১৯৯০ সাল থেকে তিন দশকে কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় ১০ লাখ কোটি (১০ ট্রিলিয়ন) ডলারের ক্ষতির জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র। বিশাল অঙ্কের এ অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ খোদ যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরই হয়েছে। গত বুধবার প্রখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুসারে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে যে পরিমাণ অর্থনৈতিক লোকসান হয়েছে, তার পেছনে একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি অবদান যুক্তরাষ্ট্রের। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন। বর্তমান বিশ্বের বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশটি ১৯৯০ সাল থেকে বৈশ্বিক জিডিপিতে প্রায় ৯ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির জন্য দায়ী।
গবেষকরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কার্বন নিঃসরণজনিত কারণে হওয়া মোট ক্ষতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ খোদ দেশটির ওপরই প্রভাব ফেলেছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়েছে দরিদ্র দেশগুলো। হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কার্বন নিঃসরণে ভারতের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলার এবং ব্রাজিলের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি ডলার।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী মার্শাল বার্কের নেতৃত্বে এ গবেষণা পরিচালিত হয়। তিনি জানান, ক্ষতির পরিমাণ বিশাল। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এ ক্ষয়ক্ষতির বিশাল দায়ভার বর্তায়। যুক্তরাষ্ট্রের কার্বন নিঃসরণ শুধু নিজেদের নয়, বরং বিশ্বের অন্যান্য অংশেও অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করেছে। গবেষণায় ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ক্ষতি ও লোকসানের আর্থিক মূল্য নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা ও ফসলহানির মতো দুর্যোগের প্রভাব এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্পবিপ্লবের পর থেকে ধনী দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করেছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার দাবি দীর্ঘদিনের।
নতুন এই গবেষণায় বৈশ্বিক উষ্ণতা কীভাবে বিভিন্ন দেশের জিডিপি কমিয়ে দিয়েছে, তা হিসাব করে দেখানো হয়েছে। ১৯৯০ সালের পর থেকে কোন দেশ কত নিঃসরণ করেছে, তার ভিত্তিতে দায়ও নির্ধারণ করা হয়েছে। এ হিসাবে সব ধরনের ক্ষতি পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এখানে দেখানো হয়েছে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা কীভাবে শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমিয়ে এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
গবেষক মার্শাল বার্ক বলেন, তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়, এমন স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এই প্রভাব ৩০ বছর ধরে জমতে থাকলে শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। এটি যেন হাজার ছোট আঘাতে ধীরে ধীরে ক্ষয় হওয়ার মতো। তে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এমন মানুষ, যারা এই সমস্যার জন্য দায়ী নয়। এটা মৌলিকভাবেই অন্যায্য।
জলবায়ু দূষণের জন্য আইনি দায় স্বীকারের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অনীহা দেখিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এ দূষণই বিশ্বকে এমন জলবায়ু পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে আগে দেখা যায়নি।
বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ অবস্থানকে আরও জোরদার করেছেন। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সহায়তায় গঠিত ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন। পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি থেকেও দেশকে বের করে আনেন এবং তেল-গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর পক্ষে ‘ড্রিল, বেবি, ড্রিল’ নীতি ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে তিনি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রকল্পগুলোতেও বাধার সৃষ্টি করেন।
গবেষক মার্শাল বার্ক বলেন, ‘আমাদের এই গবেষণার ফল হয়তো ট্রাম্প প্রশাসনকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পারবে না, তবে এটি স্পষ্ট করে যে তাদের তা করা উচিত।’
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সেস মুর বলেন, গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও দরিদ্র দেশগুলোর প্রকৃত ক্ষতির পুরোপুরি চিত্র এতে উঠে আসেনি। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, একজন দরিদ্র মানুষের এক ডলার ক্ষতির প্রভাব একজন ধনী মানুষের একই পরিমাণ ক্ষতির তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু এই পার্থক্য গবেষণায় বিবেচনা করা হয়নি।
মন্তব্য করুন