যুক্তরাজ্যে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম চালু করেছে সরকার। আজ (২৫ ফেব্রুয়ারি) থেকে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ ৮৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ইটিএ)। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ডিজিটাল অনুমতি ব্যবস্থা অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, সহজ ও নিরাপদ করবে। তবে নতুন নিয়মে বিপাকে পড়েছেন দ্বৈত নাগরিকরা।
ইটিএ কী এবং কারা লাগবে?
ইটিএ হলো যুক্তরাজ্যে ভ্রমণের আগে নেওয়া একটি ডিজিটাল অনুমতি। এতদিন যেসব দেশের নাগরিকরা ভিসা ছাড়াই যুক্তরাজ্যে যেতে পারতেন, এখন তাদেরও ইটিএ নিতে হবে। অনুমোদন পেলে একজন ভ্রমণকারী সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে থাকতে পারবেন। ইটিএর মেয়াদ থাকবে দুই বছর বা পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত।
এই সময়ের মধ্যে একাধিকবার যাওয়া–আসা করা যাবে। পর্যটন, ব্যবসা বা স্বল্পমেয়াদি পড়াশোনার উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করা যাবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি কাজ বা পড়াশোনার জন্য আগের মতোই ভিসা প্রয়োজন হবে। যাদের আগে থেকেই ভিসা দরকার, তাদের ইটিএ লাগবে না। ব্রিটিশ বা আইরিশ নাগরিকদের ইটিএ বা ভিসা কোনোটিই প্রয়োজন হবে না। এছাড়া ‘সেটেলড স্ট্যাটাসধারী’ ও ফ্রান্স থেকে শিক্ষা সফরে আসা শিশুদের মতো কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড় রয়েছে।
আবেদন প্রক্রিয়া ও খরচ
ইটিএর জন্য আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ পাউন্ড, যা ভবিষ্যতে ২০ পাউন্ডে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আবেদনের জন্য সরকার গুগল প্লে বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকে সরকারি অ্যাপ ডাউনলোড করার পরামর্শ দিয়েছে। আবেদনকারীকে পাসপোর্ট ও যোগাযোগের তথ্য, একটি উপযুক্ত ছবি এবং কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
সরকারের দাবি, অধিকাংশ আবেদনকারীর ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের মধ্যেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদন পাওয়া যাবে। তবে ভ্রমণের অন্তত তিন কর্মদিবস আগে আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইটিএ আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে কারণ জানানো হবে এবং পুনরায় আবেদন করা যাবে। তবে চূড়ান্তভাবে বাতিল হলে আপিলের সুযোগ নেই; সেক্ষেত্রে ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে।
বাস্তবায়ন কীভাবে হবে?
যাত্রার সময় চেক-ইনের সময় বৈধ ইটিএ না থাকলে বোর্ডিংয়ে বাধা দেওয়া হতে পারে। বিমান, রেল ও জাহাজ কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইটিএ পাসপোর্টের সঙ্গে ডিজিটালি সংযুক্ত থাকবে, ফলে কাগজপত্র দেখানোর প্রয়োজন হবে না। তবে রেকর্ডের জন্য কপি রাখার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার।
উল্লেখ্য, ইটিএ ভ্রমণের অনুমতি দিলেও দেশে প্রবেশের নিশ্চয়তা দেয় না। পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণে অন্য কোনো জটিলতা থাকলে প্রবেশে বাধা দেওয়া হতে পারে।
দ্বৈত নাগরিকদের সমস্যা
নতুন নিয়মে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন দ্বৈত নাগরিকরা—যারা যুক্তরাজ্য ও অন্য কোনো দেশের নাগরিক। দ্বৈত নাগরিকরা ইটিএর জন্য আবেদন করতে পারবেন না। যুক্তরাজ্যে প্রবেশের জন্য তাদের ব্রিটিশ পাসপোর্ট অথবা দ্বিতীয় পাসপোর্টের সঙ্গে সংযুক্ত ‘সার্টিফিকেট অব এন্টাইটেলমেন্ট’-এর ডিজিটাল সংস্করণ দেখাতে হবে।
সমস্যা হলো, নাগরিকত্ব পেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রিটিশ পাসপোর্ট বা এ সার্টিফিকেট দেওয়া হয় না। অনেকেই দশকের পর দশক যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেও এসব নথি কখনো তোলেননি। একটি ব্রিটিশ পাসপোর্টের খরচ প্রায় ১০০ পাউন্ড, আর সার্টিফিকেট অব এন্টাইটেলমেন্টের খরচ ৫৮৯ পাউন্ড। তাছাড়া এসব পেতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। এর আগে অনেক দ্বৈত নাগরিক বিদেশ ভ্রমণে নিজেদের অন্য দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যে ফিরতে পারতেন। নতুন নিয়মে সেটি আর সম্ভব নয়।
ব্রিটিশ গণমাধ্যমে কয়েকজন দ্বৈত নাগরিক জানিয়েছেন, নিয়ম কার্যকরের আগে পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন। যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র দাবি করেছেন, ২০২৩ সাল থেকেই ইটিএ চালুর বিষয়ে প্রচার চলছে এবং ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে দ্বৈত নাগরিকদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বহনের বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা হয়েছে।
অন্য দেশেও রয়েছে ইটিএ
ইটিএ ব্যবস্থা নতুন নয়। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ আগেই এ ধরনের ডিজিটাল ভ্রমণ অনুমতি চালু করেছে। তবে খরচের দিক থেকে পার্থক্য রয়েছে। কানাডার ইটিএর ফি ৭ কানাডিয়ান ডলার (প্রায় ৩.৭৮ পাউন্ড), আর যুক্তরাষ্ট্রের সমমানের অনুমতির জন্য গুনতে হয় প্রায় ৪০.২৭ মার্কিন ডলার (প্রায় ২৯.৭৫ পাউন্ড)।
ব্রিটিশ সরকারের মতে, নতুন এই ইটিএ ব্যবস্থা সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং ভ্রমণ প্রক্রিয়া আরও আধুনিক ও কার্যকর করবে। তবে বাস্তব প্রয়োগে কতটা স্বস্তি মিলবে, তা সময়ই বলে দেবে।
মন্তব্য করুন