বাংলা সংবাদ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ: নেপথ্যে কী উদ্দেশ্য

আমেরিকার পরবর্তী দখলকৃত ভূখণ্ডের নতুন নামকরণ হতে পারে ‘ট্রাম্পল্যান্ড’। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর, একবিংশ শতাব্দীতে নিজের সাম্রাজ্য বাড়াতে নতুন ভূখণ্ড খুঁজছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার প্রথম মেয়াদে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে দেখানো আগ্রহকে অনেকে ‘মশকরা’ হিসেবেই দেখেছিলেন। সবকিছু চমকে দেওয়ার নেশায় মত্ত থাকা ট্রাম্পের নজর এখন গ্রিনল্যান্ডের দিকে।

 

 

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের গ্রিনল্যান্ড সফর নিয়ে ‘ট্রোলিং’ হলেও এখন আর কেউ হাসছে না। মঙ্গলবার ইউরোপের নেতারা দ্বীপটির সার্বভৌমত্ব ও ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এই ভূখণ্ডের ওপর অধিকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, প্রেসিডেন্টের হুমকিকে আর হালকাভাবে নিচ্ছে না ইউরোপ। এটা খুব একটা আশ্চর্যের বিষয়ও নয়। ভেনেজুয়েলা ‘জয়ের’ পর আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর এই প্রশাসন এখন কার্যত পুরো পশ্চিম গোলার্ধকেই ট্রাম্পের ‘জমিদারি’ বলে দাবি করছে। আর তার শীর্ষ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার সতর্ক বার্তা দিয়ে সোমবার সিএনএনে বলেছেন, শক্তি, বলপ্রয়োগ ও প্রবল ক্ষমতার অধিকারী যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের তথাকথিত ‘কঠোর আইন’ মানে না।

তবে ট্রাম্পের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই বরফে ঢাকা এই ভূখণ্ডটি দরকার। যদিও এটা শুরু থেকে অনেকের পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। আর মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস যখন আতঙ্কিত ন্যাটো মিত্রদের সামরিক শক্তি ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা দিতেও অস্বীকৃতি জানাল, তখন সেই যুক্তি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠল।

 

 

একটি কৌশলগত রত্ন ভাণ্ডার

ট্রাম্পের কথাটি একদম ঠিক। গ্রিনল্যান্ড কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই গুরুত্ব দিন দিন আরও বাড়ছে। মধ্য আটলান্টিকে এটি বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই দ্বীপ ভয়ঙ্কর ‘গ্রিনল্যান্ড এয়ার গ্যাপ’ নামেই পরিচিত ছিল। সমুদ্রের এমন এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল, যা যুদ্ধবিমানের আওতার বাইরে ছিল। নাৎসি ইউ-বোটগুলো এই এলাকাকে মিত্রশক্তির বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য এক ভয়াবহ মৃত্যুকূপে পরিণত করেছিল। ভবিষ্যতের কোনো বড় যুদ্ধে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, আটলান্টিক মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর কর্তৃত্বও তার হাতেই থাকবে। এর পাশাপাশি, গ্রিনল্যান্ডে ইতোমধ্যে থাকা একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের আগাম ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

 

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আট দশক পর, গ্রিনল্যান্ড আক্ষরিক অর্থেই এবং ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বরফ গলতে থাকায় বিশ্বের এই প্রান্তে নতুন নৌপথ খুলে যাচ্ছে। চীন-রাশিয়াও ট্রাম্পের মতোই ভালোভাবে বোঝে, এই অঞ্চল কতটা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে ট্রাম্পের যুক্তির বড় দুর্বলতা হলো যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা যদি সত্যিই ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে গ্রিনল্যান্ডে নিজেদের অবস্থান জোরদার করতে তাকে কেউই আটকাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর একটি সদস্য দেশের আধা-স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড। এর বিশাল জনমানবশূন্য এলাকাগুলোতে সহজেই নতুন সেনাঘাঁটি ও হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করা সম্ভব। প্রশাসনের শীর্ষ নেতাদের করা আক্রমণাত্মক রসিকতা ডেনমার্ক নাকি কুকুরের স্লেজ দিয়ে দ্বীপটি রক্ষা করছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও বাস্তবতা হলো, কোপেনহেগেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি চুক্তি রয়েছে, যা মার্কিন বাহিনীকে ফ্লাইট অবতরণ ও উড্ডয়ন, জাহাজ নোঙর ও বন্দর ব্যবহারসহ আবাসন সুবিধা ও অন্যান্য সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যাপক স্বাধীনতা দেয়।

 

 

গ্রিনল্যান্ডে এখনো পুরোপুরি কাজে না লাগানো বিপুল পরিমাণ অফশোর তেল ও গ্যাসের মজুত রয়েছে। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এর টুন্ড্রা অঞ্চলের বরফ গলতে থাকায় বিরল খনিজের (রেয়ার আর্থ) ভাণ্ডারগুলোও তুলনামূলক সহজে উত্তোলনযোগ্য হয়ে উঠবে। যে খনিজগুলো ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও আধুনিক অস্ত্রব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে কাজে লাগতে পারে। যদি ট্রাম্পের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু সত্যিই রেয়ার আর্থ খনিজ হয়, তাহলে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড উভয় পক্ষের কর্মকর্তারাই অংশীদারিত্বমূলক চুক্তির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। ট্রাম্প ক্রমেই ১৯শ শতকের সেই মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মতো হয়ে উঠছেন, যারা নতুন ভূখণ্ড দখলের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন, শুল্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন এবং ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।

 

 

গ্রিনল্যান্ডে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ডেনমার্কের পতাকার পাশাপাশি মার্কিন পতাকাও উড়ছে। তবে বর্তমান প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি বেশি মিলে যায় মিলারের স্ত্রী কেটির চিন্তার সঙ্গে— যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরো গ্রিনল্যান্ড দ্বীপটিকে মার্কিন পতাকার রঙে আচ্ছাদিত একটি ছবি পোস্ট করে ইংরেজিতে লিখেছেন, ‘সুন’ (শিগগির)।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যুদ্ধ পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কার সতর্কবার্তা: আইএমএফ

উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যানের ওপর হামলা, সোস্যাল মিডিয়ায় নিন্দার ঝড়

ভারতের আধিপত্যে প্রশ্নের মুখে বিশ্ব ক্রিকেট, মোস্তাফিজ ইস্যুতে সমালোচনা

কমলগঞ্জে দিনভর নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পহেলা বৈশাখ১৪৩৩ উদযাপিত হয়

বড়লেখায় বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা

নিউইয়র্কে বৈশাখী উৎসব: “ABCH পটলাক পান্তা ইলিশ”-এ প্রবাসীদের মিলনমেলা

কানাডার এমপি হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডলি বেগম

হরমুজ প্রণালি অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দেবে না ন্যাটো

যিশু খ্রিস্টের সঙ্গে নিজের তুলনা টানলেন ট্রাম্প

কমলগঞ্জে উন্নয়নের জোয়ার: ৩ টি সড়ক ও ১টি খাল খনন কাজের উদ্বোধন

১০

গেম খেলার দক্ষতাই চাকরি! বিমান নিয়ন্ত্রণে নতুন ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের

১১

সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেন রাহেনা বেগম

১২

জাহাজ চলাচলে নতুন বিধি, হরমুজ ঘিরে ট্রাম্পের ঘোষণা

১৩

নাগরিকত্ব নীতিতে কড়াকড়ি, জন্মসূত্রের সুবিধা বন্ধে ট্রাম্প

১৪

মার্কিন–ইরান বৈঠক পৌঁছেছে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে

১৫

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক: আলোচনায় পাঁচ বড় প্রশ্ন

১৬

কৃষি খাতের উন্নয়নে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে- নাসির উদ্দিন মিঠু এমপি

১৭

কমলা হ্যারিস কি নামছেন ২০২৮ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে

১৮

আইপিএলের মাঝে হঠাৎ অবসরের ঘোষণা রশিদ খানের

১৯

মিত্রদের দায়-দায়িত্ব নিয়ে ন্যাটো প্রধানের সামনে ট্রাম্পের বার্তা

২০