প্রকৃতিকন্যা সিলেটে প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় প্রশাসনের চরম অবহেলা খুব স্পষ্ট। জলাশয় ভরাট, পাহাড় টিলা কেটে সাবাড় করায় একদিকে যেমন প্রতিবছর পিছু নিচ্ছে দফায় দফায় দীর্ঘস্থায়ি জলাবদ্ধতার ভয়, অন্যদিকে সংঘবদ্ধ বালু পাথর লুটপাটে ধংসের মুখে পড়েছে বিখ্যাত পর্যটন স্পটগুলো।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে এলাকা এবং জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র সাদাপাথর, স্থান দুটি একসময় ছিল সিলেটের গর্ব, প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের প্রতীক। দেশের বৃহত্তম বালু ও পাথরের ভাণ্ডার ছিল এটি। অন্যদিকে স্বচ্ছ জলরাশি ও পাহাড়ঘেরা সৌন্দর্যের মুগ্ধতা ছুঁয়ে যেত দর্শনার্থীরা। অথচ আজ এই স্থানগুলো হয়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ লুটপাট চক্রের ক্রীড়াভূমি। প্রশাসনের নীরবতা, আইনের শিথিল প্রয়োগ এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের সন্দেহজনক নির্লিপ্ততা, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তা আবারও প্রশ্নের মুখে।
পাহাড়ের পাদদেশ হওয়ায় বৃষ্টি নামলেই শুরু হয় পাহাড়ি ঢল। ঢলের পানি নামার সঙ্গেই সাদাপাথর এলাকায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে শত শত নৌকা। তবে তা পর্যটক নয়, পাথর লুটপাটের জন্য। প্রশাসনের চোখের সামনে চলছে প্রাকৃতিক পাথর আহরণ, নৌকা থেকে চাঁদাবাজি। প্রতিবাদ করলে চলে হয়রানি, মারধর। প্রশ্ন জাগে, এ লুটপাটের দায় কে নেবে?
ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে এক সময় রেলওয়ের সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন সেখানে প্রতিদিন শ শ মজুর খুঁড়ে তুলছে পাথর। যদিও কোনো বৈধ অনুমতি নেই। ভারি মেশিন দিয়ে চলছে হরদম পাথর উত্তোলন। ্এখানে বড় অংকের চাঁদা তোলে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী, যাদের নেপথ্যে প্রশাসনের একাংশের যোগসাজশ থাকার অভিযোগ স্থানীয়দের মুখে মুখে। বিজিবি ক্যাম্পের পাশ দিয়েই পাথর বোঝাই নৌকা যায়, চাঁদা তোলা হয়, কিন্তু বাধা নেই।
সাদাপাথর জাতীয় সম্পদ। একে কেউ এককভাবে ব্যবহার করার অধিকার রাখে না। কিন্তু চাঁদাবাজ গোষ্ঠী, অবৈধ উত্তোলনকারী, প্রশাসনের একাংশ এবং নীরব রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের মদদে এই সম্পদ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে। পর্যটন ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রশাসনের বক্তব্য বনাম বাস্তবতা :
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন,‘বড় ধরনের অভিযান আসছে।’বিজিবির শীর্ষ কর্তা জানিয়েছেন, ‘নজরদারি বাড়ানো হবে।’পুলিশও বলেছে, ‘আমরা জানি না।’ কিন্তু স্থানীয়রা জানেন, তাঁরা দেখেন, তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। প্রশ্ন উঠছে : কেন এগুলো বন্ধ হচ্ছে না?
মাঝে মধ্যে যে অভিযান হয় না, তাও নয়। কিন্তু সেই সব অভিযান তেমন কাজে আসছে না। এখন প্রয়োজন হচ্ছে স্থায়ী ও কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ।
এখন আর সময় নেই দেখার বা বলার যে, আমরা জানি না! এখন প্রয়োজন প্রশাসনিক সদিচ্ছা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ। ভোলাগঞ্জ ও সাদাপাথর রক্ষায় সময়োচিত সিদ্ধান্ত না নিলে এর দায় শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও আমাদের ওপর চাপাবে।
সিলেটের নদী-পাহাড় সকল জাতীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার, কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে হবে সর্বাগ্রে যাঁদের হাতে ক্ষমতা তাঁদের। পরিবেশ ও নদী-পাহাড় রক্ষায় সক্রিয় সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাপ্রবাহে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ভোলাগঞ্জ ও সাদাপাথরের মতো প্রাকৃতিক এলাকাগুলোর উপর এত বড় আকারে অবৈধ হস্তক্ষেপ শুধু পরিবেশ নয়, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ এবং পর্যটন অর্থনীতির ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
সচেতন মহল মনে করছেন, প্রশাসনের দায়সারা মনোভাব এবং প্রভাবশালী চক্রের ছত্রচ্ছায়া না থামালে ভবিষ্যতে এই অঞ্চল পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে, যার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া অসম্ভব হয়ে উঠবে।
-সাংবাদিক ও লেখক
-বিভাগীয় সমন্বয়ক, প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব।
মন্তব্য করুন