বিদেশের মাটিতে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে দেশীয় নাগরিকত্ব কিংবা দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী বাসিন্দার (গ্রিন কার্ড) মর্যাদা ত্যাগের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সরকারি সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত চার প্রান্তিকে (১২ মাস) রেকর্ড সংখ্যক মানুষ মার্কিন পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন, যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘নিউজউইক’ ও ‘ইয়াহু নিউজ’-এর বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
মার্কিন প্রবাসীদের কর সেবা প্রদানকারী সংস্থা ‘গ্রিনব্যাক এক্সপ্যাট ট্যাক্স সার্ভিসেস’ যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রকাশনা ‘ফেডারেল রেজিস্টার’-এর ডেটা বিশ্লেষণ করে এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।
রেকর্ড ভাঙা পরিসংখ্যান
প্রতিবেদনে বলা হয়, সর্বশেষ চারটি ত্রৈমাসিক মিলিয়ে মোট ৫,৭৯০ জন ব্যক্তি মার্কিন নাগরিকত্ব বা দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী রেসিডেন্সি আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করেছেন। শুধুমাত্র চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) ১,৭৮১ জনের নাম এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৮.৫ শতাংশ বেশি। এছাড়া বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) নাগরিকত্ব ছাড়ার সংখ্যা ৩,২৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের প্রথমার্ধের চেয়ে ৩৮.৫ শতাংশ বেশি।
মূল কারণ ফি ও কর জটিলতা
বিশ্লেষকদের মতে, নাগরিকত্ব ত্যাগের এই আকস্মিক উল্লম্ফনের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে সরকারি ফি হ্রাস। দীর্ঘদিন আইনি লড়াইয়ের পর মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর (স্টেট ডিপার্টমেন্ট) নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রশাসনিক ফি ২,৩৫০ ডলার থেকে ৮০ শতাংশ কমিয়ে মাত্র ৪৫০ ডলার নির্ধারণ করে, যা চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়। ফি একধাক্কায় এত কমে যাওয়ায় অনেকেই দ্রুত তাদের ঝুলে থাকা আবেদন সম্পন্ন করেছেন।
দ্বিতীয় প্রধান কারণটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের জটিল দ্বৈত কর ব্যবস্থা (FATCA আইন)। বিশ্বের অন্যতম দেশ হিসেবে আমেরিকা তার নাগরিকদের ওপর বৈশ্বিক আয়ের ভিত্তিতে কর আরোপ করে। অর্থাৎ, একজন মার্কিন নাগরিক বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসে আয় করলেও তাকে মার্কিন সরকারকে করের হিসাব দিতে হয়। এই করের আইনি জটিলতা এবং প্রবাসে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেকেই মার্কিন পাসপোর্ট ধরে রাখার চেয়ে তা ত্যাগ করাকে শ্রেয় মনে করছেন।
পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তার অভাবও অনেককে স্থায়ীভাবে আমেরিকার পাট চুকিয়ে দিতে বাধ্য করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, তালিকায় নাম আসা মাত্রই কেউ তাৎক্ষণিকভাবে নাগরিকত্ব ছেড়েছেন এমন নয়। সাধারণত আবেদন চূড়ান্ত হতে ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লাগে। ফলে এই পরিসংখ্যান মূলত মার্কিন প্রশাসনের দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার চূড়ান্ত চিত্র।
মন্তব্য করুন