প্রথম দিনের আলোচনায় উঠে এলো বাজারভিত্তিক অর্থায়ন, উচ্চ সুদের হারের ঝুঁকি ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ আয়োজনে ২১ এপ্রিল শুরু হয়েছে ২০২৫ সালের স্প্রিং মিটিংস। বিশ্বব্যাপী ১৯১টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও সাংবাদিকদের অংশগ্রহণে এই বৈঠক চলবে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত।
প্রথম দিনেই আয়োজিত হয় কনফারেন্স অন মার্কেট-বেইজড ফাইন্যান্স, যেখানে আলোচনা হয় আধুনিক আর্থিক বাজার কাঠামো, বন্ড, ETF (Exchange Traded Fund), এবং ফিনটেক খাতকে ঘিরে নতুন ঝুঁকি ও সম্ভাবনা নিয়ে। এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় আইএমএফ সদর দপ্তরের মিটিং হল A&B-তে। বক্তারা যেসব বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন: এই সেশনে বক্তারা বলেন, বাজারভিত্তিক অর্থায়ন (Market-Based Finance) ভবিষ্যতের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ETF এবং কর্পোরেট বন্ড ব্যবস্থায় তারল্যের (liquidity) স্বল্পতা অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। গীতা গোপীনাথ (IMF) বলেন, “ETF গুলো আজকের দিনে বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হলেও, হঠাৎ বাজার পতনের সময় এগুলোর লেনদেন কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের এখনই সঠিক নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। সামারা কোহেন (ETF and Index Investments expert) জানান, “ETF বাজারে স্বচ্ছতা আনে, খরচ কমায় এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রবেশাধিকার বাড়ায়। তবে নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর অভাব হলে এগুলো ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
ভেরেনা রস (ইউরোপিয়ান সিকিউরিটিজ অ্যান্ড মার্কেট অথরিটি) বলেন, “বন্ড মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রবৃদ্ধির চাপ বাড়ে। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জরুরি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য বাজারভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থা, যেমন বন্ড ইস্যু, ETF গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি, এবং স্বচ্ছ মুদ্রানীতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফ থেকে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে। এই ঋণ পেতে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং ব্যাংকিং খাতে সংস্কারসহ একাধিক শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে। এই আলোচনাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
বিকেলের আলোচনাগুলো:
১) Debt-at-Risk
বক্তা: ফাইজান কিসাত, ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্ট, IMF
আলোচনা হয় কীভাবে বৈদেশিক ঋণের চাপ কমিয়ে দেশে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায়।
২) Corporate Sector Vulnerabilities in a High-Interest Rate World বক্তারা: ব্রুনো আলবুকারকিউ (IMF), আনজুম রোশা (আইএমএফ লিগ্যাল ডিপার্টমেন্ট) এখানে আলোচ্য ছিল উচ্চ সুদের হারের প্রেক্ষাপটে কর্পোরেট দেউলিয়াপনার ঝুঁকি, বেসরকারি খাতের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, এবং সরকারের ভূমিকাকে ঘিরে নতুন বাস্তবতা। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে, আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের এই বৈঠক একাধিক দেশের জন্য নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের জন্য এই মিটিং শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিক থেকেই নয়, বরং বৈদেশিক ঋণ, বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন ও আর্থিক স্বচ্ছতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইএমএফ-এর পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে যদি ভবিষ্যতে টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে হয়, তাহলে তার জন্য শক্তিশালী বাজারভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থা, কর কাঠামোর সংস্কার, এবং স্বচ্ছ আর্থিক নীতিমালা গ্রহণ করা অপরিহার্য। আগামী দিনগুলোতে এই সম্মেলনে আরও আলোচনা হবে জলবায়ু পরিবর্তন, বৈদেশিক সহায়তা, দারিদ্র্য বিমোচন, এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে ঘিরে।
ওয়াশিংটন, ডি.সি.
মন্তব্য করুন