রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ কমে গেলেও ভারত বরং সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রুশ তেল আমদানিকারক হয়ে উঠেছে। রাশিয়া থেকে সস্তায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কিনে ভারতীয় পরিশোধনকারীরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষত ট্রাম্প প্রশাসন, এই নীতিকে কঠোর সমালোচনা করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতের রুশ তেল কেনাকে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে নয়াদিল্লির পণ্যের ওপর দ্বিগুণ শুল্ক আরোপ করেছেন। আগস্টের শেষ সপ্তাহে কার্যকর হওয়া ৫০ শতাংশ শুল্ক শুধু ভারতীয় অর্থনীতির জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্যও এক উদ্বেগজনক সংকেত।
ভারত অবশ্য কূটনৈতিক ভাষায় জানিয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানই হবে তাদের পছন্দের পথ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেমন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে ব্যস্ত, তেমনি পশ্চিমা নেতাদের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখছেন। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ভারত দ্বিমুখী চাপের মধ্যে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ভারতকে অভিযুক্ত করা হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেরাই এখনো রাশিয়ার পণ্য আমদানি করছে। ফলে ভারতের ওপর এককভাবে দোষ চাপানো আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়।
তেলের বাজারে ভারতের ভূমিকাকে উপেক্ষা করা যাবে না। দেশটির মোট চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশই রুশ তেল থেকে আসে। সেপ্টেম্বরে ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি আরও ১০-২০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, যা দৈনিক ড়ে থেকে তিন লাখ ব্যারেল পর্যন্ত হতে পারে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক-চাপ সত্ত্বেও ভারত তার অর্থনৈতিক স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবে।
এই পরিস্থিতি শুধু ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য রাজনীতির গভীর দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। যুদ্ধোত্তর বিশ্বে কূটনীতি, অর্থনীতি ও শক্তির রাজনীতির যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, ভারত সেই বাস্তবতার কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করছে।
শুল্ক বিষয়ে হোয়াইট হাউসের ব্যাখ্যায় বলা হয়, কিছু দেশ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্ক সুবিধা পেলেও পাল্টা বাজার সুবিধা য়েনি। ‘ফেয়ার ট্রেড’ বা ন্যায্য বাণিজ্য নীতিমালা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু সর্বক্ষেত্রে এটি কার্যকর করতে গিয়ে দেখা দিচ্ছে নানা প্রতিবন্ধকতা। বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুরুতে ৩৫ শতাংশ আরোপ করা হলেও পরবর্তীতে তা ১৫ শতাংশ কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি স্বস্তির হলেও হঠাৎ করে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকে করছে অস্থির। ভারত নিজ স্বার্থ রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়াটা রাজনৈতিক নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক তৈরি করুক এটাই প্রত্যাশা।
মন্তব্য করুন