
চর্যাপদ বাংলাদেশের প্রাচীনতম ঐতিহ্যিক ভাবসম্পদ। আজ থেকে এক হাজার বছরেরও বেশি আগে এদেশের সাধক কবি, গায়ক ও নৃত্যশিল্পীরা চর্যাপদের ধারক ও বাহক ছিলেন।
চর্যাগীতির সর্বাধিক পদের রচয়িতা কাহপার দেশ ছিল সোমপুরী তথা বর্তমানে নওগাঁ জেলার পাহাড়পুরে। কাহ্নপাসহ চর্যাপদের আরেক বিখ্যাত সাধক কবি বিরুপা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেবপালের রাজত্বকালে সোমপুর মহাবিহারের ভিক্ষু ছিলেন এবং তাঁরা সেসময়ে সেখানে চর্যাপদে উদ্ধৃত গীতি নৃত্য ও নাটোর উঠেছে। মাধ্যমে জনগণের মধ্যে দেহসাধনা ধর্মউপাসনার শিক্ষা দিতেন।
কাহ্নপা ও বিরুপার স্মৃতিধন্য পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার অঞ্চলের বাউল-ফকির সাধকেরা লোকায়ত সংগীত পরিবেশনের আঙ্গিকে দেহসাধনার প্রাচীন ধা চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণে গড়ে তুলেছে “ভাবনগর সাধুসঙ্গ চর্যা চর্চা কেন্দ্র”।
মূলত ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লালনপন্থি সাধক গবেষক মাসাহিকো তোগাওয়ার উপস্থিতিতে ভারনগর সাধুসঙ্গের সাধকশিল্পীর চর্যাপদের সৃষ্টিভূমি সোমপুর বৌদ্ধ মহাবিহারের প্রায় ১০০০ বছর পর চর্যাপদের আহ্বান করা হয়।
গানের পুনর্জাগরণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার ভাবসাধকদের চর্যাপদের পুনর্জাগরণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
ভাবনগরের পরিভাষায় “সাধু” হচ্ছেন-সেই সব চিন্তাশীল মানুষ, যাঁরা প্রকৃত অর্থে মানুষকে মানুষ হবার মন্ত্র দিয়েছেন, দিয়েছেন সভ্যতার নানান উপকরণ, জীবনকে অনুভব ও আবিষ্কার করার বিবিধ দর্শন তথা রাষ্ট্রচিন্তা, বিজ্ঞানচিন্তা, স্থাপত্যটিস্তা, প্রকৃতিচিন্তা, নৃবিজ্ঞান, ইতিহাস, সাধনা ইত্যাদি নানা ধরনের সৃজনশীল জ্ঞান। সাধুসঙ্গে প্রধানত ৫টি বিষয়ের সমন্বয় থাকে- ১. সাহিত্য থেকে পাঠ করা হয়, ২. সংগীত পরিবেশন করা হয়, ৩. উন্মুক্ত আলোচনা করা হয়, ৪. প্রশ্ন-উত্তর করা হয় এবং ৫ ধর্মমত নির্বিশেষে সবাইকে মানবিক মূল্যবোধের প্রতি আহ্বান করা হয়।
তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় একে অন্যের দেখাশোনা বা প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে। মানুষের হার্দিক পারস্পারিক সম্পর্ক সাক্ষাৎ সাধুসঙ্গের মাধ্যমে প্রাণবন্ত রাখতে ভাবনগর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রতি বুধবার বিকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়মিতভাবে আসর বসে।
ভাবনগর সাগর সাধুসঙ্গসাধুসঙ্গের এই সাপ্তাহিক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আসরের একদিকে থাকে ধ্রুপদী থেকে সাম্প্রতিক সাহিত্যের পাঠ, আলোচনা এবং ঐতিহ্যবাহী সংগীতের উপস্থাপনা, যাতে যোগ দিয়ে থাকেন বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-শিক্ষার্থী, সাহিত্যিক-দার্শনিক- সাংবাদিক ও ভাবসাধকগণ; শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-গবেষকগণও প্রায় নিয়মিতভাবে এই সাধুসঙ্গে অংশ নিয়ে থাকেন।
ভাবনগর ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা, নাট্যকার-গবেষক ড. সাইমন জাকারিয়া ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নানা পর্বে প্রাচীন চর্যাপদকে গানের উপযোগী করে সমকালিন বাংলায় গীতরূপান্তর অব্যাহত রাখেন।
১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা কলেজের বাংলা বিভাগের সভাপতি ও অধ্যাপক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অনুপ্রেরণা তিনি পর্যায়ক্রমে ৫০টি প্রাচীন চর্যাপদকে সমকালীন বাংলা গীতরূপান্তর করেন এবং একই সঙ্গে সেই পদগুলিকে নির্ভর করে নি নৈরামণি” বা “বোধিদ্রুম’ নামে নাটক রচনা করেন।
সেই নাটকের মধ্যে সংযোজন করে চর্যার কিছু পদের সমকালীন রূপান্তর, যাতে পর্যায়ক্রমে সুর-সংযোজন করেন রবিশংকর মৈত্রী, কফিল আহমেদ, কমল খালিদ, সাইম রানা ও শিমূল ইউসুফ। এর মধ্যে সাইমনের রূপান্তরিত চর্যাগান, চর্যাপদ অবলম্বনে রচিত নাটকের প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় সমকালীন বাংলা ভাষার অন্যতম কবি উৎপলকুমার বসু এবং চর্যাপদ বিশেষজ্ঞ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিশ্বনাথ রায়ের। সমান্তরালে সাইমন জাকারিয়া বাংলাদেশের বাউল-ফকির সাধুদের সঙ্গে মিলে চর্যাগানের পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখতে থাকেন এবং গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে কুষ্টিয়া অঞ্চলের বাউল-ফকিরদের সাথে বহুবার মতবিনিময় করে এবং তারই পূর্ণতা ঘটে ভাবনগর সাধুসঙ্গের চর্যাগানের সুরারোপে।
ভাবনগর সাধুসঙ্গের প্রত্যয় হলো চর্যাগানের পুনর্জাগরণের মাধ্যমে প্রাচীন চর্যাপদের মূল ভাব-রস-সাধনকথা-মানবতার মন্ত্র ও আমাদের দেশ-কালের পরিচয় সমকালীন রুপান্তরিত গীতবাণী ও সুরে বাংলাদেশের বাউল-ফকিরদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া।
সম্প্রতি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ভাবনগর সাধুসঙ্গের ৪০০তম আসর যা শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের এপ্রিলে। এই আসরে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাউল-ফকির সাধকেরা এসে প্রাচীন বাংলার চর্যাপদের গান গেয়ে ও আলোচনায় মুখরিত করেন।
মন্তব্য করুন