বাংলা সংবাদ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:১৬ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

আইসিই কেন বিতর্কের কেন্দ্রে: যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন রাজনীতির বাস্তব চিত্র

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে সম্প্রতি ৩৭ বছর বয়সী রিনি নিকোল গুড নামে এক নারী দেশটির ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট সংস্থার (আইসিই) এক সদস্যের গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাটির প্রতি মানুষের মনোভাব হয়ে ওঠে আরও ক্ষুব্ধ।

 

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে আইসিই তৎপরতা বৃদ্ধি করেছেন। হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। আইসিই সদস্যরা যেভাবে গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করছেন, তা নিয়ে দেশটির নাগরিকদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব বেড়েছে। কখনো কখনো তা সংঘাতের পর্যায়ে গড়িয়েছে। আইসিই কী এবং কখন গঠিত হয়: অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্যাপকহারে বহিষ্কার করা ট্রাম্পের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। এ কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে আইসিই, যা দেশটিতে আইস নামেও পরিচিত।

ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আইসিইর বাজেট ও কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। সংস্থাটি অভিবাসন আইন প্রয়োগ করে এবং অবৈধ অভিবাসন-সম্পর্কিত তদন্ত পরিচালনা করে। অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি আইনের অংশ হিসেবে ২০০২ সালে আইসিই গঠিত হয়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তরটি (ডিএইচএস) চালু করা হয়। আইসিই এ বিভাগের অধীন পরিচালিত একটি সংস্থা।

আইসিই কি কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে: যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ পুলিশ বিভাগ ও আইসিইর ক্ষমতার মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বাসিন্দাকে অবৈধ বলে সন্দেহ হলে আইসিই তাকে থামাতে, আটক ও গ্রেপ্তার করতে পারে। কোনো মার্কিন নাগরিক যদি গ্রেপ্তারে বাধা দেন বা কোনো কর্মকর্তার ওপর আক্রমণ করেন, আইসিই সদস্যরা তাকেও আটক করতে পারেন। তবে কোনো বাড়ি বা ব্যক্তিগত পরিসরে (স্পেস) প্রবেশের জন্য তাদের পরোয়ানার দরকার হয়।

 

 

বলপ্রয়োগের ক্ষমতা: আইসিইর বল প্রয়োগের ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান, আইন ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তরের নিজস্ব নীতি-নির্দেশনার সমন্বয়ে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিল শহরের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায়বিচার কর্মসূচির পরিচালক ক্রিস স্লোবোগিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুসারে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ‘কেবল তখনই প্রাণঘাতী বল প্রয়োগ করতে পারে, যদি ব্যক্তি তাদের বা অন্য মানুষের জন্য গুরুতর বিপদের কারণ হয়। অথবা ওই ব্যক্তি যদি সহিংস কোনো অপরাধ করে।’

 

 

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিকভাবে এমন নীতি অনুসরণ করে এসেছেন, যেখানে মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া কর্মকর্তাদের অনেক বেশি ছাড় দেওয়া হয়। হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ২০২৩ সালের একটি নির্দেশিকায় বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তারা কেবল তখনই প্রাণঘাতী বল ব্যবহার করতে পারবেন, যখন যুক্তিসংগত কারণে মনে হয়, কেউ তাদের বা অন্য কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে মারাত্মক আঘাত করতে বা হত্যা করতে পারে। মিনিয়াপোলিসে রিনি গুড যখন এক আইসিই সদস্যের গুলিতে নিহত হন, তখন তিনি গাড়ি চালাচ্ছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ওই আইসিই সদস্য আত্মরক্ষায় গুলি চালিয়েছেন; কিন্তু স্থানীয় কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, রিনি গুড ওই আইসিই সদস্যের জন্য কোনো বিপদ সৃষ্টি করেননি।

 

 

রিনি গুডের মৃত্যুকে ঘিরে কেন্দ্রের সঙ্গে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। এ ঘটনায় রাজ্য সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছে। আইসিই সদস্যদের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে মোতায়েন বন্ধ করতে এ মামলা করা হয়েছে। আইসিইর কাছে আটকের পর কী হয়: ট্রাম্প প্রশাসন চলতি মেয়াদে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম ব্যাপকহারে বৃদ্ধি করেছে। এক বছর আগে ক্ষমতা গ্রহণের পর তার প্রশাসন অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার জন্য বড় ধরনের প্রচার চালিয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। প্রশাসনের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে ৬ লাখ ৫ হাজার মানুষকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ১৯ লাখ অভিবাসী ‘স্বেচ্ছায়’ নিজ দেশে ফিরে গেছেন।

 

 

কোনো অভিবাসী যদি আইসিইর হাতে ধরা পড়েন, তাহলে তিনি নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন। কখনো কখনো কোনো অভিবাসীকে সাময়িকভাবে আটক করা হতে পারে। এরপর জেরা করে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। কখনো কখনো কোনো অভিবাসীকে দীর্ঘ সময় আটক রাখা হতে পারে। তাকে আইসিইর বড় কোনো আটককেন্দ্রে রাখা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আইসিইর বড় বড় আটককেন্দ্র রয়েছে। আটক অবস্থা থেকে অনেক অভিবাসী আইনি লড়াইয়ের সুযোগ পান। কিন্তু এতে ব্যর্থ হলে তাদের ফেরত পাঠানো হতে পারে। ট্র্যানজেকশনাল রেকর্ডস অ্যাকসেস ক্লিয়ারিং হাউসের (ট্র্যাক) তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ আইসিইর আটককেন্দ্রে ছিলেন।

 

 

নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া: আইসিই ও ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের অভিযানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের বাসিন্দারা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এখন আইসিই সদস্যদের গ্রেপ্তার অভিযান ভিডিও করা স্থানীয় মানুষের জন্য সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কখনো কখনো আইসিই সদস্য ও স্থানীয় মানুষেদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগো শহরে আইসিইর অভিযান নিয়ে সংবাদমাধ্যমের একটি জোট ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, এসব বাহিনীর সদস্যরা সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতা ও প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ করেছেন। একজন কেন্দ্রীয় বিচারক সংবাদমাধ্যমের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন; কিন্তু পরে একটি আপিল আদালত সেই রায় বাতিল করে দেন।

 

 

মার্কিনিদের মত: বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের অভিবাসন আইন নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি সরল নয়। গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে বলা হয়, মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ট্রাম্পের অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো নিয়ে ভিন্ন চিন্তাভাবনা আছে। এতে দেখা যায়, ৫৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক মনে করেন, অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর পদ্ধতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ‘বাড়াবাড়ি’ করছে। তবে প্রায় ৩৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এ পদ্ধতিকে সমর্থন করেন।মিনেসোটায় ৫ বছরের শিশুকে আটক করে নিয়ে গেছে আইসিই।

 

 

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের কলাম্বিয়া হাইটস শহর থেকে কমপক্ষে চারটি শিশুকে আটক করেছে আইসিই। এর মধ্যে একটি শিশুর বয়স মাত্র পাঁচ বছর। স্থানীয় একটি স্কুলের কর্মকর্তা এবং ওই শিশুদের পরিবারের আইনজীবী এমন তথ্য দিয়েছেন। পাঁচ বছরের এই শিশুটিকে আটকের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দেওয়া ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন আইনজীবী। লিয়াম কোনেহো রামোস নামের ওই শিশুর পরিবারের আইনজীবী মার্ক প্রোকশ বলেন, লিয়াম ও তার বাবা ইকুয়েডরের নাগরিক। দুজনই যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের আবেদনকারী হিসেবে দেশটিতে বৈধভাবে ছিলেন। তাদের দুজনকেই টেক্সাসের ডিলিতে একটি পারিবারিক আটক কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

 

 

কলাম্বিয়া হাইটস পাবলিক স্কুল ডিস্ট্রিক্টের সুপারিনটেনডেন্ট জেনা স্টেনভিক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চলতি সপ্তাহে সশস্ত্র ও মুখোশধারী আইসিই কর্মকর্তারা সেখানকার চার শিক্ষার্থীকে আটক করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আটক চারজনের মধ্যে দুজন ১৭ বছর বয়সী, একজন ১০ বছর বয়সী এবং একজন ৫ বছর বয়সী। ওই পাঁচ বছর বয়সী শিশুটির নাম লিয়াম কোনেহো রামোস। স্টেনভিক বলেন, ‘আইসিই এজেন্টরা আমাদের পাড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আমাদের স্কুলগুলোর চারপাশে ঘোরাফেরা করছেন, আমাদের বাসগুলোকে অনুসরণ করছেন, একাধিকবার আমাদের পার্কিং লটে ঢুকেছেন এবং আমাদের সন্তানদের নিয়ে যাচ্ছেন।’ স্টেনভিক আরও বলেন, আইসিইয়ের এমন কর্মকাণ্ড তার এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। শিশুদের মনে এর গভীর প্রভাব পড়ছে।

সূত্র: বিবিসি

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ডেট্রয়েটে মা গ্রোসারী এন্ড সুপার মার্কেট–এর গ্র্যান্ড ওপেনিং, রমজান উপলক্ষে বিগ সেল

কারাগারে গণতন্ত্রের অংশগ্রহণ: শুরু হলো কারাবন্দীদের ভোটগ্রহণ

মিশিগানে সিলেট-৪ আসনের মনোনীত প্রার্থী আরিফুল হকের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত

এপস্টেইন ফাইল: কেন হঠাৎ বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে?

শেষ মুহূর্তে অর্থায়ন মিললেও আংশিকভাবে শাটডাউনে যুক্তরাষ্ট্র সরকার

যাত্রা শুরু করল ‘সারা ব্রাইডাল’, জমকালো আয়োজনে উদ্বোধন

যুক্তরাষ্ট্রে ঘরোয়া ফ্লাইটে রিয়েল আইডি বাধ্যতামূলক, ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর

যুক্তরাজ্যের চীন চুক্তিকে ‘বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত’ বললেন ট্রাম্প

পাকিস্তান ভ্রমণে মার্কিন নাগরিকদের জন্য নতুন নির্দেশনা জারি

জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি প্রেস হিসেবে যোগদান করলেন মেধাবী কর্মকর্তা মো: সালাহ উদ্দিন

১০

মার্কিন ভিসানীতিতে পরিবর্তন: সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ভারতীয়রা

১১

কমলগঞ্জে খেলাফত মজলিসের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী জনসভা – প্রধান অতিথি মাওলানা মামুনুল হক

১২

মুক্তহাতে দুঃসাহসিক আরোহণ, নতুন রেকর্ড গড়লেন অ্যালেক্স হনল্ড

১৩

কী এই ভিসা বন্ড পাইলট প্রোগ্রাম, কেন চালু হচ্ছে?

১৪

খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার নামে রাস্তার নামকরণ অনুমোদন ও পরবর্তীতে বাতিল এবং আমরা প্রবাসী বাংলাদেশিরা

১৫

সহনশীল পাড়া-মহল্লা: ডিপলি রুটেড গার্ডেনস কৃষ্ণাঙ্গ কৃষকদের জন্য বাধা কমাচ্ছে

১৬

বরফের চাদরে নিউইয়র্ক–মিশিগানসহ বহু অঙ্গরাজ্য, গৃহবন্দি কোটি মানুষ

১৭

নীরবে শরীর ধ্বংস করছে ডায়াবেটিস: লক্ষণ বুঝলেই বিপদ এড়ানো সম্ভব

১৮

শীতে বিপর্যয়: যুক্তরাষ্ট্রে তুষারঝড়ে ১১ জনের প্রাণহানি

১৯

নিলামে ইতিহাস: ৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় বিক্রি ডন ব্র্যাডম্যানের ব্যাগি গ্রিন

২০