বাংলা সংবাদ ডেস্ক
২৮ মার্চ ২০২৬, ১২:১৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবায় অনিয়ম-জালিয়াতির অভিযোগ

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেয়ার ও মেডিকেইডে ক্রমবর্ধমান জালিয়াতি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক বড় প্রতারণা মামলা প্রকাশিত হয়েছে। যা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়েছে। নিউইয়র্ক, কুইন্স এবং ব্রঙ্কসসহ বিভিন্ন এলাকায় ধোঁকাবাজি ও জাল বিলিংয়ের ঘটনা নজর কাড়ছে। ফ্যান্টম বিলিং, যেখানে রোগী কখনও চিকিৎসা নেননি, তবুও বিল জমা করা হয়; অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা, যেখানে রোগীর প্রয়োজন ছাড়াই জেনেটিক টেস্ট, স্ক্যান বা দামী চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়; এবং কিকব্যাক ও ঘুষের মাধ্যমে রোগীদের নির্দিষ্ট ফার্মেসি বা ক্লিনিকে পাঠানোর ঘটনা ঘটছে।

 

 

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসেই স্বাস্থ্যখাত জালিয়াতির মামলাগুলোর মোট পরিমাণ ২.৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে বড় একটি ঘটনায় একজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রায় ৯০ মিলিয়ন ডলারের মেডিকেয়ার জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে, যেখানে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা সরঞ্জামের জন্য ভুয়া দাবি করা হয়েছিল। আরেক ঘটনায় একটি ভুয়া মেডিক্যাল ল্যাব পরিচালনার মাধ্যমে ৪৬ মিলিয়ন ডলারের মিথ্যা দাবি জমা দেওয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, ওই ল্যাবটি বাস্তবে কোনো কার্যক্রমই চালাত না।

 

 

মেডিকেইড খাতেও প্রতারণা বাড়ছে। নিউইয়র্কে পরিবহন সেবার নামে ভুয়া বিল দেখিয়ে ১১ লাখ ডলারের বেশি আত্মসাতের অভিযোগে এক ব্যবসায়ী দোষ স্বীকার করেছেন। এছাড়া বৃহৎ পরিসরে জালিয়াতি দমনে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যখাত অভিযান পরিচালিত হয়। এতে ৩২৪ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় এবং মোট ১৪.৬ বিলিয়ন ডলারের জালিয়াতির অভিযোগ উঠে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার জটিলতা, বিপুল অর্থপ্রবাহ, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ও টেলিমেডিসিন নতুন প্রতারণার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রবীণ ও দুর্বল জনগোষ্ঠী সহজে টার্গেট হচ্ছে। ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস, এফবিআই ও সেন্টার ফর মেডিকেয়ার অ্যান্ড মেডিকেইড সার্ভিসেস যৌথভাবে জালিয়াতি দমন করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে সন্দেহজনক বিল শনাক্ত, দোষীদের লাইসেন্স স্থগিত, ব্যাংক হিসাব জব্দ ও ফৌজদারি মামলা চালানো হচ্ছে।

 

 

প্রতারণায় জড়িয়েছেন বাংলাদেশিরাও

 

২০১৭ সালের ডিসেম্বর ব্রুকলিন জেলা অ্যাটর্নির কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক ঘোষণায় নিউইয়র্কের স্বাস্থ্যসেবা অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে, মাত্র তিন বছরে মেডিকেইড ও মেডিকেয়ারসহ সরকারি স্বাস্থ্যবীমা কর্মসূচি থেকে প্রায় ১৪৬ মিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চিকিৎসক ডা. হামিদ আলম। ডা. হামিদ আলম নিউইয়র্কে বসবাসকারী একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত ডায়াগনস্টিক রেডিওলজিস্ট ও নিউরোরেডিওলজিস্ট। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা গ্রহণ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন হাসপাতাল ও মেডিকেল প্রতিষ্ঠানে ডায়াগনস্টিক ইমেজিং সেবায় যুক্ত ছিলেন।

 

 

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি সহ কয়েকজন চিকিৎসক রোগী দেখা ছাড়া হাজার হাজার পরীক্ষার কাগজে স্বাক্ষর দিয়েছেন। তদন্তে প্রকাশিত একটি ফোনালাপে ডা. হামিদ স্বীকার করেন যে তিনি ১৫ হাজারের বেশি পরীক্ষার রিপোর্টে স্বাক্ষর দিতে গিয়ে পিছিয়ে পড়ছেন। বাস্তবে এত বিপুল সংখ্যক পরীক্ষায় স্বাক্ষর দেওয়া অসম্ভব। তদন্তে আরও উঠে আসে, নিম্ন আয়ের এলাকা, গৃহহীন মানুষ বা চাকরিপ্রার্থীদের সামান্য নগদে ক্লিনিকে নিয়ে এসে কাগজে পরীক্ষা সম্পন্ন দেখানো হতো। প্রকৃত রোগীসেবার সঙ্গে এসব কার্যক্রমের কোনো সম্পর্ক ছিল না; উদ্দেশ্য ছিল সরকারি স্বাস্থ্যবীমায় বিল পাঠানো।

 

 

প্রসিকিউশনের মতে, চিকিৎসকদের স্বাক্ষরই এই জালিয়াতিকে আইনি রূপ দিয়েছিল। এসব অর্থ বিভিন্ন শেল কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হতো এবং দামী অ্যাপার্টমেন্ট ও বিলাসবহুল পণ্য কেনা হতো। ডা. হামিদ আলমের চলাচল আদালতের নজরদারির আওতায় ছিল। লং আইল্যান্ডের নিজ বাসভবনে থাকলেও ‘ইলেকট্রনিক শেকল’ ব্যবহার করে জিপিএসের মাধ্যমে তাঁকে নজরদারি করা হতো। আইনি অর্থে তিনি কারাগারের বাইরে থাকলেও পুরোপুরি স্বাধীন ছিলেন না।

 

থেরাপি সেন্টারের আড়ালেও জালিয়াতি

 

নিউইয়র্কের কুইন্স, ব্রঙ্কস ও আশপাশের এলাকায় থেরাপি সেন্টারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বাইরে থেকে এগুলো রোগী ও প্রবীণদের জন্য আশীর্বাদ মনে হলেও, ফেডারেল তদন্তে দেখা গেছে অনেক সেন্টার চিকিৎসাসেবার আড়ালে ইন্স্যুরেন্স জালিয়াতি করছে। প্রতারণার ধরন হলো—বয়স্ক বা অক্ষম রোগীর নামে আদৌ না দেওয়া সেবা প্রদানের বিপরীতে মেডিকেয়ার ও মেডিকেইডে বিপুল বিল জমা দেওয়া। অনেক ভুক্তভোগী জানতেই পারেন না তাদের নাম ব্যবহার করে টাকা নেওয়া হচ্ছে। কিছু সেন্টারে লাইসেন্সবিহীন কর্মী দিয়ে চিকিৎসা করানো হয়, রোগী উপস্থিত না থেকেও থেরাপি সেশন সম্পন্ন দেখানো হয়।

 

 

কুইন্সের ওজন পার্ক এলাকার একজন প্রবীণ বলেন, হাঁটুর ব্যথা নিয়ে তিনি কয়েক দিন থেরাপি সেন্টারে গিয়েছিলেন। পরে জানতে পারেন, তার নামে নিয়মিত বিল জমা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি ভেবেছিলাম ওরা কাগজপত্র ঠিক করছে। পরে বুঝলাম, আমার নাম ব্যবহার করে টাকা তোলা হচ্ছে।” নিউইয়র্কে স্বাস্থ্যসেবা প্রতারণার ইতিহাস নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে থেরাপি সেন্টারকেন্দ্রিক প্রতারণা বেড়েছে। ফিজিক্যাল ও অকুপেশনাল থেরাপি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিযোগ বেশি।

 

 

২০২০ সালে ব্রুকলিনে ফেডারেল মামলায় ১৫ জনের বিরুদ্ধে ১৫ মিলিয়ন ডলারের ভুয়া বিল জমা দেওয়ার অভিযোগ আসে। তদন্তে দেখা গেছে রোগী না দেখেও প্রেসক্রিপশন লেখা, কারাগারে থাকা ব্যক্তির নামেও সেবা প্রদানের ভুয়া নথি তৈরি করা হচ্ছে। কিছু সেন্টার রোগীদের নগদ অর্থ দিয়ে ইন্স্যুরেন্স তথ্য ব্যবহার করায়, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদে রোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রতারণা অভিবাসী কমিউনিটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ভাষাগত সীমাবদ্ধতা ও অজ্ঞতার কারণে অনেক প্রবীণ বুঝতেই পারেন না তাদের নামে কীভাবে ভুয়া বিল জমা হচ্ছে। সম্প্রতি সরকারি সহায়তা তালিকায় বিভিন্ন দেশের অভিবাসীর নাম প্রকাশ হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ফেডারেল ও রাজ্য সরকার থেরাপি সেবায় নজরদারি বাড়াচ্ছে, নতুন অডিট ও নিয়মিত তদন্তের মাধ্যমে প্রতারণা রোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

 

সরকারি নজরদারিতে চ্যালেঞ্জ

 

মেডিকেয়ার ও মেডিকেইডে জালিয়াতি প্রতিরোধে সরকারি নজরদারি বৃদ্ধি করা হলেও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ স্বাস্থ্যখাতে প্রতারণা নিয়ন্ত্রণকে জটিল করে তুলছে। ফেডারেল ও রাজ্য সরকার নিয়মিত অডিট, তদন্ত এবং আইন প্রয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু তবুও প্রতারণা কমানো সহজ হচ্ছে না। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জটিলতা অনেক নতুন ও ছোট থেরাপি সেন্টারকে ফাঁকফোকর খুঁজে বের করে প্রতারণা চালাতে সুযোগ দেয়। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এবং টেলিমেডিসিনের প্রসার ভুয়া সেশন দেখানো আরও সহজ করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগী উপস্থিত না থাকলেও কাগজে-কলমে চিকিৎসা সম্পন্ন দেখানো হচ্ছে। প্রবীণ ও ভাষাগতভাবে সীমিত জনগোষ্ঠী তাদের নামে জমা হওয়া বিল এবং সেবার প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারছেন না। ফলে তারা নিজেই প্রতারণা শনাক্ত করতে পারছেন না।

 

 

 

আইনি ব্যবস্থা যেমন দোষীদের লাইসেন্স স্থগিত করা, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং ফৌজদারি মামলা চালানো হলেও প্রতারণাকারীরা দ্রুত নতুন ক্লিনিক খুলে একই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে। ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস এবং এফবিআই জানিয়েছে যে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে সন্দেহজনক বিল শনাক্ত করছে, তবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার জটিলতা ও নতুন প্রতারণার কৌশলগুলো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করান যে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়, রোগীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, ক্লিনিকের স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তিগত সমাধান একযোগে প্রয়োজন, যাতে সরকারি স্বাস্থ্যবিমার অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হয় এবং দুর্বল জনগোষ্ঠী নিরাপদ থাকে।

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নিয়ম

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি: ২২ অভিবাসীর মৃত্যু, উদ্ধার ২১ বাংলাদেশি

চাঁদে যাওয়ার পথে শেষ ধাপে নাসার আর্টেমিস দল

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবায় অনিয়ম-জালিয়াতির অভিযোগ

ইরান সংঘাতের শেষ কবে, জানালেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বিমানবন্দর নিরাপত্তায় আইস মোতায়েনের ঘোষণা ট্রাম্পের

ট্রান্সফার শিক্ষার্থীদের জন্য দুই বছর ফ্রি টিউশন দিচ্ছে ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটি

বৈশ্বিক দাসত্ব ও শোষন নির্মূলে জোরালো জোরালো আহবান জানাল বাংলাদেশ

বিএনপি পরিবার মিশিগান এর উদ্যোগে অ্যাডভোকেট এটিএম ফয়েজকে সংবর্ধনা

বর্ণবাদ নির্মূলে বৈশ্বিক ঐক্য জোরদার ও অনলাইনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রতিরোধে আন্ত: সংলাপের আহবান জানাল বাংলাদেশ

১০

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান, নিউইয়র্ক সহ বিভিন্ন রাজ্যে আনন্দ-চিত্তে ঈদুল ফিতর উদযাপন করলো প্রবাসী বাংলাদেশীরা

১১

বাংলাদেশিদের ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সতর্কবার্তা

১২

মিশিগানে বাংলাদেশী স্টুডেন্ট কমিউনিটির সংবাদ সম্মেলন অনুষ্টিত

১৩

বিশ্বকাপ টিকিটের উচ্চমূল্য, ফিফার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও মামলা

১৪

ইরান যুদ্ধের দায় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ওপর চাপালেন ট্রাম্প

১৫

ঈদের চতুর্থ দিনেও মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতে পর্যটকদের ঢল

১৬

সিলেটের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে ঈদ শুভেচ্ছা জানালেন কাউন্সিলর প্রার্থী মারজান হোসেন

১৭

ঈদে বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কবার্তা দিল যুক্তরাষ্ট্র

১৮

সেনেগালের শিরোপা বাতিল, চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা মরক্কো

১৯

বিশ্বব্যাপী সব মার্কিন দূতাবাসে নিরাপত্তা পর্যালোচনার নির্দেশ ওয়াশিংটনের

২০