যুক্তরাষ্ট্র- যে দেশকে আধুনিক গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক সুযোগের প্রতীক হিসেবে দেখা হয় সেই দেশেই জন্ম হয়েছিল আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবসের ঐতিহাসিক ভিত্তি। অথচ এক বৈপরীত্যও লক্ষণীয়: বিশ্বের বহু দেশে ১ মে জাতীয় ছুটি ও শ্রমিক সংহতির দিন হিসেবে উদযাপিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘লেবার ডে’ হিসেবে পালিত হয় সেপ্টেম্বর মাসে। তবুও মে দিবসের ইতিহাস ও চেতনা আমেরিকার মাটিতেই গভীরভাবে প্রোথিত।
১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে মার্কেট আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। শিল্পায়নের দ্রুত প্রসারের সময় শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ছিল অমানবিকভাবে দীর্ঘ, মজুরি ছিল অপ্রতুল এবং কর্মপরিবেশ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে শ্রমিকরা “আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা ব্যক্তিগত সময়”-এই দাবিতে রাস্তায় নামেন। ৪ মে সংঘটিত হে মার্কেট ট্র্যাজেডিতে প্রাণহানি এবং পরবর্তী বিচার প্রক্রিয়া শ্রমিক আন্দোলনকে আরও জোরালো করে তোলে। এই ঘটনাই পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী মে দিবস পালনের প্রেরণা হয়ে ওঠে।
আজকের যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমবাজার অনেক উন্নত ও সুশৃঙ্খল হলেও চ্যালেঞ্জ একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর্মঘণ্টার ভারসাম্য, স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, এবং শ্রমিক ইউনিয়নের অধিকার এসব ইস্যু এখনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমিক, অভিবাসী কর্মী মানুষদের জন্য কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
AFL-CIO-এর মতো সংগঠনগুলো শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে U.S. Department of Labor শ্রম আইন বাস্তবায়ন ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নে কাজ করছে। তবুও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার শ্রমবাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ফলে মে দিবসের চেতনা আজ নতুন প্রেক্ষাপটে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় যুক্তরাষ্ট্রের ‘এসেনশিয়াল ওয়ার্কার’ বা জরুরি সেবায় নিয়োজিত শ্রমিকদের অবদান নতুনভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মী, ডেলিভারি কর্মী, সুপারমার্কেট কর্মচারী-এরা জীবন ঝুঁকিতে রেখে সমাজকে সচল রেখেছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় তাদের সেই ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন কি নিশ্চিত হয়েছে?
মে দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হয় যখন তা শ্রমজীবী মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে শ্রমিকদের কণ্ঠস্বর শোনা এবং নীতিনির্ধারণে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মে দিবসের তাৎপর্য শুধুমাত্র অতীতের সংগ্রাম স্মরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের শ্রমবাজারকে আরও ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক করে তোলার আহ্বান। শ্রমিকদের মর্যাদা রক্ষা এবং বৈষম্য হ্রাসের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আগামী দিনের অঙ্গীকার।
মে দিবস শুধু ইতিহাস নয় বরং এটি একটি চলমান প্রতিশ্রুতি। এই দিবস গুরুত্বপূর্ণ একটি এমন বিশ্বের জন্য, যেখানে শ্রমের মূল্যায়ন হবে ন্যায্যভাবে, এবং প্রতিটি শ্রমিক পাবেন তার প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার।
মন্তব্য করুন