আয়তনে ছোট্ট হলেও বাংলাদেশ জনসংখ্যায় অষ্টম এবং পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। সরকারী তথ্যানুযায়ী প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাংলাদেশে এখন বসত করেন ১১ শত ৬৯ জন। আর বেসরকারী মতে বলা হচ্ছে ১৩ শত থেকে ১৪ শত জন। একাত্তরে এ সংখ্যা ছিলো ৪ শত ৬৩ জন। আর বর্তমান সময়ে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যে মাইক্রোনেশিয়া, তারও জনঘনত্ব মাত্র ৭ শত ৭৮ জন।
অন্য দিকে বড় বড় আয়তন ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অনেক দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে নগণ্য সংখ্যক বাস করেন, যেমন, ভারতে ৪ শত ৩৫ জন, চায়নায় ১ শত ৫২ জন, দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ কানাডায় মাত্র ৪ জন, তৃতীয় বৃহত্তম দেশ আমেরিকায় মাত্র ৩৭ জন,, অষ্ট্রেলিয়ায় ৩ জন করে এবং এরকমই আরো অসংখ্য দেশে। জন ঘনত্বের জন্য একটা দেশের পরিবেশ ও উৎপাদনের উপর কি পরিমাণ চাপ পড়তে পারে এবং তার ভারসাম্য রাখা যে কত কঠিন হতে পারে, তুলনামূলক জনঘনত্বই তা বলে দেয় ! আর এর মধ্যে দিয়েই আমাদের বেঁচে থাকা, আমাদের আয় উপার্জন, উৎপাদন ও উন্নয়ন।

সবকিছু ভাবলে আমাদেরকে ভিন্ন মাত্রার দক্ষতায় অনেক কিছুকে ওভারটেক করেই এগুতে হবে। পশ্চিমাদের নাদুসনুদুস চিন্তার কিছু কিছু পদ্ধতি বাদ দিয়ে আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রুপান্তর করতে হবে এবং বুঝতে হবে যে আমাদের জনসংখ্যাই এখন সম্পদ। কাজেই একটি সুস্থ্য জাতি হিসেবে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় এখন দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত ভাবে ভাষা জ্ঞান, গণিত ও বিজ্ঞানকে শিক্ষার ভিত বা বেসিক ফাউণ্ডেশন হিসেবে দাঁড় করাতে হবে। নতুবা একসময় আমাদের সামষ্টিক প্রবৃদ্ধি কোনো এক পর্যায়ে গিয়ে থমকে যাবে।
বর্তমানে তথা কয়েক বছরের মধ্যে আমরা পুরোপোরি ভাবে একটি ডেমোগ্রাফিক শক্তি বা বেনিফিটের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছি, যেখনে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা থাকবে ৬৫ থেকে ৭০ % এবং এটি দীর্ঘ কাল পর একটি জাতির জীবনে আসে, আর অগ্রগতির জন্য এটি একটি অসাধারণ সুযোগ ও কাম্যতার বিষয়। এশিয়ার যে কয়েকটি দেশ উন্নতির শিখরে আরোহন করেছে, তারা প্রায় সবাই এ সুযোগটিকে কাজে লাগিয়েছেন। যেমন সিঙ্গাপুর, হংকং, তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অনেক দেশ। জাপান সিঙ্গাপুরের তেমন কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। জনশক্তিকেই সম্পদে পরিণত করিয়ে প্রযুক্তির সাথে সমন্বয় ঘটিয়েছেন তারা।
আমাদেরও এখন সেই গোল্ডেন টাইম, কাজেই এটিকে কাজে লাগাতে হলে এখনই স্থান কাল পাত্রের ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক জনমিতির পরিমন্ডল অনুযায়ী বিষয় ও অঞ্চলভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে নতুবা এ গোল্ডেন ইয়ারগুলোকে সম্পদে পরিণত করা যাবে না।
তাছাড়া যেহেতু আমাদের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। কাজেই ৭০/৮০ বছরের দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলকেও পাশাপাশি কাজে লাগাতে হবে। আমরা ৫৯/৬০ টেই অবসরে পাঠিয়ে দিচ্ছি কিন্তু ইয়াং শক্তির পাশাপাশি বিদগ্ধ অভিজ্ঞতাও খুবই প্রয়োজন হয়, দ্রুত ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য। একজন রাষ্ট্রনায়ক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে, জ্ঞানে পরিপক্ব ও পরিপূর্ণ হতে হলে দীর্ঘ সময় পার করে সত্তর-আশিতে নিখুঁত চিন্তার অধিকারী হন।
প্লেটোও তাঁর রিপাবলিক গ্রন্থে এমনটি বলছেন, তিনি আরও বলেন যে, যিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ গ্রহণ করবেন, তাঁকে ৫০ বছরই কেবল দার্শনিক জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক। তেমনি একজন লেখক, একজন শিক্ষাবিদ, একজন সেনাপতি, একজন প্রকৌশলী, কবি, সাহিত্যিক কিংবা বিজ্ঞানীর ক্ষত্রেও এটি প্রযোজ্য। ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ দেয়া হয় ক্লাস নেয়ার জন্য নয় বরং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক অগ্রগতিতে তাঁর অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর জন্য।
সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কিছু ইমেরিটাস কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয় একই কারণে। কেননা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সিদ্ধান্তে ভুল হলে সবই ভুল হবে। কাজেই একজন সঠিক নির্দেশক বা নির্দেশ দাতা ও পর্যবেক্ষক অনেক বেশি আবশ্যক। আর এজন্যই অবসরপ্রাপ্ত, জ্ঞান সমৃদ্ধ, অভিজ্ঞ ও দেশ প্রেমিক জনবান্ধব নাগরিকবৃন্দকেও কাজে লাগাতে হবে একইসাথে।
মন্তব্য করুন