একটা আধা-ঘুমন্ত দুপুরে আমরা কেউ যখন চ্যাটজিপিটির কাছে জানতে চাই, ভালোবাসা কি একতরফা হয়? কিংবা আজকের আবহাওয়া কেমন? সেই অলস টাইমপাসিং কথোপকথন চলার সময় আমাদের অজান্তেই পৃথিবীর কোথাও হয়ত একটা পুকুর শুকিয়ে যাচ্ছে। হয়ত ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসা সেই পুকুর বা জলাশয়ের পাড়ে একটা চুনোপুঁটি বা কাকিলা মাছের জন্য বসে আছে এক ধ্যানমগ্ন বক, তৃষ্ণাকাতর একটি আফ্রিকান শিশু। কেননা, এই ডিজিটাল বিপ্লব যতই সহজ ও তাৎক্ষণিক হোক না কেন, তার পেছনে রয়েছে বিপুল জলসংহার। কী করে? বলছি। অলস দুপুরে পিঠে একজোড়া ফেইরি ডানা গজানো গিবলি এনিম ফোটো তৈরি আমার জন্য হতে পারে নিছক ছেলেমানুষি ও নির্মল আনন্দের, কিন্তু সেই কথোপকথনের জবাব দিতে বা সেই ডানাওয়ালা ফেইরি ছবিখানা বানাতে যে সার্ভার কাজ করছে, সেই সার্ভার ঠা-া রাখতে হয়। আর সেই ঠা-া রাখার জ্বালানির অন্যতম নাম- জল।
একটি অদৃশ্য জলপথ
ডেটা সেন্টারগুলো, যেখানে আমাদের ডিজিটাল দুনিয়ার যাবতীয় তথ্য থাকে, তা ঠা-া রাখতে হয় বিরামহীনভাবে। এর জন্য ব্যবহৃত হয় “ইভাপোরেটিভ কুলিং” ব্যবস্থা, যেখানে বিশাল পরিমাণ জল বাষ্পীভবন করিয়ে তাপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। Google, Microsoft, Amazon -এই সকল বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো মিলিয়ে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ লিটার জল ব্যবহার করছে শুধু ডেটা সেন্টার ঠা-া রাখার জন্য। কেবল জলই নয়, ডেটা সেন্টারগুলো বর্তমানে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের ১.৫% দখল করেছে এবং ২০৩০‑এর দিকে এই হার বেড়ে প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি হতে পারে ।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, একেকটি প্রশ্ন-উত্তর বা চ্যাটবট ইন্টারঅ্যাকশনের জন্য ০.৫ লিটার জল পর্যন্ত খরচ হতে পারে। অর্থাৎ আমরা যখন কেবল নিজের শৈশবের প্রায় ভুলে যাওয়া একটা কবিতার লাইন খুঁজি, তখন সে খোঁজায় কোথাও একটা পুকুর হারায় তার স্বচ্ছতা।
পানি খরচের পরিসংখ্যান
Google ২০২৩ সালে খরচ করেছে ২২.৭ বিলিয়ন লিটার জল। Microsoft–এর খরচ তার চেয়েও বেশি। এক বছরে প্রায় ৬৪০ কোটি ঘনমিটার, যা এক বিশাল জলাধার শুষে নেওয়ার মতো। Google I Microsoft এই তথ্য তাদের বার্ষিক পরিবেশগত রিপোর্টে স্বীকার করেছে। তারা বিভিন্ন অঞ্চলে জল ব্যবহারের মাত্রা ও পুনঃব্যবহারযোগ্য উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেছে এবং স্বভবতই সামগ্রিকভাবে এই সংখ্যা জলসম্পদের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে।
AWS, Meta, IBM, NVIDIA সবাই-ই এই একই দলভুক্ত।
এই জলশোষণের হার এতটাই বেশি যে, খোদ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে স্থানীয় জলস্তর নিচে নেমে যাচ্ছে আর গ্রীষ্মকালে পানি-সংকট তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে Arizona, New Mexico, California-এর মতো পশ্চিম-মধ্যাঞ্চলে ডেটা সেন্টারের কারণে স্থানীয় জলস্তর নেমে যাচ্ছে বলে Climate Central I Reuters-এর রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য অংশেও এর প্রভাব অদৃশ্য অথচ ভয়ানক।
কৃষক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংঘর্ষ
একদিকে AI দিয়ে রোগ নির্ণয়, কৃষি পূর্বাভাস, লেখালেখির স্বাচ্ছন্দ অর্থাৎ এগিয়ে চলা। অন্যদিকে, সেই সুবিধার মূল্য দিতে হচ্ছে একজন প্রান্তিক কৃষককে, যার সেচের জল কমে আসছে প্রতিনিয়ত; অথবা সেই গ্রামীণ বা পাহাড়ি নারীকে, শুধুমাত্র এক কলস জলের জন্য যাকে ঘুম থেকে উঠেই পাড়ি দিতে হচ্ছে মাইল মাইল পথ।
AI কি তাহলে মানবসভ্যতার ইতিহাসে নতুন রূপের উপনিবেশবাদ? যেখানে যন্ত্রের ঋণ মানুষকে তৃষ্ণার জলের বিনিময়ে মেটাতে হচ্ছে?
আশঙ্কা ও দায়িত্ব
এই জল-সংকট এখনো শহুরে আকাশচুম্বী দালানের ছায়ায় চাপা পড়ে আছে। কেননা, এখানকার বাসিন্দারা সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত নন। কিন্তু গ্রামীণ ভূগর্ভস্থ জলস্তর প্রতিদিন একটু একটু করে নামছে। এবং আমরা যারা প্রতিদিন অনলাইনে কিছু না কিছু সময় কাটাচ্ছি তারা নিজের অজান্তেই এই সংকটে অংশ নিচ্ছি।
তাই প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক, এই ডিজিটাল বিস্ময়ের দাম কে দিচ্ছে?
একটি ছোট গ্রামের পুকুর?
একটি কুঁড়েঘরের রান্নার জল?
একজন মায়ের শিশুর জন্য সংগ্রহ করা এক কলস জল?
এবং সর্বোপরি আমাদের ভবিষ্যৎ পৃথিবী?
সমাধানে কী করতে পারি
এটা তো নিশ্চিত পৃথিবী উলটো হাঁটবে না। প্রযুক্তি আমাদের অবশ্য প্রয়োজন। তাহলে? বর্তমানের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে আমরা আমাদের মাদার আর্থকে মরুকরণের মাধ্যমে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে নিতেই থাকবো সেটাও তো সুবিবেচনার কাজ হবে না। তবে? সমাধানে কী করতে পারি?
১। প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর উচিত ডেটা সেন্টারে রিসার্কুলেটিং ওয়াটার সিস্টেম ব্যবহার করা।
২। নতুন কুলিং প্রযুক্তি, যেমন liquid immersion বা বাতাস-ভিত্তিক কুলিং আরও উন্নয়ন করা।
৩। নির্দিষ্ট ওয়াটার ইউজ রিপোর্টিং বাধ্যতামূলক করা।
৪। আমাদের ব্যবহারেও সচেতনতা আনা। প্রয়োজন ছাড়া কম জিপিইউ-ভিত্তিক অও ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় সার্ভার অন না রাখা।
আশা ও সম্ভাবনার কথা
ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী নানান মহলে এই বিষয়ে কথা উঠতে শুরু করেছে। ফলশ্রুতিতে এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের দায়বোধ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ ও নিউজ সিটে সে বিষয়ে কৈফিয়ত দিচ্ছে। এবং এটা অবশ্যই আশার কথা। ইতোমধ্যে যে সকল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে-
১। টেকসই কুলিং প্রযুক্তি:
OVHcloud–এর সিডনি ডেটা সেন্টারে cold‑plate–ভিত্তিক closed‑loop কুলিং ব্যবহার করে দশ ঘণ্টায় এক কাপ জল ব্যবহার করেছে।
২। সার্কুলার ওয়াটার সিস্টেম:
কিছু HPC ev supercomputer-G hybrid wet–dry বা hot-water reuse– ভিত্তিক closed-loop কুলিং-এর ব্যবহার হচ্ছে, যাতে ব্যবহৃত জল পুনর্ব্যবহারের সুযোগ থাকছে।
৩। পরিবেশগত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা:
EUzi AI আইন ২০২৬ থেকে উচ্চ-ঝুঁকির অও ব্যবহারের lifecycle‑G resource use রিপোর্টিং বাধ্যতামূলক করেছে; যাতে জলের হিসাবও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ।
আপাতত শেষ কথা
প্রযুক্তির জয়গানে মুগ্ধ আমরা বুঝতে চাই না বা বুঝতে পারিই না, কতটা চাপ প্রকৃতি নেবে বা নিতে পারবে। কতটা সহ্যের পর প্রকৃতি সুদে-আসলে তার মূল্য চুকিয়ে নেবে। তবু ভাবতে ভালো লাগে, একদিন হয়তো চ্যাটজিপিটিতেই কেউ লিখবে- জানো, এখন আমরা বাতাস আর রোদ্দুর দিয়ে AI চালাই। আর জল এখন কেবল প্রাণি ও বৃক্ষের তৃষ্ণা মেটাতে, ফসলের মাঠে, রৌদ্রক্লান্ত দুপুরের দাবদাহে পুকুরে ঝাঁপাতে আর আমাদের শিশুদের জলরঙে ছবি আঁকায় খরচ হয়।
এমন দিন কবে আসবে? এমন দিন কী সত্যি-ই আসবে?
-লেখক: শিক্ষক ও লেখক।
মন্তব্য করুন