বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতির পেছনে কারণ কী?

বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনে কেউ বাধা দিলে তার বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞার যে হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র তা নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। নির্বাচনের আট মাস আগেই আমেরিকা কেন এ ধরণের হুঁশিয়ারি দিল? কেউ কেউ বলছেন অবাধ-সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচন দেখার জন্য কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকাঙ্খাই কাজ করেছে, নাকি এর পেছনে আরো কোন গভীর ‘কৌশলগত’ হিসেব-নিকেশও আছে?

ওয়াশিংটন-ভিত্তিক উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়ান ইন্সটিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, এটা বেশ কঠোর একটা সিদ্ধান্ত এবং এখানে একটা খুবই স্পষ্ট বার্তা দেয়া হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন এখন দেখবে নির্বাচন ঘনিয়ে এলে সেখানে কী ঘটে।

মি. কুগেলম্যান বলছেন,”বাইডেন প্রশাসন একটা মূল্যবোধ-ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা জোরালোভাবে প্রয়োগ করছে।”

একই কথা বলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো ড. আনু আনোয়ার। তার কথা হচ্ছে, “বাইডেন সরকার যদি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসন আছে বলে মনে করতো – তাহলে নিশ্চয়ই ডেমোক্রেসি সামিটে ঢাকা আমন্ত্রিত হতো।”

মাইকেল কুগেলম্যান বলছেন, “গত বেশ কিছুকাল ধরেই আমরা দেখছি বাইডেন প্রশাসন বাংলাদেশের সরকারের ক্র্যাকডাউনের সমালোচনা করেছে, র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।”

“এখন দেখা যাচ্ছে যে কূটনৈতিক পন্থার বাইরে গিয়ে তারা প্রয়োজনে ‘শাস্তিমূলক পদক্ষেপ’ নিতেও ইচ্ছুক এবং অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন, গণতন্ত্র ও অধিকার নিশ্চিত করতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতেও প্রস্তুত” প্রশ্ন উঠতে পারে – বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সনাতন কূটনৈতিক পন্থা ছেড়ে এমন একটি ‘হুঁশিয়ারিমূলক’ পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে কেন?
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্স এন্ড গভর্নমেন্টের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে এই প্রথম কোন দেশের বিরুদ্ধে এ ধরনের ভিসা নীতি নিলো তা নয়।

“অতীতে নাইজেরিয়া ও উগান্ডার মত কিছু দেশের ক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এটা জানানোর জন্য যে এসব দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া তারা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং তাতে তারা নানা অনিয়ম দেখতে পেয়েছে।”

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নতুন মার্কিন ভিসা নীতি ঘোষণার পেছনে কোন কৌশলগত বিবেচনা কাজ করে থাকতে পারে কিনা? কিছু বিশ্লেষক মনে করেন বাংলাদেশকে ঘিরে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গীর যেসব পরিবর্তন হচ্ছে তার মূল লক্ষ্য দেশটিকে চীনের প্রভাববলয়ের বাইরে রাখা।

তবে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো ড. আনু আনোয়ার তা মনে করেন না। তিনি বলেন “এই নতুন ভিসা নীতির সাথে চীনকে মোকাবিলার কোন সম্পর্ক আছে এমনটা এক কথায় বলা চলে না।”

মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, “ওয়াশিংটনে আজকাল স্ট্র্যাটেজির কথা বললেই তা চীনের সাথে জটিলতার লেন্স দিয়ে দেখা হয়। আমার তো মনে হয় অনেকেই যুক্তি দেবেন যে এ ধরনের (ভিসা বিধিনিষেধ আরোপের মতো) নীতি নিলে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, কারণ তা ঢাকাকে চীনের আরো ঘনিষ্ঠ হবার দিকে ঠেলে দিতে পারে, বা এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বেজিং ঢাকার সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। সেটা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের অনুকুল হবে না। বরং বাইডেন প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিতে বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রসার ঘটানোর যে কথা আছে- তার আলোকে একে দেখাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত মনে হয়”

নাইজেরিয়া বা উগান্ডার তুলনায় বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বহুমাত্রিক এবং বাংলাদেশকে এখন দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ বলে মনে করা হয়।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে যে বাংলাদেশে একটা অবাধ-সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক।
আলী রীয়াজ আরো বলছেন- “দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে আছে এবং এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশ তার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে এমন একটা ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিক – যা আসলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।

কারণ চীনের যে একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা তা কেবল অর্থনৈতিক নয় তা একধরনের আদর্শও প্রচার করে। বাইডেন প্রশাসনের ভূ-রাজনৈতিক নীতির একটা দিক হলো চীনের বিরোধিতা করা এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রচার-প্রসার ও তাকে সংহত করা। সেই জায়গাতেই বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ।”

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো ড. আনু আনোয়ার বলছিলেন, কোথাও গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করলে যুক্তরাষ্ট্র তাকে সুরক্ষা দেবার চেষ্টা করে – আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সে অর্থে এটা অনুসৃত হয় না, কারণ ভূ-রাজনীতি ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নের মধ্যে সংঘাত দেখা দিলে এবং আমার দেখা মতে সবসময়ই ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পায়।

কিছু বিশ্লেষক আছেন যারা মনে করেন যে যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার মত যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার পেছনে আসল উদ্দেশ্য এই ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত স্বার্থ – গণতন্ত্র, সুষ্ঠু নির্বাচন বা মানবাধিকার নয়।

গত ২০২১ সালের মে মাসে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বাংলাদেশ যেন মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘কোয়াড’ নামের ‘বেজিং-বিরোধী ক্লাবে’ যোগ না দেয় এবং এটা করলে চীন-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মারাত্মক ক্ষতি হবে।

তার এ মন্তব্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলে একে “অপ্রত্যাশিত” এবং “দুর্ভাগ্যজনক” বলে আখ্যায়িত করেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। বাংলাদেশ অবশ্য ‘কোয়াড’ অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও যুক্তরাজ্যকে নিয়ে গঠিত কোয়াড্রিল্যাটেরাল সিকিউরিটি ডায়ালগে’র অংশ নয়।

তবে এ দেশগুলো যে বাংলাদেশকে বাইডেন প্রশাসনের বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি-র অংশ করতে চায় – তা মার্চ মাসে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার এক বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে।

বিশ্লেষকরা ধারণা করেন, মূলত চীনের অর্থনৈতিক এবং সামরিক প্রভাব ঠেকানোই এই কৌশলের মূল লক্ষ্য। এ প্রেক্ষাপটে পরের মাসেই অর্থাৎ এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের রূপরেখা ঘোষণা করে ঢাকা। তাতে ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব এবং কারো সাথে শত্রুতা নয়’ – এ নীতির ভিত্তিতে ‘ভারসাম্যের’ পথ নেবার কথা ঘোষণা করে বাংলাদেশ।