বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেট খাত বিগত দুই দশকে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। আধুনিক নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ, প্রবাসী আয় ও মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে এই খাতটি হয়ে উঠেছে একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগ ক্ষেত্র। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি এ খাতটিতে রয়েছে কিছু ঝুঁকি, যেগুলো না বুঝে বিনিয়োগ করলে বিপদের সম্ভাবনাই বেশি।
প্রথমেই যদি সম্ভাবনার কথা বলি, তাহলে ঢাকাকে ঘিরে তৈরি হওয়া একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প যেমন মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, নবনির্মিত স্যাটেলাইট টাউন (পূর্বাচল, ঝিলমিল) প্রভৃতি রিয়েল এস্টেটের বাজারে নতুন গতি এনেছে। এসব অঞ্চলে প্লট, ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেসের চাহিদা বাড়ছে দ্রুত গতিতে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং নগর অভিবাসন রিয়েল এস্টেট খাতকে আরও বেশি চাহিদাসম্পন্ন করে তুলছে। এই খাতে প্রবেশের প্রাথমিক সুবিধা হলো স্থায়ী ও দৃশ্যমান সম্পদ তৈরি হয়, যার বাজারমূল্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে। অনেকেই এটিকে “low risk, long-term gain” বলে মনে করেন। তবে এই ধারণা সবসময় বাস্তবতা নয়।
কারণ এই খাতে রয়েছে একাধিক মৌলিক ঝুঁকি। প্রধানতম ঝুঁকি হচ্ছে জমি ও ফ্ল্যাটের মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা। অনেক সময় একটি সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে একাধিক পক্ষের দাবি দেখা যায়, যা আইনি ঝামেলায় রূপ নেয়। দলিল জালিয়াতি, মিউটেশন জটিলতা ও খতিয়ান নিয়ে বিভ্রান্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনে। দ্বিতীয়ত, বাজারে রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মান ও বিশ্বস্ততা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বহু কোম্পানি বুকিং নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প হস্তান্তর করতে ব্যর্থ হয়। কেউ কেউ আবার প্রতারণামূলকভাবে প্রকল্প গুটিয়ে ফেলে, যার শিকার হন সাধারণ মানুষ। সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি ও নীতিমালার প্রয়োগের অভাব এ সমস্যাকে আরও জটিল করেছে।
তৃতীয়ত, রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগের সাথে জড়িয়ে আছে ব্যয়বহুল আর্থিক প্রক্রিয়া। রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প ডিউটি, ট্যাক্সসহ নানা খাতে নিয়মের অতিরিক্ত খরচ হয়, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তবুও, ভবিষ্যতের কথা ভাবলে এই খাতকে উপেক্ষা করা যায় না। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন বড় শহরে বসবাস ও সম্পদ অর্জনে আগ্রহী। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্মার্ট সিটি প্রকল্প ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন এলাকাগুলোতে আবাসনের চাহিদা বাড়ছে। যারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী, তাদের জন্য সঠিক জায়গায়, সঠিক সময়ে ও সঠিক কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তবে বিনিয়োগের আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই যাচাই করা উচিত। প্রকল্পের জমির কাগজপত্র, ডেভেলপার কোম্পানির আগের প্রকল্পের ইতিহাস, প্রতিশ্রুত সময়সীমা, হস্তান্তরের শর্তাবলি এবং রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত খরচ—সবকিছু স্পষ্টভাবে বুঝে তবেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
এছাড়া, বাংলাদেশ রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন (রেডা) অনুমোদিত কোম্পানিতে বিনিয়োগ করাটা তুলনামূলক নিরাপদ। রিয়েল এস্টেট খাত বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার ক্ষেত্র হলেও এতে প্রবেশ করতে হবে জ্ঞান, সচেতনতা ও সতর্কতার সঙ্গে। বিনিয়োগকারীরা যদি আবেগের চেয়ে বিশ্লেষণকে প্রাধান্য দেন, তাহলে এই খাত শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, বরং দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারবে। অতিমূল্যায়নে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। দলিল জালিয়াতি, মালিকানা বিরোধ এবং দীর্ঘস্থায়ী মামলা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে যথাযথ আইনি সহায়তা ছাড়া বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ। রিয়েল এস্টেট কোম্পানির যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাব এবং সময়মতো প্রকল্প ডেলিভারির ব্যর্থতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করছে। অনেক প্রকল্প সময়মতো শেষ না হওয়ায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগ লাভজনক হলেও তা হতে হবে সচেতন ও তথ্যভিত্তিক। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রকল্প যাচাই এবং আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করেই এই খাতে বিনিয়োগ করা উচিত। একমাত্র তখনই এই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে। রিয়েল এস্টেট ব্যবসা হলো এমন এক খাত, যেখানে জমি, ভবন, অ্যাপার্টমেন্ট বা বাণিজ্যিক স্থাপনার ক্রয়-বিক্রয় এবং উন্নয়ন ঘটে। এটি শুধুমাত্র একটি লাভজনক ব্যবসা নয়—বরং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নগর উন্নয়ন এবং মানুষের বসবাসের মান উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রিয়েল এস্টেট একসময় সীমিত পরিসরে ছিল, কিন্তু এখন এটি একটি সুগঠিত ও সম্ভাবনাময় শিল্পে রূপ নিয়েছে। তবে সফলভাবে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা করতে হলে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, আইনগত জ্ঞান এবং গ্রাহকের আস্থা অর্জনের দক্ষতা। এই ব্যবসা শুধু অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, বরং এটি মানুষের স্বপ্ন পূরণ, নিরাপদ আশ্রয় এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাণের একটি দায়িত্বশীল ও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
মোঃ জাকির হোসেন
মন্তব্য করুন