তানভীর তারেক
২৯ জুলাই ২০২৫, ৬:৩২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের এক অসহায় বাবা ও সাধারণ নাগরিকের বৃথা আর্তনাদ !

আহা! কনটেন্ট মনিটাইজেশন। বা অনলাইনে সৃজনশীল চর্চার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন। এই কাজটি মনে হয় শোবিজ কর্মীদের ভেতরে আমি শুরুর দিককার মানুষ ছিলাম বাংলাদেশে। প্রায় ১৩ বছর আগে থেকে শুরু করেছিলাম। তখন অনেক লজ্জা নিয়ে পোস্ট দিতাম। এরপর তা প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেবার জন্য কোলাহল তৈরি করলাম। আজ একে একে এর মহোৎসব দেখতে পাচ্ছি। সকলেই এখন ক্রিয়েটর! এখনও কিছু পোস্ট দেবার আগে দুইবার ভাবি। আগে দশবার ভাবতাম। এখন দুইবার ভাবি। সামনে আমিও আর ভাববোনা বলে না ভাবার প্র্যাকটিস করতেছি ..

 

 

 

ভাবি- আমার ইমেজের সাথে যাবে তো। রুচির মাপে কারো সাথে বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করতে না পারলে- আর্থিক ক্ষতি হলেও বেরিয়ে আসি। এগুলো আমার দম্ভ না। এটাই আত্মসম্মান। তাতে ঠকলেও মনকে বুঝ দিতে পারি। কথাগুলো এই পুড়ে যাওয়া ফুল শিশু মৃত্যুর সময়ে লিখছি, কেন জানি না। কারণ ফেসবুক খুললেই গত দুতিন বছর ধরে এমন এমন কিছু ভিডিও নিয়ে আলোচনার হুল্লোড় দেখি। তা দেখে মন মেজাজ ঠিক রাখা যায় না! সর্বশেষ অঘটন তো নেয়া যায় না। ভাবছেন – এসবের সাথে মনিটাইজেশনের আবার সম্পর্ক কী।

 

 

 

সবই আসলে সভ্য আর অসভ্য রাষ্ট্রচর্চার সাথে সম্পর্কিত। মনে হয় এই মনিটাইজেশন আমাদের জন্য না। আমরা প্রচন্ড পরিমান অসভ্য এক জাতি। যে পরিমান সভ্য হতে হয় একটা সমাজকে.. তার ধারে কাছে আমরা নেই!

কিছুদিন আগে এক আড্ডায় প্রিয় অভিনেতা টনি ডায়েস এক রাজনৈতিক নেতাকে বলছিলেন,‘আমেরিকায় স্কুলে কারো কোনো বিষয় বা বস্তু ভালো না লাগলে, শিক্ষক তা কেন ভালো লাগেনি সেই ব্যাখ্যা শুনতে চায়। প্রশ্ন শুনতে চায় ছাত্রের কাছে। তা নিয়ে ডিবেট করার ফ্লোর তৈরি করা হয়। সেই ডিবেট থেকেই ছেলে-মেয়েরা শেখে। এটাই কালচার। এখানে অ্যানসার শুনতে চাওয়ার চেয়ে প্রশ্ন শুনতে চায় সকলে বেশি। এখান থেকেই গড়ে ওঠে সহনশীলতা। অন্যকে বলতে দেবার সভ্যতা।’

আফসোস !!

আমরা যে যে বিশ্বাসের প্রতিনিধি হয়ে ‘রাজনীতি’ কে লাভবান ব্যবসার দোকান বানায়া রাখছি। তারা প্রত্যেকে অপরাপর রাজনীতির সমর্থকদের শত্রু মনে করে। এটা কিন্তু নরমাল শত্রু না। হিংস্র হয়ে তাদের খারাপ চায়। চুলোচুলি শত্রু। এই রাজনীতির ভেতরে পলিটিক্স অনেক আগেই ঢুকে গেছে। বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাদের সাথেই দেখা হয় আমার। কথা হয়। অন স্ক্রীন বা অফ স্ক্রীন। আফসোস তারা ভেবেই নেয় যে, নিজেদের সমর্থনের বাইরের মানুষগুলো খারাপ। এবং তারাই একেকজন ফেরেশতার খালাতো / মামাতো ভাই অথচ, ‘সাধারন মানুষ’ বলে যে একটি দেশে সবচেয়ে বড় শ্রেনী বাস করে। তা কোনো রাজনৈতিক দল বিশ্বাস করেনা।  যারা নেতাদের ভালো কিছু হলে ভালো বলে আবার তাদের খারাপ কাজকে প্রত্যাখ্যান করবে। সেই বিশ্বাসটা আপনাদের উঠে গেছে বলেই প্রায় প্রতিটা রাজনৈতিক দলে এক ধরনের স্বৈরাচারী মনেবৃত্তি গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ আপনার মনের মতো না হলেই সে জঘন্য। সে ভালো হইতেই পারে না। এই কুপ-মনোবৃত্তিই আমাদের সামাজিক কালচারটা নষ্ট করে দিয়েছে।

 

 

 

আমাদের এই অদ্ভুত মনোবৃত্তি থেকে আজকের বাংলাদেশের রেহাই নাই। আমরা একে অপরের তো দূরের। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা, বা বসে গল্প করার সংস্কৃতি আমরা হারায়ে ফেলেছি। এর সকল দায় চলমান থেকে শুরু করে বিগত প্রত্যেকটি শাসকের!

‘গনতন্ত্র’ বিশ্বের কোনো দেশেই সহী ভাবে প্রজেক্ট করা হয় বলে আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু অন্তত বেশিরভাগ মানুষ গনতন্ত্রের অধিকাংশ টুলসের যথার্থ চর্চা করে যখন, তখন তাকে আমরা সভ্য রাষ্ট্র বলি। আফসোস আমরা গত ১৬ বছর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ভোট দেবার কোনো প্রসেস রাখি নাই। ফলে হঠাৎ ফ্যাসিবাদ বিতাড়ণের পর তুমুল বিশৃংখলায় ক্ষমতার ভাগ আর ভোগ দখলের হুল্লোড় লেগে গেছে। দীর্ঘদিন মুখ চোখ বন্ধ রেখে আপনি তাকে বিশ্রী কথা শোনাতে থাকলে হঠাৎ কোনো একদিন আপনি তার চোখ মুখ খুলে দিলে দেখবেন , অযাচিত চিৎকারে সে সবাইকে বিরক্ত করছে। আমাদের কালচার টা তাই নষ্ট হয়ে গেছে। কবে, কিভাবে ঠিক হবে আমরা সেই চাবিও হারায়ে ফেলছি। তাই কোমলমতি শিশুর জন্য হাসপাতালে যেতে এক রিকশাওয়ালা ৪০ টাকার ভাড়া ৪০০ টাকা চায়। সিএনজি ওয়ালা ১০০ টাকার জায়গায় ১০০০ টাকা চায়। ১০ টাকার পানি চায় ৬০০ টাকা!  কারণ সে দেখে আসছে তারা প্রিয় নেতা, যাকে বিশ্বাস করেছিল .. ও সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক বাটপার। দেখছে ওর আরো অনেক প্রিয় নেতা, এলাকার মানুষের কথা না ভাইবা, তাদের কষ্টের টাকা হরিলুট করে বিদেশ ভাইগা গেছে!  তাই কম শিক্ষিত সিএনজি ড্রাইভারটারও বিশ্বাস হারায় গেছে। সেও তার জায়গায় দুর্নীতিকেই দেশে সেলিব্রেট হয় বলে সেই বিশ্বাস নিয়ে গর্বের সাথে অসভ্য হতে শিখেছে।

 

 

একটা সমাজ ভালো কিছুর প্রতিদান, নিজের আত্মত্যাগের সম্মান না পেলে সে নষ্ট হয়ে যাবেই। স্বাভাবিক..

জুলাই বিপ্লবের বর্ষপূর্তিতে – অডিটরিয়ামে. সকল নেতার সামনে পঙ্গু ছাত্র যখন গলা উঁচিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে- আমাদের হাসপাতালে এখন দেখভাল করে না। আপনারা নেতারা কেউ দেখতে আসেন না। এত এত অভিশাপ আপনারা নিতে পারবেন ? কারো বিকার হয় না। এক দল আরেক দলের লাশ নিয়া সেলিব্রেট করে। লা*শ হয়ে যায় ক্ষমতা পাবার এটিএম মেশিন। অথচ ঐ লা*শ টা জানে না সে কেন মরলো। ঐ লাশটার কোনো দল ছিল না !! ফলে রাজনীতিতে পচন ধরে গেলে, সমাজ, শিক্ষা ব্যবস্থা, কৃষি, অর্থনীতি, কারিগরী, বিনোদন সব জায়গায় পচন ধরার ম্যান্ডেট পেয়ে যায় স্ব স্ব ক্ষেত্রের মানুষ।

মনিটাইজ হওয়া ডলার ইনকামের জন্য কোমলমতি তরুন তরুনীরা হয়ে ওঠে সুযোগ সন্ধানী। ভাবে বাটপার নেতাদের দেশ। আমি ভাল হইয়াই করুম কী ? একটা রাষ্ট্রের সকল দায় তাই রাজনীতিবিদদের। সকল দায়। সকল ..কিছুর ফলে- আল্লাহর দোহায় লাগে ন্যারেটিভ বিতরন ও রিভার্স ন্যারেটিভ দিয়ে ঘায়েল করার খেলা বন্ধ করেন। অভিশাপের রিভার্স আল্লাহ খেলা শুরু করলে সকলে ধ্বংস হয়া যাইবেন। আজন্ম একটা দেশে – ক্ষমতার বাইরে থাকা বিরোধী নেতারা সবসময় দেশের যে কোনো ক্ষতি হলে আড়ালে বসে বুনো উল্লাস করেছে। মনে মনে জপ করেছে- দ্যাখ শালা, আমাদের সময়ই তো ভালাই আছিলি।

এক হায়না..আরেক হায়ানা হতে চাওয়া শাবকদের ভুল ধরতে ব্যস্ত হয়ে যায়। ফলে জাতীয় ঐক্য তো দূর! আমরা ঝড় বন্যা বা প্রাকৃতিক ডিজাস্টারেও পরিসংখ্যানের ক্যালকুলেটর নিয়ে আগে বসি। আগে বয়ান ঝাড়ে বিরোধী পক্ষ।

 

 

আমাদের সময় এত মরে নাই্। এখনকার চাইতে দুইডা কম মরছে। অথচ ঐ সময়ে তার বিপরীত পক্ষকে একটু হেল্প করলে দেশটা বাঁচে। আমরা তাই সমস্বর আর হইতে পারি না। হয়ে উঠি প্রচন্ড স্বার্থপর। এসব ন্যারেশন আর রিভার্স ন্যারেশনের চাপে বাড়তে থাকে লাশ। ফাঁক ফোকরের রাজনীতিতে অপরাধী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি পার পেয়ে যায় নিমিষেই। যে দেশে সবচেয়ে তুচ্ছ মানুষের প্রাণ, সে দেশের মোরাল ঠিক করার আগেই হরিলুট হয়ে যায় সাধারণ নাগরিকের সরল বিশ্বাস।

ফলে -স্বার্থপরতার চরম সীমায় বসে কোনো মতে প্রাণে বেঁচে যাওয়া নিজ সন্তানকে বুকের ভেতরে জাপটে ধরে বাপ মা কয়- যাক আমার ডা তো মরে নাই। … অথচ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিউটি হইল- এদেশের মানুষেরা এত কষ্ট করে, এত অপরিসীম সহ্য ক্ষমতা নিয়ে বেড়ে ওঠে, এবং এত অল্পতেই খুশী হয় বা ভুলে যায় । যা পৃথিবীর অন্য কোথাও পাবেন না। এটা বাজি লেগে বলতে পারি – সবচেয়ে সরল সুন্দর নাগরিকের দেশটির নাম হইল বাংলাদেশ। যার একমাত্র কারণ তার অসাধারণ ‘সাধারণ মানুষ’। এর ক্রেডিট কোনো রাজনীতিবিদের নাই। কোনো নেতার এখনও ক্রেডিট নেবার যোগ্যতা হয়নাই !!

 

 

এটাই একটা অনিন্দ্য সুন্দর দেশের দুর্ভাগ্য!!!

যে দেশের সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয় বারবার রাজনীতির লুডু খেলা হায়না বা শকুনের দলগুলো। আমরা কবে সহনশীল হবো?  কবে সম্মিলিত হবো? কবে একসাথে বসে ঝগড়া করবো? কবে মত চাপিয়ে না দিয়ে প্রশ্ন শুনতে চাইবো? কবে একটা সুন্দর ফেয়ারওয়েল হবে আমাদের নেতাদের! কবে ? আমরা জানি না !! এই জীবনে কী দেখে যেতে পারবো? পারবো কী ?

উত্তর জানা আছে আপনার? জানা থাকলে বইলা যাইয়েন .. অন্তত শুনে মরতে চাই।

 

-লেখক: উপস্থাপক, গীতিকার, সুরকার

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অভিযানে নতুন ইতিহাস গড়ে দেশে ফিরছে মার্কিন রণতরি ‘ইউএসএস ফোর্ড

ডেমোক্রেটিক পার্টি লিডার ড. নাজ হাসান শাহীনের আমন্ত্রণে সভা ও ডিনারপার্টি অনুষ্ঠিত

যুক্তরাষ্ট্রের স্মারক পাসপোর্টে যুক্ত হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ছবি

বাংলাদেশের মিডিয়া জগতের কিংবদন্তী কলম সৈনিক সৈয়দ আবদাল আহমেদ প্রধান তথ্য কর্মকতা হলেন প্রবাসী সাংবাদিক তুহিনের অভিনন্দন

নিউইয়র্কের আকাশে এয়ার ট্যাক্সি, ভবিষ্যৎ পরিবহনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞান খাতে আলোড়ন, বোর্ডের সব সদস্য বরখাস্ত

প্রবাসীর বাড়িতে সংঘবদ্ধ ডাকাতির চেষ্টাকালে ডাকাত নিহত

ট্যাক্স রিফান্ড বৃদ্ধি ও বাজারে উত্থান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন প্রচার

শিক্ষার্থী সুরক্ষায় কড়া নজরদারি, ডেট্রয়েট স্কুলে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি চালু

বর্নিল আয়োজনে মিশিগানে বৈশাখী উৎসব উদযাপন

১০

যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসা তিন বছরের জন্য বন্ধের প্রস্তাব, অনিশ্চয়তায় লাখো বিদেশি কর্মী

১১

মিশিগানে বিএনপির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীদের ক্ষোভ প্রকাশ, নতুন নেতৃত্বের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন

১২

মেট্রো ডেট্রয়েটে বাংলাদেশি কমিউনিটির উত্থান, অর্থনীতি ও আবাসনে নতুন শক্তি

১৩

বন্ড বাজারে বড় বিনিয়োগ, মার্চে ৫১ মিলিয়ন ডলার খরচ ট্রাম্পের

১৪

হোয়াইট হাউসে হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ, বার্তা দিলেন রাষ্ট্রপ্রধানরা

১৫

যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়ায় রেড অ্যালার্ট জারি মানবাধিকার সংগঠনের

১৬

বড়লেখায় কালবৈশাখীর তান্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

১৭

শিশুদের ম্যালেরিয়া চিকিৎসার ওষুধে প্রথমবার অনুমোদন দিল ডব্লিউএইচও

১৮

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী ভিসা বন্ধের তালিকায় বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশ

১৯

ফ্লোরিডায় দুই ডক্টরাল শিক্ষার্থীর মৃত্যু, লিমনের রুমমেটের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ

২০