ইয়োশকা ফিশার
৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১১:৩২ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মাগা’ যেভাবে পশ্চিমাদের ভাগ করে ফেলছে

ইউরোপ বহু দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ঋণী। যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপ ও পশ্চিম বার্লিনে দীর্ঘদিন স্বাধীনতা রক্ষা করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের অর্থায়নে এখানে পুনর্গঠন সফল হয়েছিল। শীতল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় এবং ন্যাটোর সুরক্ষার অধীন ইউরোপের একীকরণ হয়েছে। এসবই ইউরোপের জন্য বড় অর্জন।

 

এ সময়গুলো ইউরোপের জন্য সফল, সুখের ও স্বস্তির ছিল। কিন্তু এ স্বস্তি আমাদের মাত্রাতিরিক্ত আত্মতুষ্ট করে তুলেছিল। আমরা খেয়াল করিনি যে আমেরিকান সাম্রাজ্যের কেন্দ্র থেকে পৃথিবীকে দেখা এক রকম, আর আমাদের ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে আরেক রকম। যত দিন গড়িয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তত নিজেকে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে অনুভব করছিল। সাম্রাজ্যের স্বার্থে তারা ব্যয়বহুল যুদ্ধ করছিল। আর আমরা এদিকে কল্যাণরাষ্ট্র তৈরিতে ব্যস্ত ছিলাম।

 

ইরাক যুদ্ধ, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, শিল্পক্ষেত্রের পতন এবং মার্কিন অভিজাত ব্যক্তিদের গ্রামীণ ও শ্রমজীবী মানুষকে অবহেলা—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে একজন ক্ষমতালোভী নেতা সহজেই ক্ষমতায় চড়ে বসতে পারেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ২০১৬ সালের নির্বাচনে জিতে ঠিক সে ঘটনাই ঘটান। প্রথমবার তাঁর জয় সবাইকে এতটাই অবাক করে দিয়েছিল যে সম্ভবত তিনি নিজেও পুরো ঘটনাটা ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি।

 

 

কিন্তু এক বছর আগে দ্বিতীয়বার তাঁর নির্বাচিত হওয়ার পর বিষয়টি আর নতুন কোনো ব্যাপার ছিল না। গত জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার শপথ নেওয়ার পর থেকে ট্রান্স-আট লান্টিক বিশ্ব সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ট্রাম্প সম্পর্কে অনেক কিছু বলা যায়, কিন্তু তাঁকে কখনোই ‘ভাবাদর্শিক’ বলা যাবে না। তাঁর একমাত্র আদর্শ হলো তিনি নিজে। তবে তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, তাঁর হোয়াইট হাউসের পরামর্শকেরা এবং পুরো ‘মাগা’ (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। তাঁদের কাছে মাগা আন্দোলন একটি আদর্শিক মতাদর্শ।

 

হ্যাঁ, স্বীকার করতে হবে, ইউরোপ বহু দশক যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাছাতার নিচে বেশ স্বচ্ছন্দে থেকেছে। কিন্তু এখনকার মার্কিন প্রশাসনের চাপের কাছে তার নত হওয়া উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আমাদের অনেক ঋণ থাকলেও আমাদের নিজেদের প্রতিও দায়িত্ব আছে। এ আন্দোলনের প্রধান ভাবাদর্শীদের একজন স্টিভ ব্যানন। তিনি পুরো দুনিয়াকেই এমন এক যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখেন, যেখানে জুডিও-খ্রিষ্টান ঐতিহ্য (জুডিও-খ্রিষ্টান ঐতিহ্য বলতে মূলত জুডাইজম বা ইহুদিধর্ম এবং খ্রিষ্টধর্ম থেকে গড়ে ওঠা একটি যৌথ সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও ধর্মীয় ভিত্তিকে বোঝানো হয়। পশ্চিমা সভ্যতার অনেক মূল্যবোধ, আইন, নীতি ও সমাজব্যবস্থা এ ঐতিহ্য থেকে এসেছে বলে সাধারণভাবে মনে করা হয়) একদিকে, আর তার শত্রুরা অন্যদিকে। এ জুডিও-খ্রিষ্টান ঐতিহ্যের শত্রুর তালিকায় পশ্চিমা উদার চিন্তাধারাও আছে। ব্যানন মনে করেন, এ সাংস্কৃতিক যুদ্ধে জিততে মিত্র দরকার।

 

 

আর তিনি বিশ্বাস করেন, ইউরোপের ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী দলগুলো এমন মিত্র হতে পারে। এখন যেহেতু মাগা যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায়, ব্যানন মনে করছেন ইউরোপের পতনশীল’ সমাজগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়ে এ আন্দোলনকে আরও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। জেডি ভ্যান্সও গত ফেব্রুয়ারিতে মিউনিখ প্রতিরক্ষা সম্মেলনে তাঁর কুখ্যাত বক্তৃতাটি দেওয়ার সময় এ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ওই বক্তৃতায় তিনি ইউরোপীয় নেতাদের কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জার্মানির ডানপন্থী ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’ (এএফডি) দল নাকি সেন্সরশিপের শিকার। অথচ তিনি যখন ওই বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, ঠিক সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মামলা করছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছিল। আসলে ব্যানন ও তাঁর সহযোগীরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল আদর্শকেই প্রত্যাখ্যান করেন।

 

মনে রাখা দরকার, ইইউ গড়ে উঠেছে উদার মানসিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর। এর লক্ষ্য হলো জাতীয়তাবাদকে অতিক্রম করে ধীরে ধীরে আরও গভীর সংহতির পথে যাওয়া। কিন্তু মাগা আন্দোলন স্পষ্টভাবেই জাতীয়তাবাদী। তারা রাজনৈতিকভাবে যারা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে, তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে আগ্রহী। তাই ট্রাম্পের আমলে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক পুরোপুরি উল্টে গেছে। এটি আর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নয়; বরং জাতীয়তাবাদের রূপ নিচ্ছে।

 

হ্যাঁ, স্বীকার করতে হবে, ইউরোপ বহু দশক যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাছাতার নিচে বেশ স্বচ্ছন্দে থেকেছে। কিন্তু এখনকার মার্কিন প্রশাসনের চাপের কাছে তার নত হওয়া উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আমাদের অনেক ঋণ থাকলেও আমাদের নিজেদের প্রতিও দায়িত্ব আছে। যে মূল্যবোধ ও নীতির ওপর আমরা এত দিন চলেছি, তা রক্ষা করা আমাদের জন্য খুবই জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র উদার মূল্যবোধ থেকে সরে গিয়ে জনতুষ্টিবাদী জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকেছে বলে আমাদেরও যে একই পথে যেতে হবে, এমন নয়।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল পর্যন্ত বিশ্বকাপের প্রতিটি লড়াইয়ে নাটকীয়তা, শিরোপার মঞ্চে স্পেন-আর্জেন্টিনা

চলে গেলেন স্যার গ্যারি সোবার্স

ইরানের হামলার জের পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির আলোচনায় কুয়েত, চায় সেনা ও যুদ্ধবিমান

বেকারত্ব ভাতা জালিয়াতি দমনে নিউইয়র্কে ফেডারেল ‘স্ট্রাইক টিম’

নিউইয়র্কে ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষায় ঐতিহাসিক উদ্যোগ, প্রথম ‘রেন্টাল রিপঅফ রিপোর্ট’ প্রকাশ

ভাষণ সম্প্রচার না করায় এবিসি, এনবিসি ও সিএনএনের লাইসেন্স বাতিলের হুমকি ট্রাম্পের

প্রতিবেশীদের ভূমি যে কৌশলে দখলে নিচ্ছে ইসরাইল

ইউরোপে আটকে গেল আইফোনের এআই

বিশ্বকাপ শিরোপার দাম ৭৫০ কোটি টাকা! বাকি দলগুলো পাবে কত?

বিদেশি শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ভিসায় নতুন কড়াকড়ি যুক্তরাষ্ট্রের

১০

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে এপস্টিনের যোগাযোগ ছিল: পডকাস্টে ভ্যান্স

১১

‘এআই’ দিয়ে তালিকা বানিয়ে ছুটিতে থাকা কর্মীদের ছাঁটাইয়ের অভিযোগ, মেটার বিরুদ্ধে মামলা

১২

গ্রিন কার্ডে ১ লাখ ডলারের ফি, নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা ট্রাম্পের

১৩

ফিফা থেকে ইসরায়েলকে বহিষ্কারে প্রভাব খাটাচ্ছে নরওয়ে

১৪

মিশিগানে বিশ্বনাথ প্রবাসী কল্যাণ সোসাইটি অব মিশিগান-এর বার্ষিক বনভোজন অনুষ্ঠিত

১৫

তিন দিনব্যাপী ‘হ্যামটাউন সামার জ্যাম’ ফেস্টিভ্যাল সম্পন্ন, প্রাণের মিলনমেলায় মুখর ছিল হ্যামট্রামিক

১৬

হরমুজ নিয়ে তীব্র হচ্ছে লড়াই

১৭

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ভেঙে দিতে মার্কো রুবিও কেন উঠেপড়ে লেগেছেন

১৮

প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ, গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল জিতলে কত টাকা পান ফুটবলাররা

১৯

সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য লুকালেই ভিসা প্রত্যাখ্যান করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

২০