অম্লান দাস সৌরভ
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৫:০৮ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

শারদীয় দুর্গোৎসব ১৪৩২ : মানবিকতা, ভালোবাসা ও ঐক্যের চেতনা দিয়েই আমরা গড়তে পারি সুন্দর সমাজ

দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনে দুর্গতিনাশিনীর আগমন আনন্দে বিহ্বল সমগ্র বিশ্বের হিন্দু সম্প্রদায়। দুর্গাপূজা কবে, কখন, কোথায় প্রথম শুরু হয়েছিল-তা নিয়ে ভারতীয় ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মতভেদ আছে। ভারতের দ্রাবিড় সভ্যতায় মাতৃতান্ত্রিক দ্রাবিড় জাতির মধ্যে মাতৃদেবীর পূজার প্রচলন ছিল। আর্য সভ্যতায় প্রাধান্য ছিল দেবতাদের। অনার্য সভ্যতায় প্রাধান্য ছিল দেবীদের, তারা পূজিত হতেন আদ্যাশক্তির প্রতীক রূপে। মাতৃতান্ত্রিক পরিবারের গঠন, দায়িত্ববোধ ও উর্বরতা শক্তির সমন্বয়ের কথা বিবেচনা করে অনার্য সমাজে গড়ে উঠে মাতৃপ্রধান দেবী সংস্কৃতির ধারণা।

 

 

ভারতে অবশ্য মাতৃরূপে দেবী সংস্কৃতির ধারণা অতি প্রাচীন। ইতিহাস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, প্রায় ২২,০০০ বছর পূর্ব ভারতে প্যালিওলিথিক জনগোষ্ঠি থেকেই দেবী পূজা প্রচলিত শুরু হয়েছিল। হরপ্পা ও মহেন্জোদারো সভ্যতা তথা সিন্ধু সভ্যতায় এসে তা আরো গ্রহণযোগ্য, আধুনিক ও বিস্তৃত হয়। মাতৃপ্রধান পরিবারের মা-ই প্রধান শক্তি, তার নেতৃত্বে সংসার পরিচালিত হয়, তার নেতৃত্বে শত্রু নাশ হয়, আর তাই মাকে সামনে রেখে দেবী বিশ্বাসে গড়ে উঠে, গড়ে ওঠে শাক্ত সম্প্রদায় মত। এই মত অনুসারে দেবী হলেন, শক্তির রূপ, তিনি পরমব্রহ্ম। শাক্ত মতে, কালী বিশ্বসৃষ্টির আদি কারণ। অন্যান্য দেব দেবী মানুষের মঙ্গলার্থে তার বিভিন্ন রূপে প্রকাশ মাত্র।

 

 

মহাভারত অনুসারে, দূর্গা বিবেচিত হন কালী শক্তির আরেক রূপে। পুরাণ মতে, দূর্গাপূজার ইতিহাস আছে কিন্ত ভক্তদের কাছে সেই ইতিহাস প্রামানিক নয়, বিশ্বাসের।        উপমহাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে সিন্ধু ও বেলুচিস্তানে শিবকে দিয়ে যে হিন্দুধর্মের যাত্রা শুরু হয়েছিল, পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে বাংলায় দুর্গা ও কালীকে দিয়ে সে ধর্মযাত্রার সমাপ্ত হয়। এরপর সম্ভবত আর কোন অলৌকিক দেবতার জন্ম হয়নি। প্রাচীন বাঙালীরা ছিল অবৈদিক আর অনার্য। তারা সুপ্রাচীন কাল থেকেই বহু লৌকিক-অলৌকিক দেবদেবীর পূজাঅর্চনা করতো। প্রাচীনকালে দুর্গাপূজা শস্য পূজারূপে বিরাজমান ছিল। পার্বতী-উমা ছিল শস্যপূজার দেবী। পার্বতী-উমা দুর্গারই ভিন্ন ভিন্ন নাম। উমাকে বলা হয় হিমালয়-দুহিতা। যার বাহন সিংহ। সিংহবাহিনী পর্বতকন্যা উমা-পার্বতীই ভারতবর্ষের শক্তি দেবীর প্রাচীন রূপ। এই সিংহবাহিনী পর্বতকন্যা উমা-পার্বতীর সঙ্গে শস্য পূজার ধারা মিশে এক মহাদেবীর সৃষ্টি হয়েছে, তিনিই দুর্গা।

 

 

পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার, উড়িষ্যা কিংবা বাংলাদেশে প্রচলিত “দুর্গোৎসব” মূলতঃ কালিকাপুরাণে বর্ণিত পদ্ধতি নির্ভর, তবে বলা হয়ে থাকে যে, বাংলায় দুর্গোৎসব মূলতঃ বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণ (যার অস্তিত্ব তর্কসাপেক্ষ), কালিকা ও দেবী পুরাণে বিধৃত রীতি অনুযায়ী তিনটি ভিন্নধারায় সম্পন্ন হয়। অনেক সময় আবার মহাকাল সংহিতায় বর্ণিত পদ্ধতির কদাচিৎ অনুসরণ করা হয়, যা তান্ত্রিক দুর্গোৎসব নামে পরিচিত। পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতির জন্য অবশ্য স্মার্ত রঘুনন্দনের দুর্গোৎসবতত্ত্ব ও তিথিতত্ত্বের অনুসরণ করা হয়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী বা শূলপাণি রচিত দুর্গোৎসববিবেক প্রভৃতি স্মৃতিভাষ্য বা মহাকালসংহিতা/কালীবিলাস তন্ত্র বর্ণিত পদ্ধতিরও অনুসরণ করা হয়। আবার বিহারে দুর্গোৎসব মূলতঃ দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী অনুসারে নিষ্পন্ন হয়। শারদীয়া দুর্গাপূজাকে      “অকালবোধন” বলা হয়। কালিকা পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণ অনুসারে, রাম ও রাবণের যুদ্ধের সময় শরৎকালে দুর্গাকে পূজা করা হয়েছিল। হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এই সময়টি তাদের পূজা যথাযথ সময় নয়। অকালের পূজা বলে তাই এই পূজার নাম হয় “অকালবোধন”। এই দুই পুরাণ অনুসারে, রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। কৃত্তিবাস ওঝা তার রামায়ণে লিখেছেন, রাম স্বয়ং দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। তবে রামায়ণের প্রকৃত রচয়িতা বাল্মীকি মুনি রামায়ণে রামচন্দ্রকৃত দুর্গাপূজার কোনো উল্লেখ করেন নি। উপরন্তু রামায়ণের অন্যান্য অনুবাদেও এর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়না। তবে এই প্রচলিত তথ্য অনুসারে স্মৃতিশাস্ত্রসমূহে শরৎকালে দুর্গাপূজার বিধান দেওয়া হয়েছে। হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের মতে, “অকালবোধন শরতে বৈদিক যজ্ঞের আধুনিক রূপায়ণ ছাড়া আর কিছুই না।”

 

 

দুর্গাপূজা বাঙালির অন্যতম বৃহত্তম উৎসব। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি দেবী দুর্গার পূজা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ উৎসব অতিক্রম করেছে কেবল ধর্মীয় সীমারেখা। আজ এটি হয়ে উঠেছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মহোৎসব।

 

 

ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, ১৬শ শতকে জমিদার পরিবারের উদ্যোগে দুর্গাপূজা শুরু হলেও ২০শ শতকে এসে এটি ছড়িয়ে পড়ে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে। শহর ও গ্রামে একযোগে মণ্ডপ, প্রতিমা ও পূজা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা রূপ নেয় গণউৎসবে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এই পূজা ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পায়।

 

 

দুর্গাপূজা মানে কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রাণপ্রবাহ। প্রতিমাশিল্পীরা নান্দনিক ভঙ্গিতে দেবীমূর্তি নির্মাণ করেন। আলোকসজ্জা, শোভাযাত্রা, আর পাঁচদিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মিলিয়ে পূজার মণ্ডপ পরিণত হয় মিলনমেলায়।

 

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুর্গাপূজা আজ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের জন্য উন্মুক্ত। পূজামণ্ডপে মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সবাই অবাধে যোগ দেন। এটি প্রমাণ করে, বাঙালি সংস্কৃতি মূলত সহনশীলতা, সম্প্রীতি ও একতার ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে।

 

 

দেবী দুর্গা প্রতীক অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির বিজয়ের। আজকের বিশ্ব যখন নানা বিভাজন, বৈষম্য ও সহিংসতার মুখোমুখি, তখন দুর্গাপূজার এই শিক্ষাই আমাদের বড় প্রয়োজন। উৎসবটি মনে করিয়ে দেয়-মানবিকতা, ভালোবাসা ও ঐক্যের চেতনা দিয়েই আমরা গড়তে পারি সুন্দর সমাজ।

দুর্গাপূজা তাই কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব নয়, বরং বাংলার সামগ্রিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি আমাদের ঐতিহ্যের ধারক, আর বর্তমান সমাজে সম্প্রীতির বার্তাবাহক।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশের মিডিয়া জগতের কিংবদন্তী কলম সৈনিক সৈয়দ আবদাল আহমেদ প্রধান তথ্য কর্মকতা হলেন প্রবাসী সাংবাদিক তুহিনের অভিনন্দন

নিউইয়র্কের আকাশে এয়ার ট্যাক্সি, ভবিষ্যৎ পরিবহনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞান খাতে আলোড়ন, বোর্ডের সব সদস্য বরখাস্ত

প্রবাসীর বাড়িতে সংঘবদ্ধ ডাকাতির চেষ্টাকালে ডাকাত নিহত

ট্যাক্স রিফান্ড বৃদ্ধি ও বাজারে উত্থান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন প্রচার

শিক্ষার্থী সুরক্ষায় কড়া নজরদারি, ডেট্রয়েট স্কুলে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি চালু

প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির রঙে রাঙা ইউএসবি ২৪ নিউজ বৈশাখী উৎসব

যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসা তিন বছরের জন্য বন্ধের প্রস্তাব, অনিশ্চয়তায় লাখো বিদেশি কর্মী

মিশিগানে বিএনপির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীদের ক্ষোভ প্রকাশ, নতুন নেতৃত্বের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন

মেট্রো ডেট্রয়েটে বাংলাদেশি কমিউনিটির উত্থান, অর্থনীতি ও আবাসনে নতুন শক্তি

১০

বন্ড বাজারে বড় বিনিয়োগ, মার্চে ৫১ মিলিয়ন ডলার খরচ ট্রাম্পের

১১

হোয়াইট হাউসে হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ, বার্তা দিলেন রাষ্ট্রপ্রধানরা

১২

যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়ায় রেড অ্যালার্ট জারি মানবাধিকার সংগঠনের

১৩

বড়লেখায় কালবৈশাখীর তান্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

১৪

শিশুদের ম্যালেরিয়া চিকিৎসার ওষুধে প্রথমবার অনুমোদন দিল ডব্লিউএইচও

১৫

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী ভিসা বন্ধের তালিকায় বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশ

১৬

ফ্লোরিডায় দুই ডক্টরাল শিক্ষার্থীর মৃত্যু, লিমনের রুমমেটের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ

১৭

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আরো সুদৃঢ় সহযোগিতার প্রত্যয় ব্যক্ত করলো বাংলাদেশ- রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান

১৮

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন করা হলো, কমলগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোমিন তরফদারের

১৯

দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টাকালে আটক যুবককে ঘরবাড়িতে হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নিল স্বজনরা

২০