বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপাজয়ী মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীকে ১৯৯৯ সালে বিবিসি স্পোর্টস পারসোন্যালিটি অব দ্য সেঞ্চুরি বা শত বছরের সেরা ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে ঘোষণা করে। বক্সিং রিংয়ের ভেতরে ও বাইরে দুর্দমনীয় সাহস তাঁকে মানুষের মনে অমর করে রেখেছে। কিংবদন্তি মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী ১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন।
বক্সিং রিংয়ে প্রজাপতির মতো ভেসে বেড়াতেন, প্রতিপক্ষের শরীরে মৌমাছির হুলের মতো জ্বালা ধরিয়ে দিত তাঁর ঘুষি। প্রতিপক্ষকে সব সময় ব্যতিব্যস্ত করে রাখত তাঁর হাত আর চঞ্চল পা দুটি। তাই মোহাম্মদ আলী সবার চেয়ে আলাদা। আমেরিকার কেনটাকির লুইসভিলে জন্ম নেন আলী। তাঁর বাবার নাম ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে সিনিয়র। তাঁর নামেই তখন আলীর নাম রাখা হয় ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে জুনিয়র। মায়ের নাম ওডেসা গ্রেডি ক্লে।
প্রথম তাঁকে মুষ্টিযুদ্ধে নিয়ে আসেন পুলিশ ও মুষ্টিযুদ্ধ প্রশিক্ষক জো ই মার্টিন। সাইকেল চুরি যাওয়ায় রাগে ফুঁসতে থাকা ১২ বছরে বালক আলীর মুখোমুখি হন তিনি। তখনই তাঁর নজর কাড়েন আলী।
মোহাম্মদ আলী ১৯৫৪ সালে প্রথম অপেশাদার বক্সিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। পরে ছয়বার কেনটাকি গোল্ডেন গ্লাভস, দুবার জাতীয় গোল্ডেন গ্লাভস জেতেন। ১৯৬০ সালে রোমের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে মুষ্টিযুদ্ধ প্রতিযোগিতায় লাইট হেভিওয়েট বিভাগে স্বর্ণপদক জেতেন।
১৯৬০ সালের ২৯ অক্টোবর পেশাদার বক্সিং প্রতিযোগিতায় আলী প্রথমবারের মতো অংশ নেন। ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ১৯-০ জয়ের রেকর্ড করেন আলী। এর মধ্যে ১৫টি নকআউটে জয়।
১৯৬৪ সালে ছয় রাউন্ডের মাথায় সনি লিস্টনকে পরাজিত করে বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নেন ২২ বছরের আলী। চমকে দেন সবাইকে। ওই বছরই নেশনস অব ইসলামে যোগ দেন, নিজের নাম রাখেন মোহাম্মদ আলী। ১৯৭৫ সালে তিনি সুন্নি ইসলামের অনুসারীতে পরিণত হন। পরের তিনটি বছর একের পর এক জয়ে বক্সিং জগতে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে নিলেন আলী। ১৯৬৫ সালের ২৫ মে আবার লিস্টনের সঙ্গে লড়েন আলী। এবার প্রথম রাউন্ডেই নকআউট করেন তাঁকে। পরে হারালেন ফ্লয়েড প্যাটার্সন, হেনরি কুপার, ব্রায়ান লন্ডন প্রমুখকে। ১৯৬৬ সালের ১৪ নভেম্বর ক্লেভারল্যান্ড উইলিয়ামসকে হারালেন তৃতীয় রাউন্ডের মাথায়।
১৯৬৭ সালের ২৮ এপ্রিল মোহাম্মদ আলীকে আমেরিকার সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির জন্য ডাকা হয়। তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য ডাকা হচ্ছিল জনসাধারণকে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানালেন আলী। এতে তাঁর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান খেতাব কেড়ে নেওয়া হয়। মুষ্টিযুদ্ধ করার সনদ বাতিল হয়। জীবনের সেরা সময়ে চার বছর কোনো ধরনের বক্সিং প্রতিযোগিতায় নামতে পারেননি। তবে তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিষয়ে নিজের মতামতে সব সময় অটল ছিলেন।
বক্সিং জগতে ফিরে ১৯৭১ সালে জো ফ্রেজিয়ারকে চ্যালেঞ্জ জানান আলী। তাঁর অবর্তমানে নতুন হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন হন ফ্রেজিয়ার। ‘ফাইট অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে ওই লড়াইয়ে পরাজিত হন আলী।
১৯৭৪ সালের অক্টোবরে আলী চ্যালেঞ্জ জানান জর্জ ফোরম্যানকে। তখন তিনি বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন।
প্রতিযোগিতাটি পরিচিতি পায় রাম্বল ইন দ্য জাঙ্গল নামে, এটি হয় আফ্রিকার জায়ারে (বর্তমান রিপাবলিক অব কঙ্গো)। অষ্টম রাউন্ডে ফোরম্যানকে নকআউট করে বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ পুনরুদ্ধার করেন আলী।
পরের আড়াই বছরে খ্যাতির চূড়ায় ছিলেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আলী। প্রতিপক্ষ দাঁড়াতেই পারছিলেন না তাঁর সামনে। ১৯৮১ সালের পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে শেষ লড়াইয়ে ট্রেভর বারবিকের কাছে পরাজিত হন।
পেশাদার মুষ্টিযুদ্ধে আলী ৬১টি লড়াইয়ে অংশ নিয়ে ৫৬ টিতে জেতেন। মোহাম্মদ আলীর মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে সেরা সময়টি (১৯৬৪-১৯৭৪) নিয়ে ২০০১ সালে মুক্তি পায় চলচ্চিত্র ‘আলী’। তাঁর জীবনের গল্প উঠে আসে ২০১৪ সালের তথ্যচিত্র ‘আই এম আলী’তে। ২০০৫ সালে তাঁকে দেওয়া হয় প্রেসিডেনসিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম পদক। মোহাম্মদ আলী ২০১৬ সালের ৩ জুন ৭৪ বছর বয়সে অ্যারিজোনার স্কটসডেলের মারা যান।
বাংলাদেশে মোহাম্মদ আলী: বক্সিং কিংবদন্তি মোহাম্মদ আলী ১৯৭৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে আসেন।
মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে সেদিন ঢাকায় আসেন তাঁর স্ত্রী ওই সময়ের বিখ্যাত মডেল ভেরোনিকা পরশে, মেয়ে লায়লা আলী, ভাই, বাবা ও মা। এ সময় তেজগাঁও বিমানবন্দরে ভক্তরা তাঁকে ঘিরে ধরেন।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আলীকে নিয়ে গাড়ির শোভাযাত্রা রওনা দেয় রাষ্ট্রীয় অতিথিশালার দিকে। আলী ও ভেরোনিকা বসেন শোভাযাত্রার অগ্রভাগে থাকা ১৯১৯ সালে তৈরি এককালে দিনাজপুরের মহারাজা গিরিজা নাথের হুড-খোলা রোলস রয়েস গাড়িতে। পাশে জনতার ঢল।
ঢাকা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের ১২ বছর বয়সী মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দীনের সঙ্গে মুষ্টিযুদ্ধে অংশ নেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন মোহাম্মদ আলী।
ঢাকা থেকে বিশেষ বিমানে কক্সবাজারে যান মোহাম্মদ আলী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা। চট্টগ্রামে এক নৈশভোজে অংশ নেন মোহাম্মদ আলী।
সফরসঙ্গীদের নিয়ে নৌবিহারের জন্য মোহাম্মদ আলী পাগলা ঘাটে যান। আলীর জন্য স্টিমার গাজী মনোরমভাবে সাজানো হয়েছিল। গাজীতে করে আলী রওনা দেন মুন্সিগঞ্জের দিকে। স্টিমার গাজীতে করে আলী প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে ঘুরে বেড়ান বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীতে।
সে সময় মোহাম্মদ আলীকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি পাসপোর্ট দেওয়া হয়। তাঁর পাসপোর্টের নম্বর ছিল সি ০৫৭০৯৩।
একটি প্রামাণ্যচিত্রের জন্য লন্ডনভিত্তিক সেভেন গ্রুপের উদ্যোগে ঢাকায় আসেন মোহাম্মদ আলী। মোহাম্মদ আলীর সফর ছিল ৫ দিনের।
বাংলাদেশ থেকে ফিরে গিয়ে বলেছিলেন, “স্বর্গ দেখতে চাইলে বাংলাদেশে যাও।”
বক্সিং রিংয়ে আলী কেমন ছিলেন? এক কথায় উত্তর, প্রজাপতির মতো নেচে নেচে মৌমাছির মতো হুল ফুটাতেন। বক্সিংকে উন্নীত করেন শিল্পের পর্যায়ে।
মন্তব্য করুন