ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো রোজা। রোজার প্রতিটি মুহূর্তই মর্যাদাপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। রোজার আরবি প্রতিশব্দ ‘সিয়াম’, যার শাব্দিক অর্থ সংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও বিরত থাকা। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার ও দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে বিরত থাকার নামই রোজা। পুরো রমজান মাস সিয়াম পালন করা ফরজ। হাদীস শরীফে এসেছে— “যে ব্যক্তি পূর্ণ বিশ্বাস ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, আল্লাহ তায়ালা তার জীবনের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯০১)
রমজান মাসে প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়। রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে— “রমজান শুরু হলেই রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০৭৯/২)
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন— “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা বাকারা: ১৮৩)। আরও বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসের রোজা পালন করে।” (সূরা বাকারা: ১৮৫)
রমজানে করণীয়
১. কুরআন তেলাওয়াত:
রমজান কুরআন নাজিলের মাস। রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের প্রতি রাতে জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে কোরআন দাওর করতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯০২)। সাহাবায়ে কেরামও এ মাসে অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াতে মনোযোগ দিতেন।
২. তারাবির নামাজ:
রমজানের বিশেষ আমল হলো কিয়ামে রমজান তথা তারাবি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় তারাবি আদায় করবে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (বুখারি)
৩. দান-সদকা বৃদ্ধি:
দান সর্বাবস্থায় উত্তম, তবে রমজানে এর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ মাসে সবচেয়ে বেশি দান করতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯০২)
৪. নফল ইবাদত:
শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকার এ মাসে নফল নামাজ—ইশরাক, চাশত, তাহাজ্জুদসহ অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা সহজ হয়। (তিরমিজি, হাদীস ৬৮৪)
৫. ইফতার ও ইফতার করানো:
দ্রুত ইফতার করা সুন্নত। খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার করার নির্দেশ রয়েছে। (আবু দাউদ, হাদীস ২৩৫৭)। রোজাদারকে ইফতার করানো সমপরিমাণ সওয়াবের কারণ। (ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৭৪৬)
৬. তাওবা ও মাগফিরাত কামনা:
রমজান পেয়েও গুনাহ মাফ না করানো দুর্ভাগ্যের বিষয়। তাই বেশি বেশি ইস্তিগফার করা উচিত।
৭. শবে কদর অন্বেষণ:
শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করা কর্তব্য। পবিত্র কোরআনে এ রাতকে এক হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। (সূরা কদর: ১-৫)
৮. ইতিকাফ:
রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নত আমল। (বুখারি, হাদীস ২০২১)
৯. ফিতরা প্রদান:
ঈদের নামাজের আগে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। (বুখারি, হাদীস ১৫০৩)
১০. ওমরাহ পালন:
রমজানে একটি ওমরাহ হজের সমতুল্য সওয়াবের অধিকারী। (বুখারি, হাদীস ১৮)
রমজানে বর্জনীয়
১. ইফতার পার্টির নামে বেহায়াপনা:
পর্দাহীন পরিবেশে ইফতার আয়োজন ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।
২. দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও মজুতদারি:
রমজানে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মুনাফা লোভী আচরণ কঠোরভাবে নিন্দিত। (সুনানে ইবনে মাজাহ)
৩. অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা:
রোজা অবস্থায় মন্দ কথা ও আচরণ থেকে বিরত না থাকলে রোজার প্রকৃত সওয়াব নষ্ট হয়। (ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৬৯০)
৪. বিবাদ-বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা:
ঝগড়া-বিবাদ, অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে থাকা জরুরি। (বুখারি, হাদীস ১৯০৪)
৫. অধীনস্থদের প্রতি কঠোরতা:
রমজানে কর্মীদের কাজের চাপ লাঘব করা সওয়াবের কাজ। (সহিহ ইবনে খোজায়মা)
৬. গিবত:
গিবত নেক আমল ধ্বংস করে দেয়।
৭. অপচয় ও অপব্যয়:
অপব্যয়কারীকে কোরআনে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে।
৮. রিয়া (লোক দেখানো ইবাদত):
রিয়া শরিয়তে হারাম এবং ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
৯. মিথ্যাচার:
মিথ্যা পরিহার না করলে রোজার গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়। (বুখারি, হাদীস ১৯০৩)
১০. বিদআত পরিহার:
শেষ দশকের প্রতিটি বিজোড় রাতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে হবে। দ্বীনে নতুন উদ্ভাবিত বিষয় পরিহার করা আবশ্যক। (মুসলিম, নাসাঈ)
পরিশেষে বলা যায়, রমজান আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়া অর্জনের মাস। এ মাসের প্রতিটি মুহূর্ত যথাযথভাবে কাজে লাগানো এবং বর্জনীয় বিষয় থেকে বিরত থাকাই প্রকৃত সাফল্য। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে রমজানের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করে সিয়াম পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য করুন