মিশিগান প্রবাসী বাঙালি সমাজের সাম্প্রতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। গত ১০ আগস্ট রোববার আমেরিকার সবচেয়ে বড় পথ মেলায় হাজার হাজার বাঙালি নগর বাউল জেমসের গানে মাতোয়ারা হয়ে মধ্যরাতে ঘরে ফিরছিলেন। সবাই ভেবেছিলেন, পরদিন বাঙালি কমিউনিটির প্রধান আলাপের বিষয় হবে এই উৎসব, শিল্পীদের মুগ্ধকর পরিবেশনা আর প্রবাসে এক টুকরো বাংলার আনন্দঘন পরিবেশ। কিন্তু সোমবার ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রত্যাশা ভেঙে দিল মূলধারার টিভি চ্যানেল, রেডিও আর সংবাদপত্রে বারবার প্রচারিত একটি সংবাদ।
খবরে জানানো হলো—মিশিগানের হ্যামট্রাম্যাক সিটি কাউন্সিলের দুই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সদস্যের বিরুদ্ধে নির্বাচন-সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। মনরো কাউন্টি জেলা আদালতের রেকর্ড বলছে, তাদের বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ রয়েছে, যার মধ্যে ছয়টি গুরুতর অপরাধের আওতায় পড়ে। খবরটি মুহূর্তেই প্রবাসী বাঙালি সমাজে বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ল, আলোচনায় আসতে লাগল সাম্প্রতিক বছরগুলোর কমিউনিটির নানা বিতর্ক, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের ঘটনা। প্রায় এক বছর ধরে হ্যামট্রাম্যাক সিটির কিছু ব্যক্তিকে ঘিরে যেসব তদন্ত, বরখাস্ত ও আইনি কার্যক্রম চলছে, তার সঙ্গে এই খবর যেন আরেকটি ধাক্কা হয়ে এল।
অভিযুক্তদের মধ্যে একজন বলছেন, এটি সম্পূর্ণ মনগড়া অভিযোগ, যার উদ্দেশ্য বাংলাদেশি ও মুসলিম কমিউনিটিকে খাটো করা। কিন্তু তাতে কমিউনিটির অস্বস্তি কমছে না। কেউ চান অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হোক, কেউ আবার বলছেন—এটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। একজন প্রবাসী ব্যবসায়ী মন্তব্য করেছেন, সত্য হলে দোষীদের শাস্তি হোক, আর মিথ্যা হলে ষড়যন্ত্রকারীদেরও বিচারের মুখোমুখি করা দরকার।
সমস্যা হলো, এই ঘটনা ঘটল এমন সময়ে, যখন সাম্প্রতিক প্রাথমিক নির্বাচনে একজন বাঙালি আমেরিকার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মেয়র নির্বাচনের যোগ্যতা অর্জন করেছেন। প্রবাসে আমরা যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি, আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম যখন শিক্ষা, পেশা, ব্যবসা এবং মূলধারার রাজনীতিতে সাফল্যের নজির স্থাপন করছে, তখন এমন খবর মনকে আঘাত করে, মনোবল ভেঙে দেয়।
আমরা লক্ষ্য করেছি, যেকোনো ইতিবাচক উদ্যোগ—হোক সেটা নির্বাচন, মেলা বা সাংস্কৃতিক আয়োজন—কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের বিরোধিতার শিকার হয়। তারা গুজব ছড়ায়, বিভাজন তৈরি করে, কখনও ছোটখাটো বিষয়কে বড় করে দলাদলি, গালাগালি এমনকি মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত নিয়ে যায়। প্রবাসে এই সংস্কৃতি আমাদের এগিয়ে যেতে দেয় না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবাসে আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের প্রতিনিধি। আমি বা আপনি যাই করি না কেন, তার প্রভাব পড়ে পুরো কমিউনিটির উপর, এমনকি দেশের ভাবমূর্তির উপরও। ভাল বা মন্দ—খবরটি হয় ‘বাংলাদেশি’ শিরোনামে। তাই দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। আমাদের এমনভাবে কাজ করতে হবে, যাতে লাল-সবুজের পতাকার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে, যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম গর্বের সঙ্গে বলতে পারে—তারা এমন একটি কমিউনিটির অংশ, যারা ঐক্যবদ্ধ থেকে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে।
প্রবাসের আকাশে লাল-সবুজ পতাকা পতপত করে উড়ুক, এই পতাকা আমাদের সন্তানদের অনুপ্রেরণা জোগাক—সেই স্বপ্নই আমাদের পথ দেখাক। এখন সময় এসেছে, ভাল মানুষদের একত্রিত হয়ে নেতিবাচকতাকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার। প্রবাসে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে দেশের সুনামই হোক একমাত্র অগ্রাধিকার।
মন্তব্য করুন