
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে ‘সিলেটের কৃষকের বাজার, প্রবাসীদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। গ্রীষ্মকালীন এই বাজারটি সপ্তাহের শনি ও রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মিশিগানের ডেট্রয়েটের জোসেফ ক্যাম্পাউ স্ট্রিটে অবস্থিত ইসলামিক সেন্টার পার্কিং এলাকায় সিলেটের কৃষকের বাজার নামক সবজি বাজারে বেচা-কেনা চলে। জানা যায়, প্রবাসের কর্মব্যস্ত জীবনে অনেক প্রবাসী কাজের ফাঁকে বাসা-বাড়ির পিছনে শখের বসে গ্রীষ্মকালীন সময়ে নানাজাতের শাকসবজি চাষ করে থাকেন। অনেকে পরিবারের চাহিদা পূরণ করে নিজের বাগানের ফলানো অতিরিক্ত সবজি বিক্রি করে বাড়তি টাকা ও উপার্জন করছেন। সৌখিন কৃষকদের শাকসবজি বিক্রিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘সিলেট ফার্মা’স মার্কেট’। সপ্তাহের শনি ও রোববার সকালবেলা বাগানের শাকসবজি বিক্রির উদ্দেশ্য কৃষকেরা ক্রেতার অপেক্ষায় থাকেন। বাগানের টাটকা শাকসবজি তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় অনেকে কৃষকদের বাজার থেকে শাকসবজি ক্রয় করে থাকেন। পছন্দের শাকসবজি কিনে অনেকেই উৎফুল্ল দেখা যায়। সরেজমিনে সিলেটের কৃষকের বাজার ঘুরে দেখা যায়, মিশিগানের ডেট্রয়েট ও হ্যামট্রামিক সিটিতে বসবাসকারী একাধিক কৃষক নিজেদের বাগানে ফলানো শাকসবজি বিক্রির জন্য টেবিল সাজিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় রয়েছেন। বাজার ঘুরে দেখা যায়, চাল কুমড়া, লাউ, মিস্টি লাউ, সিম, কচু, কচুর লতি, কাচাঁ মরিচ, নাগা মরিচ, বরবটি, টমেটো, জিংগা, ফুলকপি, বাধা কপিসহ নানা জাতের শাকসবজি নিয়ে বসে আছেন। টাটকা ও দামে সস্তা হওয়ায় দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সিলেট কৃষকের বাজার। সবজি ক্রেতা মানবেশ দে বলেন, ফ্রেশ সবজির জন্য এখান থেকে কেনাকাটা করি।
হ্যামট্রামিক শহরে বসবাসকারী জয়দীপ চৌধুরী বলেন, এখানে কৃষকরা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে শাকসবজি বিক্রি করে থাকেন।

ডেট্রয়েটে বসবাসকারী দবির মিয়া বলেন, সব দিক দিয়ে সুবিধা থাকায় এখান থেকে কেনাকাটা করি। কৃষক জিতু মিয়া বলেন, নিজের পরিবারের চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত শাকসবজি বিক্রি করে আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছি।
সিলেটের কৃষকের বাজারের অন্যতম পরিচালক ও এ কে এম রহমান বলেন, কৃষক আর ক্রেতার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে উভয় পক্ষ যেন লাভবান হয় এই উদ্দেশ্যে সিলিটের কৃষকের বাজার চালু করা হয়। চারবছর ধরে বাজারের কার্যক্রম চলছে।
এ কে এম রহমান দুই একর জায়গার উপরে ২০১৬ সালে শুরু করেন সিলেট ফার্ম। সহযোগিতায় অনেকে থাকলেও তিনি প্রধান উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করছেন। এ কে এম রহমানের জন্ম সিলেটে। সাত ভাই বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বাবা আব্দুল মুকিত করতেন সরকারি চাকুরী। ১৯৮৫ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন শেষে তিনি চলে আসেন আমেরিকাতে। বর্তমান পরিবারসহ এখানে অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, “এটি সম্পূর্ণ একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। কোনরকম সাহায্য ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছি। এখানে কাজ করার জন্য প্রত্যেক বছর জুলাই থেকে অক্টোবর মাসে আমেরিকার বিভিন্ন শহর এমনকি কানাডা থেকে অনেক ভলেন্টিয়ার বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন।”
সিলেট ফার্মের দুই একর জায়গার মধ্যে আছে আগাম বীজ বপন করার জন্য গ্রীন হাউজ, মুরগির ফার্ম ও পিকনিকের জায়গা ইত্যাদি। পিকনিকের জন্য যারা এখানে আসবেন তারা এখানকার সবজি বিনামূল্যে খেতে পারবেন। পাশাপাশি এই প্রজেক্টের মধ্যে আছে একটি মসজিদ। মসজিদের পাশে আলাদা একটি সবজি বাগান আছে। সিলেট ফার্ম মূলত একটি কমিউনিটি প্রজেক্ট। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কমিউনিটি প্রজেক্ট বলতে কমিউনিটির মানুষেরা এখানে বীজ বপন থেকে শুরু করে পানি দেওয়া পর্যন্ত সব কাজ করে থাকেন। অর্থাৎ আপনি এখানে শাকসবজি রোপন করে তা থেকে উৎপন্ন ফসল বিলিয়ে দিতে পারবেন। এটি চমৎকার একটি প্রক্রিয়া।”
এ প্রজেক্টে আগ্রহীরা আসতে পারবেন। এজন্য ২০ডলার ফি প্রদান করে নিতে হয় রেজিস্ট্রেশন ফর্ম। শাকসবজি লাগানোর জন্য জায়গা পাবেন ৪ফিট / ১০ফিট। সার থেকে শুরু করে পানি পর্যন্ত সবকিছু বিনামূল্য সরবরাহ করা হবে। বর্তমানে ১০০ এর অধিক পরিবার এই প্রজেক্ট এর সাথে যুক্ত আছেন। তবে এখান থেকে কোন আয় হয় না বলে তিনি জানান।

সিলেট ফার্মের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, “এখানে কমিউনিটির মানুষ আসে। তাদের মধ্যে আলাপ হয় এবং একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এখানে আমরা সিলেটি -নন সিলেটি সবাই সুসংগঠিত ভাবে একত্রে আছি। মূলত কমিউনিটিকে একত্রিত রাখা আমাদের এই প্রজেক্ট এর মূল উদ্দেশ্য।”
এ কে এম রহমান ছোটবেলার কথা স্মৃতিচারণ করে বলেন যে তিনি ছোটবেলায় বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত থাকতেন। “বাংলাদেশে থাকতে আমি গড়ে তুলি মৌসুমী ক্রীড়া ও সমাজ কল্যাণ সংস্থা। সমাজের ভালো কিছু করা ছিল সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য। সিলেটে আমরা গড়ে তুলি মৌসুমী আবাসিক এলাকা এবং ঘরে ঘরে নাম্বারিং প্রথার প্রচলন শুরু করি। একই ধারাবাহিকতায় কমিউনিটির স্বার্থে মিশিগানে শুরু করেছি সিলেট ফার্ম” তিনি শেষ করলেন।
মন্তব্য করুন