যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনায় সরাসরি বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে না গিয়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ বৃদ্ধির পথ বেছে নিয়েছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, জ্বালানি অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ওয়াশিংটনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে চায় তেহরান। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিশ্বাস—সামরিক শক্তিতে যা অর্জন করা সম্ভব নয়, তা দীর্ঘস্থায়ী চাপ ও কৌশলগত অবস্থান ব্যবহার করে আদায় করা যেতে পারে।
তেহরানের বর্তমান কৌশলের মূল লক্ষ্য পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়; বরং ধাপে ধাপে উত্তেজনা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য ক্রমেই বেড়ে যাবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায় ইরান। দেশটির ধারণা, এই প্রণালিতে তাদের দাবিকে উপেক্ষা করলে শুধু উপসাগরীয় অঞ্চল নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ইরান পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনার নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। কখনো নতুন ভৌগোলিক এলাকা, কখনো নতুন লক্ষ্যবস্তু কিংবা নতুন ধরনের সামরিক সক্ষমতার ইঙ্গিত দিয়ে তারা ওয়াশিংটনের ওপর চাপ ধরে রাখতে চাইছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাধ্য করা হচ্ছে, যার ফলে সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যয়ও বাড়ছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। ইতোমধ্যে ওই এলাকায় নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে ইরান। এখন দেশটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রয়োজন হলে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি কিংবা অঞ্চলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেও চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিরাপদ রাখতে পশ্চিমা দেশগুলোর ব্যয় আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইরানের মূল্যায়ন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে এই চাপ বহন করতে চাইবে না। তেহরানের ধারণা, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত আলোচনায় নমনীয় হতে বাধ্য হতে পারে। তাই যেকোনো আলোচনায় শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করতে আগে নিজেদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে দেশটি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিকে আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবেই রাখতে চায় এবং সেখানে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা সেবামূল্য আরোপের ইরানি দাবির বিরোধিতা করছে। বিপরীতে তেহরান প্রণালির প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছে। এ বিষয়টিই বর্তমানে দুই দেশের বিরোধের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানের কৌশলের একটি বড় দিক হলো সরাসরি সামরিক বিজয়ের চেষ্টা না করে প্রতিপক্ষের ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়া। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নৌপথ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে ভবিষ্যৎ আলোচনায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চাইছে তেহরান। এ কারণে বর্তমানে সংঘাতটি সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি ধৈর্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক চাপের প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, উভয় পক্ষই আপাতত নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে প্রস্তুত নয়। ফলে উত্তেজনা আরও দীর্ঘায়িত হলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত চাপের এই কৌশল ভবিষ্যতে এমন এক সংঘাতের জন্ম দিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে।
মন্তব্য করুন