বিজ্ঞান শুধু আবিষ্কারের মাধ্যম নয়, এটি মানবজীবনের উন্নতির অন্যতম শক্তি। ইতিহাসে এমন কিছু বিজ্ঞানী রয়েছেন, যারা তাদের গবেষণাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করেছেন। ব্যারি কমনার ও ড. নরম্যান আর্নেস্ট বোরলগ ছিলেন তেমনই দুই মহান বিজ্ঞানী, যাদের অবদান পরিবেশ সুরক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আজও স্মরণীয়।
ব্যারি কমনার: পরিবেশ আন্দোলনের পথিকৃৎ
ব্যারি কমনার (১৯১৭-২০১২) ছিলেন একজন প্রখ্যাত সেলুলার জীববিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ ও সমাজকর্মী। পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য ১৯৭০ সালে Time Magazine তাকে “The Paul Revere of Ecology” হিসেবে আখ্যায়িত করে। তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেলুলার জীববিজ্ঞানে পিএইচডি লাভ করেন। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল Baby Tooth Survey, যেখানে তিনি প্রমাণ করেন যে পারমাণবিক পরীক্ষার ফলে উৎপন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ স্ট্রনশিয়াম-৯০ শিশুদের দাঁত ও হাড়ে জমা হচ্ছে। এই গবেষণা ১৯৬৩ সালের Partial Nuclear Test Ban Treaty স্বাক্ষরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তার বিখ্যাত বই “The Closing Circle”-এ তিনি বাস্তুবিদ্যার চারটি মূলনীতি তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, পরিবেশ সংকটের পেছনে শুধু বৈজ্ঞানিক নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় তার চিন্তাধারা আজও বিশ্বজুড়ে প্রভাবশালী। ২০১২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৯৫ বছর বয়সে ম্যানহাটনে মৃত্যুবরণ করেন ব্যারি কমনার। তবে পরিবেশ রক্ষা, বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে তার চিন্তাধারা আজও বিশ্বব্যাপী প্রাসঙ্গিক।
নরম্যান বোরলগ: সবুজ বিপ্লবের জনক
ড. নরম্যান আর্নেস্ট বোরলগ (১৯১৪-২০০৯) ছিলেন একজন বিশ্বখ্যাত কৃষিবিজ্ঞানী, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদ ও মানবতাবাদী। ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অসাধারণ অবদানের জন্য তাকে “সবুজ বিপ্লবের জনক” বলা হয়। মেক্সিকোতে গবেষণার মাধ্যমে তিনি উচ্চ ফলনশীল ও রোগ প্রতিরোধী আধা-বামন গম উদ্ভাবন করেন। তার এই আবিষ্কারের ফলে মেক্সিকো খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে গম রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ভারত ও পাকিস্তানে তার কৃষি প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে গম উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং কোটি কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তির কারণে প্রায় এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
১৯৭০ সালে তিনি ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি Presidential Medal of Freedom ও Congressional Gold Medalসহ বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি World Food Prize প্রতিষ্ঠা করেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি কৃষি গবেষণা ও শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটিতে তিনি শিক্ষকতা ও গবেষণা চালিয়ে যান। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ৯৫ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ডালাসে মৃত্যুবরণ করেন এই মহান বিজ্ঞানী।
ব্যারি কমনার ও নরম্যান বোরলগ দুই ভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করলেও তাদের লক্ষ্য ছিল মানবকল্যাণ। কমনার পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বকে বুঝিয়েছেন, আর বোরলগ কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। বিজ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের অবদান বিশ্ব ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন