আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এ ঘোষণা দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে শঙ্কা কাটছে না। নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হলেও আদৌ তা সময়মতো অনুষ্ঠিত হবে কিনা, কিংবা সব রাজনৈতিক দল এতে অংশ নেবে কিনা-এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র।
নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু, তবু নানা অনিশ্চয়তায় সময় পার হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসকে সামনে রেখে খসড়া কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন শুরু হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো, ইভিএম বা প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ-সবকিছু নিয়েই এখন জোর প্রস্তুতি চলছে।পাশাপাশি বিদেশি পর্যবেক্ষকদের আমন্ত্রণ, নির্বাচনী সহিংসতা রোধে পরিকল্পনা, এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের কথাও বিবেচনায় রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত একুশে বইমেলা ডিসেম্বর মাসে এগিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী প্রস্তুতির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একাধিকবার দেখা গেছে, প্রধান রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতিতে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনকে ঘিরে দেশি-বিদেশি মহলে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল। অন্যদিকে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোটগ্রহণের দিনেই নানা অনিয়ম ও অভিযোগ ওঠে, যার ছায়া এখনো কাটেনি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ দুই অভিজ্ঞতার পর জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, “তারিখ ঘোষণার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আস্থার সংকট দূর করা। সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে। যদি রাজনৈতিক সমঝোতা না হয়, তবে সহিংসতা ও বর্জনের ঝুঁকি থেকে যাবে।” বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্র চায়, কিন্তু আস্থা না থাকলে ভোটকেন্দ্রে মানুষ যাবে না। তাই ভোটারের আস্থা ফিরিয়ে আনা নির্বাচন কমিশনের মূল দায়িত্ব।”
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যদি অংশ না নেয়, তবে এই নির্বাচন কতটা গুরুত্ব পাবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
বাংলাদেশের নির্বাচন শুধু দেশের ভেতরেই আলোচিত নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও তা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, সার্কের পুনরুজ্জীবন, রোহিঙ্গা সংকট, এমনকি ঢাকাকে লক্ষ্য করে পরিচালিত ভ্রান্ত তথ্য প্রচার-সবকিছুই বাংলাদেশের নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ ইতোমধ্যে সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের ওপর জোর দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘোষণা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার নতুন অধ্যায় হতে পারে। তবে শঙ্কা ও সংশয়ের ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। নির্বাচনের আগাম মাসগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনা ও সমঝোতার গতি-প্রকৃতিই নির্ধারণ করবে-ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সত্যিই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, নাকি আবারও নতুন সংকটের জন্ম দেবে।
মন্তব্য করুন