ্চয় করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং অতি সহজেই বোস্টন থেকে ব্রিটিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণ ভাবে তাড়িয়ে ৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমেই এই প্রথম কোন উপনিবেশ তাদের প্রভু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে জয়লাভ করে। মূলত এখান থেকেই ব্রিটিশ আধিপত্যবাদের ক্ষয় শুরু হয়।
৪ জুলাই ১৭৭৬ – দিনটি শুধুই একটি তারিখ নয়, এটি এক জাতির নবজন্ম। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ১৩টি ব্রিটিশ উপনিবেশ ফিলাডেলফিয়ায় সম্মেলন করে যে ঘোষণা গ্রহণ করে, সেটিই Declaration of Independence – বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক দলিল।
থমাস জেফারসনের রচিত এই ঘোষণাপত্রে বলা হয়, “সকল মানুষ সমানভাবে সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা নির্দিষ্ট কিছু অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে -যেমন জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের অন্বেষণ।” এই দর্শন এক নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করে এবং বিশ্বের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার ঘোষণার আগেই, ১৭৭৫ সাল থেকে ব্রিটিশদের সঙ্গে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, কিশোর, বৃদ্ধ-সবাই অংশ নেয় এই যুদ্ধে। জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে সংগঠিত হয় বিদ্রোহী বাহিনী। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আট বছর ধরে চলে সংগ্রাম।
পরিশেষে, ১৭৮৩ সালে Treaty of Paris-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। রাজতন্ত্রের বাইরে গিয়ে “জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য” রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই আদর্শ পরবর্তীকালে ফরাসি বিপ্লব, ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন এবং পৃথিবীর নানা দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করে।
-সম্পাদক ও প্রকাশক, বাংলা সংবাদ
-সিনিয়র করেসপনডেন্ট, যমুনা টিভি, ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও হোয়াইট হাউজ
মন্তব্য করুন