দেশের চলমান নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির ডা. শফিকুর রহমানের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। বিভিন্ন নির্বাচনী সমাবেশে একে-অন্যের বক্তব্য খণ্ডন করে অবস্থান স্পষ্ট করায় রাজনৈতিক মাঠে তৈরি হয়েছে দৃশ্যমান উত্তাপ।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে উভয় নেতা নিজ নিজ দলের কর্মসূচি ও জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে জাতীয় রাজনীতি, নির্বাচন, জোট সমীকরণ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপরিচালনার প্রশ্নে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে একে-অন্যের সমালোচনা করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বাকযুদ্ধ শুধু ব্যক্তিগত অবস্থান নয়, বরং দলীয় কৌশল ও ভোটারদের কাছে নিজস্ব অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রচেষ্টারই অংশ।
তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জনগণের ভূমিকার ওপর জোর দিচ্ছেন। অন্যদিকে ডা. শফিকুর রহমান জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক অবস্থান, নীতিভিত্তিক রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় মূল্যবোধের প্রশ্ন সামনে আনছেন। তবে বক্তব্যের ভেতরে পারস্পরিক ইঙ্গিতপূর্ণ সমালোচনা রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, যা নির্বাচনী পরিবেশকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) তারিখে অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ৭:৩০ টা থেকে বিকেল ৪:৩০ টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। নির্বাচনী প্রচারের সময়সীমা ২২ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭:৩০ টা পর্যন্ত। একই দিনে (১২ ফেব্রুয়ারি) ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচনে মোট ৩০০টি সংসদীয় আসন। অংশগ্রহণকারী দল ৫১টি। মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১,৯৯৪ প্রার্থী, স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৫৬ জন। মোট ভোটার ১২,৭৬,৯৫,১৮৩ *পোস্টাল ভোটার ১৫,৩৩,৬৮২। পুরুষ ভোটার ৬,৪৮,১৪,৯০৭, নারী ভোটার ৬,২৮,৭৯,০৪২। হিজড়া ভোটার ১,২৩৪ জন। নির্বাচনটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ভোটারদের কেন্দ্র খুঁজে পাওয়া এবং প্রার্থীদের হলফনামা দেখার জন্য নির্বাচন কমিশন স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ বিডি নামে একটি অ্যাপ চালু করেছে। নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে বডি-ওর্ন ক্যামেরা, সিসিটিভি এবং ড্রোনের ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। এবারই প্রথমবারের মতো বিদেশে অবস্থানরত ভোটার এবং জেলবন্দিদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গত ১২ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে তারেক রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং সমমনা দলগুলোর সাথে আসন বণ্টন সম্পন্ন করেছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১টি দলের সমন্বয়ে একটি নির্বাচনী জোট গঠন করেছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দলটি বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত থাকায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানানো হয়েছে, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে এবং নির্বাচনের ৪ দিন আগে থেকে ২ দিন পর পর্যন্ত বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান পরিষ্কার হওয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও বক্তব্যের ভাষা ও সুর ভবিষ্যৎ সমঝোতা ও জোট রাজনীতির সম্ভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে সরকারবিরোধী রাজনীতির ভেতরে পারস্পরিক দূরত্ব কতটা বাড়ে বা কমে তা নির্বাচনী ফলাফল ও পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে, দুই শীর্ষ নেতার এই বাকযুদ্ধ নির্বাচনী রাজনীতিকে আরও গতিশীল করে তুললেও তা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেবে রাজনৈতিক মহলের এখন সেদিকেই দৃষ্টি।
মন্তব্য করুন