শুভাশিস সিনহা
২৯ জুলাই ২০২৫, ১:০৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

মঞ্চমায়া রেখে চলে গেলেন রতন থিয়াম

রতন থিয়ামের ‘হোয়েন উই ডেড এওয়েকেন’ দেখার পর একটা ঘোর নিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসেছিলাম জাতীয় নাট্যশালার দর্শক সারিতে। নির্দেশক হিসেবে তিনি কিছুই বলেননি। একটা শব্দও না। শুধু কলাকুশলীরা নাট্য শেষে প্রণতি জানানোর পর তিনি এসে মঞ্চের অ্যাপ্রোনে এসে আভূমি প্রণাম জানান দর্শকদের। এই ভাব, এই ভক্তি মণিপুর আর মণিপুরীর পরম্পরায় বাহিত। যাকে আত্মায় ধারণ করে সমকালের নাট্যদর্শনের আঁচে তিনি যে বিভা ছড়িয়েছেন মঞ্চে, তার সৃষ্টির নৈপুণ্যে, বিশ্বের রসিকজন তা ভুলবেন না, কোনোদিনই।

 

 

 

সেদিন শো শেষের বেশ কিছুক্ষণ পর তার সঙ্গে দেখা করার অভিপ্রায়ে গ্রিনরুমে যাই, দেখি এক মৌনপুরী। সবাই কস্টিউম, প্রপস গোছাচ্ছে, কিন্তু কারও মুখে একটা টুঁ শব্দ নেই। আমি আর জ্যোতি কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে দেখলাম। কিন্তু আসল মানুষটার দেখা নাই। একজনকে জিজ্ঞেস করলে তিনি আঙুল ইশারায় দেখিয়ে দিলেন। গিয়ে দেখা মঞ্চের পেছন কামরায় দরজার পাশে এককোণে প্রায়ান্ধকারে চুপচাপ বসে আছেন তিনি। আমি সবিনয় মৃদুকণ্ঠে পরিচয় দিয়ে দু-চারটে কথা বললাম। সেদিনের পুরো সন্ধ্যাটির ঘোর লেগে রইল অনেক দিন। মৃত মানুষের, শিল্পীর আত্মবিলাপের ইবসেনীয় কাহন মণিপুরী বয়ানে কী এক ইন্দ্রজাল বিছিয়েছিল, বিশেষত শেষ দৃশ্যে মূর্তিমান সাদা বরফপ্রায় বহুক্ষণের স্থির শরীরগুলো যখন চমকে দিয়ে মণিপুরী মুদ্রায় লাস্যনৃত্য শুরু করে, হলভর্তি দর্শক তখন এক শিল্পের জাদুজগতে পৌঁছে গিয়েছিল নিশ্চয়ই!

 

 

 

কে জানত দূর শহরের সেই ঘোরলাগা সন্ধ্যা একদিন এসে মিশে যাবে আমাদের প্রত্যন্ত এক গ্রামে। ঝিঁঝিপোকার গুঞ্জরিত এক সন্ধ্যায় ঘোড়ামারা গ্রামের বরষার কাদামাখা পথ বেয়ে অন্ধকারে সহচরদের টর্চের আলো দেখে দেখে তিনি এসেছিলেন আমাদের (মণিপুরী থিয়েটার) নাট্যকুটির নটম-পে। উদ্দেশ্য একটাই আমাদের নাটক দেখা! তার এই উৎসাহী পদযাত্রার সহযাত্রী ও স্পৃহাদায়ী ছিলেন তারই এক সময়ের ছাত্রী নাট্যজন আইরিন পারভীন লোপা। জুনায়েদ ইউসুফও ছিলেন সঙ্গে।

 

 

 

বাঁশ-টিন-মাটির নাট্যকুটিরে প্রচ- গরমে ঘামতে ঘামতে তিনি দেখলেন ‘কহে বীরাঙ্গনা’। দুরু-দুরু বক্ষে তার অনুভব জানার অপেক্ষায় আমরা। কিন্তু তার প্রগাঢ় উচ্ছ্বাসে কেটে গেল দ্বিধা। অনেকক্ষণ কথা বললেন নাটক নিয়ে। রাত্রিবেলা জম্পেশ আড্ডা। ঢাকায় দেখা সেই চুপচাপ থাকা মানুষটা খুলে দিলেন কথার ঝাঁপি। শিল্প যে আত্মার অনুরণনকে নিরন্তর অনুশীলন আর মানুষের গভীর নৈকট্যের সংশ্লেষ এ কথার দীর্ঘ ব্যাখ্যা করেছিলেন, মনে পড়ে।

তিনি শুধু অভিনয়ের নাট্যের কারিগর তো নন, একাধারে কবি, চিত্রশিল্পী, সংগীতজ্ঞ, ডিজাইনার আরও অনেক কিছু। বহুকে ধারণ করে এক নাট্যের অন্তর-বাহির স্ফটিকসম দ্যুতিতে ঝলমলাতেন বিশাল ক্যানভাসে, চক্রব্যূহ, ঋতুসংহার, ম্যাকবেথ কতই না সৃষ্টিতে।

 

 

মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের এক উপকণ্ঠে গড়ে তুলেছিলেন কোরাস রেপার্টরি থিয়েটার। স্থানীয় শিল্পপ্রাণ মানুষদের নিয়ে যথাযথ অনুশীলন ও সাধনার মধ্য দিয়ে বিশ্বমানের পেশাদার থিয়েটার তৈরি ছিল তার লক্ষ্য। মণিপুরীরা ঐতিহ্যগতভাবেই নৃত্য-সংগীত-নাট্য-অভিব্যক্তিময়। রতন থিয়ামের জন্মও হয়েছিল মণিপুরে পুরোদস্তুর এক শিল্পী পরিবারে। তার বাবা থিয়াম তরুণকুমার ছিলেন ধ্রুপদি মণিপুরী নৃত্যের এক সম্মানিত গুরু, তার মা বিলাসিনী দেবী ছিলেন একজন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী। পারিবারিকভাবেই তিনি শিল্প ও শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন। মণিপুরীদের প্রাকৃত আর বৈষ্ণব ধর্মের সংশ্লেষে নবতর মণিপুরী সংস্কৃতির অন্তর্গত শক্তিটাকে তিনি নাট্য-অভিনয়ে সঞ্চারিত করে তুলেছিলেন, মিথের ঠিক পাঠগত বিনির্মাণ (Texual Reconstruction) নয়, বরং পাঠের দৃশ্যগত রূপান্তরে (Visual Reformartion) তার আগ্রহ ছিল বেশি। টেক্সটকে বজায় রেখেই নাট্য যেখানে সীমা পেরিয়ে যায় অর্থ ও উপলব্ধির, অভিনেতাদের নিখাদ, গভীর, অন্তর্লুপ্ত (Impersonalised) অভিনয়ের শক্তি, সংগীত ও বাদ্যের স্বকীয় বিন্যাসে, আবহে। শিল্পের আপাত সব সাজসজ্জা, করণকৌশলকে ছাপিয়ে একটা নিগূঢ় দার্শনিক অভিপ্রায় সেখানে স্পন্দিত হয়ে ওঠে।

 

 

এই কুশলী নাট্যকলাকার শাস্ত্রীয় তত্ত্বের অনুসন্ধানে পর্যায়ক্রমে ছাত্র-শিক্ষক দুই পরিচয়েই তৎপর ছিলেন দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায়। সংগীত নাটক একাডেমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন, তাই শুধু নয়, ভারতের গুরুত্বপূর্ণ এ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সাময়িক দায়িত্বও নিয়েছিলেন তিনি। ভারত সরকারের সম্মানজনক পদ্মশ্রী খেতাবেও ভূষিত হয়েছিলেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক এসব অর্জন দিয়ে রতন থিয়ামকে প্রকৃতভাবে অলংকৃত করা যাবে না। তার অলংকার তার নাট্যমুদ্রা, বয়ানভাষা, জাদুকরি নাট্যমুহূর্তাবলি, জীবনের অন্তঃক্ষরা ব্যাপ্ত রূপকল্প, দূরপুরাণের জীবন্ত নয়াভাষ্য, ঐতিহ্যের নিত্যসঞ্চরণ।

 

 

মণিপুরের আরেক অসামান্য নাট্যনির্দেশক কানাইলাল হিশনাম যেমন খুব সীমিত আয়োজনে শরীরী ভাষার ব্যাপ্ত ব্যঞ্জনায় মঞ্চে নাট্য রচনা করেছেন (যেমন কর্ণ, দ্রৌপদী, ডাকঘর), রতন থিয়াম সাধারণত তেমনটা করেননি। তিনি বিপুলতার মধ্যেই কহতব্যকে ধরতে চেয়েছেন। (চক্রব্যূহ, ঋতুসংহার, ম্যাকবেথ), তবে তা নিছক আয়োজনমাত্র নয়, দৃশ্যের চমক তৈরিই তার লক্ষ্য নয়, প্রতিটি দৃশ্যকল্পেই টেক্সটের অন্তর্বিচ্ছুরণ (Inner Texuality) ঘটান, চক্রব্যূহে মঞ্চে রথের অবতারণাও তাই বাহুল্য মনে হয় না।

 

 

সবকিছুর পরও তিনি নাট্যযাত্রায় সবসময় শিকড়ের সন্ধান করেছেন। “……Pioneer figure in the ÔTheatre of RootsÕ movement, Thiyam was best known for fusing traditional Manipuri performance styles with contemporary theatrical forms, crafting a distinctive stage language that earned him critical acclaim both in India and abroad. – India Today)

 

 

১৯৭০ সালে শুরু হওয়া ভারতের শিকড়ের থিয়েটার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ছিলেন তিনি। তিনি মনে করতেন, নাটক করার জন্য শুধু অ্যাক্টর-থিওলজি বা অ্যাক্টর-মেথডোলজি নিয়ে কাজ করলে সেটা কোনোদিন সাকসেস হতে পারে না। নাটক করার জন্য কয়েকটা জিনিস জানতে হবে, কী লেখা হয়েছে, কে লিখেছে, বিষয়টা কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে ইত্যাদি। আসল কথা হচ্ছে, আমরা যেভাবে ইবাদত বা পুজো করে থাকি, সেই রকম আমাদের একটা নিত্য উপাসনা বা পূজাপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। না হলে অভিনেতা দীর্ঘদিন অভিনয় করতে পারবেন না। বিশ্বরঙ্গমঞ্চে তিনি সমাদৃত, উপমহাদেশে কিংবদন্তিতুল্য, কিন্তু আচারে স্বভাবে শান্ত, সৌম্য, ধ্যানী এক শিল্পী।

 

 

২৩ জুলাই ২০২৫ তারিখে ৭৭ বছর বয়সে  তিনি এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন, কিন্তু শিল্পরসিকের মানসলোকে তিনি অমর হয়ে থাকবেন, মঞ্চে তার সৃষ্ট সকল ঘোর নিয়ে, মানবিক পৃথিবীর অপার্থিব মোহ-মায়ার রূপাবলিতে জড়িয়ে। আমরা আপনাকে মনে রাখব, রতন থিয়াম। গভীর শ্রদ্ধায়।

-লেখক: কবি, নাট্যকার ও নির্দেশক

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বড়লেখায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে ইয়াবাসহ পাঁচজন আটক

অভিযানে নতুন ইতিহাস গড়ে দেশে ফিরছে মার্কিন রণতরি ‘ইউএসএস ফোর্ড

ডেমোক্রেটিক পার্টি লিডার ড. নাজ হাসান শাহীনের আমন্ত্রণে সভা ও ডিনারপার্টি অনুষ্ঠিত

যুক্তরাষ্ট্রের স্মারক পাসপোর্টে যুক্ত হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ছবি

বাংলাদেশের মিডিয়া জগতের কিংবদন্তী কলম সৈনিক সৈয়দ আবদাল আহমেদ প্রধান তথ্য কর্মকতা হলেন প্রবাসী সাংবাদিক তুহিনের অভিনন্দন

নিউইয়র্কের আকাশে এয়ার ট্যাক্সি, ভবিষ্যৎ পরিবহনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞান খাতে আলোড়ন, বোর্ডের সব সদস্য বরখাস্ত

প্রবাসীর বাড়িতে সংঘবদ্ধ ডাকাতির চেষ্টাকালে ডাকাত নিহত

ট্যাক্স রিফান্ড বৃদ্ধি ও বাজারে উত্থান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন প্রচার

শিক্ষার্থী সুরক্ষায় কড়া নজরদারি, ডেট্রয়েট স্কুলে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি চালু

১০

বর্নিল আয়োজনে মিশিগানে বৈশাখী উৎসব উদযাপন

১১

যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসা তিন বছরের জন্য বন্ধের প্রস্তাব, অনিশ্চয়তায় লাখো বিদেশি কর্মী

১২

মিশিগানে বিএনপির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীদের ক্ষোভ প্রকাশ, নতুন নেতৃত্বের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন

১৩

মেট্রো ডেট্রয়েটে বাংলাদেশি কমিউনিটির উত্থান, অর্থনীতি ও আবাসনে নতুন শক্তি

১৪

বন্ড বাজারে বড় বিনিয়োগ, মার্চে ৫১ মিলিয়ন ডলার খরচ ট্রাম্পের

১৫

হোয়াইট হাউসে হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ, বার্তা দিলেন রাষ্ট্রপ্রধানরা

১৬

যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়ায় রেড অ্যালার্ট জারি মানবাধিকার সংগঠনের

১৭

বড়লেখায় কালবৈশাখীর তান্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

১৮

শিশুদের ম্যালেরিয়া চিকিৎসার ওষুধে প্রথমবার অনুমোদন দিল ডব্লিউএইচও

১৯

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী ভিসা বন্ধের তালিকায় বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশ

২০