বাংলা সাহিত্যে হাসনের মরমি পর্যায়, মরমি তত্ত্বের বিশ্লেষণ কিংবা মরমি চেতনায় হাসনের উৎসর্জন ও সাহিত্যে তাঁর অবদান মূল্যায়ন প্রসঙ্গ আলোচনায় উঠে এলে অবশ্যই রবীন্দ্রনাথকে স্মরণে নিতে হবে। আমরা মনে করি আধুনিক বাউল বা মরমি গানের মৌলিক রস বিশ্লেষণে, মরমি তত্ত্ব যে মানব জীবনের অন্যতম তাত্ত্বিক অনুষঙ্গ তারই অনিবার্য সত্যরূপের তাৎপর্য রবীন্দ্রনাথই প্রথম তুলে ধরেন। এ ধারার সাহিত্যের সাথে তিনিই আমাদেরকে প্রথম পরিচয় করে দেন।
উল্লেখ্য এ ধারার আরেক বাউল কবি গগন হরকরার সাথে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় শিলাইদহে। রবীন্দ্রনাথের জমিদারিতেই ডাক হরকরা গগন বাস করতেন। এ প্রসঙ্গে শ্রীভূদেব চৌধুরী বলেন “ রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিখ্যাত ‘ হিবার্ট ’ বক্তৃতা ‘ The Religion of Man ’ গ্রন্থে গগন হরকরার মুখ থেকে এবং অন্যান্য সূত্র হতে প্রাপ্ত বাউল গান সংগ্রহ করে গ্রথিত করেছেন।” এধারার সাহিত্য পর্যালোচনায় হাসন রাজার প্রসঙ্গ পুনরায় উঠে আসে ভূদেবের কণ্ঠে। তিনি বলেন,“ রবীন্দ্রনাথের আরো একজন প্রিয় মরমিয়া কবি ছিলেন শ্রীহট্টের হাসন রাজা চৌধুরী।ভারতীয় দর্শন িসভার সভাপতির ভাষণে কবি এঁর গানের উদ্ধার ও ব্যাখ্যা করেছেন। ‘ The Religion of Man ” গ্রন্থেও এঁর কবিতার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা রয়েছে।
১. হাসন রাজা চলনে উদাস, মননে একজন মরমি সাধক। উদাসীনতা তাঁর মরমি বৈশিষ্ট্যের একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। অনাসক্ত জীবন তাঁর চারিত্রিক উৎকর্ষের একটি দিক। হাসন রাজা তাঁর চেতনায় এক শূন্যতা অনুভব করতেন। সে শূন্যতা পরমসত্তার সান্নিধ্য লাভের ব্যাকুলতারই এক অন্যরকম বিমূর্ত অনুভূতি। সে লক্ষে হাসনের অতিন্দ্রীয় জগতে সহজ বিচরণের বিনম্র উচ্চারণ; “এই ভাবিয়া হাসন রাজা ঘর-দোয়ার না বান্ধে/কোথায় নিয়া রাখবো আল্লায় এর লাগিয় কান্দে।”
হাসন রাজার গানে ব্যক্ত হৃদয়ের সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত কবিত্বের সংসর্গ লক্ষ করা যায়। গানে তাঁর মরমি চেতনার অন্তর স্পর্শে অতিন্দ্রীয় অনুভূতির অতলান্তিক গভীরতা এবং আত্মনিবেদনের সরল আন্তরিকতা ফুটে উঠেছে। এসকল গান আমাদেরকে মুগ্ধ ও বিস্মিত করে। হাসনের কালজয়ী গানে যখন উচ্চারিত হয় “মম আঁখি হইতে পয়দা আসমান জমিন” তখন আমরা মনে করি তিনি একজন যথার্থ মরমি কবি। তাঁর এরূপ স্বগত উচ্চারণের সাথে সাথে আত্মগত ভাববাদী জর্জ বার্কলের(১৬৮৫-১৭৫৩) ভাববাদের প্রতি তাঁর আপাত সাযুজ্য খোঁজে পেলেও পার্থক্য রয়েছে।বার্কলে মনে করেন- এ জগৎ এবং তার যাবতীয় বস্তুর অস্তিত্ব ব্যক্তি-মনে চেতনার উপর নির্ভরশীল। হাসন রাজা মনে করেন আত্মসত্তা পরমসত্তার আধার হলেও আত্মসত্তার মধ্যে পরমসত্তার ব্যাপ্তি এবং উপস্থিতি সীমিত নয়।
২. হাসন রাজা সংবেদনের ক্রিয়া ও বিষয়বস্তুকে বার্কলের মতো একই বিষয় বলে মেনে নেননি। বিশ্বের সবকিছু সংবেদন কিংবা ইন্দ্রিয়নির্ভর এ তত্ত্বের বাইরে এসে হাসন মনে করেন এবিশ্বের সবকিছু তার ইন্দ্রিয় থেকে নির্মিত। বার্কলে তুলে ধরেছেন বিভিন্ন বস্তু আমাদের ইন্দ্রিয়ের সংস্পর্শজাত হয়েই সত্যরূপে ধরা দেয়, কিন্তু হাসন রাজার চেতনায় অনিবার্য সত্য হচ্ছে
“সর্ব বিষয়ের উৎপত্তি আমাদের
সত্তা থেকে”। হাসন রাজা যে চেতনাকে নিরন্তর লালন করেন তা হলো
সর্বজনীন ইন্দ্রিয়। যা একই ধারায় তাঁর মরমি চেতনায় উদ্ভাসিত সত্য। যা থেকে মরমি কবি বিশ্বচরাচরের উৎপত্তিকে ক্রমাগত অনুভবে গ্রহণ করেছেন। এখানেই হাসন রাজা একজন বাউল কবি না হয়ে, হয়ে উঠেছেন একজন অনবদ্য- অসাধারণ মরমি কবি। তাই তিনি বিশ্বাসের সাথে বলতে পেরেছেন “ আমি হইতে সর্বোৎপত্তি হাসন রাজায় কয়।”
কিন্তু দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ তাঁর প্রাজ্ঞ মতামত উদ্ধৃত করে বলেন, “হাসন রাজার দর্শনের তরফ থেকে উত্তর দিতে হলে বলতে হবে তা নয়। কারণ, হাসন রাজার এ অহমবোধ দীর্ঘস্থায়ী নয়”। এ প্রসঙ্গে হাসনের গানের কয়টি পঙক্তি তিনি
উদ্ধৃত করেন;
“মিছামিছি বলি আমি, সর্বব্যাপী হওরে তুমি
সকলই তুমি অন্তর্যামী, তুমি ভিন্ন কছু নয়রে/ হাসন রাজা নামটি দিয়ে, রহিয়াছ ছাপাইয়ে, সবই কর পর্দা দিয়ে, দোষের ভাগী হওনারে।”
হাসন রাজার মরমি সত্তার স্বরূপ বিশ্লেষণে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ বলেন; “হাসন রাজার সর্বব্যাপী সত্তার ভিত্তমূলে রয়েছ মানবসত্তা, তাঁর ইন্দ্রিয়সৃষ্ট জীবন এবং তাঁর মনন, তাঁর সামগ্রিক জীবন। অদ্বৈতবাদ, ব্রহ্মবাদ বা সর্বেশ্বরবাদকে ইতোপূর্বে অপর কোন মনিষীই মানবজীবনের উপর প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেননি। তাই তাঁর সর্বেশ্বরবাদকে VaitalisticPantheism বা জীবন ভিত্তিক মায়াবাদ বলা যায়। এ ধারায় হাসন রাজা সত্যিই অনন্য।”
তাঁর এ মতবাদকে সর্বেশ্বরবাদ বলা যায়। কেননা তাঁর সে মৌলিক সত্তা পরম ব্রহ্মের মতো ব্যক্তিত্বহীন নয়, অথবা স্পিনোজার (১৬৩২-১৬৭৭) সারবস্তুর মতো ইচ্ছাশক্তিবিহীনও নয়। এ সত্তা ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাকে সর্বগুণাধার ঈশ্বরও বলা যায়। তিনিই এবিশ্বের মূল এবং তিনিই মানব চেতনা বা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে এ বিশ্বকে সৃষ্টি করে তাঁর আপন লীলা অনুভব করেছেন।
৩. বস্তুত হাসন রাজা নিরন্তর বিচরণ করেছেন ঈশ্বরের মৌলিক সত্তার খোঁজে। তুলে এনেছেন মানুষ আর মানবতাবাদের এক অসাম্প্রদায়িক জীবনচেতনা। তিনিও বলতে চেয়েছেন “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।” এ তত্ত্বকে অনুপুঙ্খ নিরীক্ষণের মাধমে মরমি তত্ত্বের আকর সংযোজন করে বক্তিস্বরূপের সাথে সম্বন্ধ সূত্রকে অন্বিত করেছেন। এ সত্য থেকেই বিশ্বসত্যের তাত্ত্বিক মরমি দর্শন উপ্ত হয়েছিল তাঁর সংগীতে।
৪. হাসন রাজা লিখেছেন অবিরাম। তাঁর ক্রমাগত লিখার তালিকায় যুক্ত হয়েছে ৫৫৫ টি গান। এর মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে ২০৭ টি এবং অপ্রকাশিত রয়েছে ৩৩০ টি। তাঁর লিখা হিন্দিতে গানের সংখ্যা ১৮ টি।
হাসন রাজার গানের বই “হাসন উদাস”। প্রকাশকাল ১৯০৭। বইটি ছাপা হয় “সিলেট ইসলামিয়া প্রেস” এ। ২০৬ টি গান নিয়ে বইটির সংকলন তৈরি হয়। “হাসন উদাস”র দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয় ১৯২৬ সালে সুনামগঞ্জের “ভূবন প্রেস” থেকে। এতেও গানের সংখ্যা ২০৬ টি। সমকালে “সৌখিন বাহার” নামে আরো একটি প্রকাশিত গ্রন্থের উল্লেখ আছে, যার বিষয়বস্তু -ঘোড়া, কুড়া পাখি, “আকৃতি দেখে প্রকৃতি বিচার”। হাসন রাজার সর্বশেষ গানের বই “হাছন বাহার” উল্লেখযোগ্য।
৫. হাসন রাজার অসাধারণ সৃষ্টি তাঁর গান। সে গানে উঠে এসেছে এক কীর্তিমান সাধকের ভাব- দর্শনের অনাশক্তিমূলক চেতনা। উঠে এসেছে কালজয়ী মরমি সুরের ব্যঞ্জনা। আমরা মনে করি হাসন রাজার বহুমাত্রিক প্রতিভার সফল স্বাক্ষর তাঁর প্রতিটি গান। মরমি ভাবদর্শনে তিনি এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছেন। প্রথাগত ভাববলয় থেখে বেরিয়ে এসে তিনি তাঁর গানে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে তুলে ধরেছেন নিজস্বতায়। হয়ে উঠেছেন প্রগতিশীল ধারার অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি।
মানবতার ঐশ্বর্যকে সামাজিক বাসস্তবতায় মূল্যায়নের প্রয়াস চালিয়ে হয়ে উঠেছেন মানবতার কবি,মানুষের কবি। মননেও মগজে লালন করেছেন মরমি চেতনার অবিনাশী সুর। এধারায় আমাদের পর্যবেক্ষণ হাসন রাজা একজন কালজয়ী মরমি কবি হিসেবে বাংলা সাহিত্যে নিজের আসনটি নিরঙ্কুশ প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন।
বস্তুত লালন, হাসন, পাঞ্জাশাহ একই ভাবতত্ত্বের সহযাত্রী। হাসন রাজাকে “ধর্মাদির” বাইরে অনাড়ম্বর মরমি সাধক এক “Mystic” বলা যেতে পারে। সাধারণ বুদ্ধির অতীত গূঢ় ঐশ্বরিক তত্ত্ব যা মরমি ভাবাপন্ন এবং সেক্ষেত্রে যাঁর মরমি চেতনা ক্রিয়াশীল, সে চলমান ধারায় হাসন রাজা সেই শিল্পী যিনি অতীন্দ্রিয় বিষয়-তত্ত্বাদি সম্পর্কে জ্ঞান রাখতেন। তাই হাসন রাজা অতীন্দ্রিয় বিষয়বোধে, প্রজ্ঞার বিবেচনায় একজন মরমি সাধক এবং একজন নির্ভুল মরমি কবি।
মন্তব্য করুন