ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল ইসলাম
৩০ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৩০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

কৈশোরকালীন সঙ্কট ও করণীয় বিষয়ে অভিভাবক এবং কমিউনিটির ভূমিকা অপরিসীম

পেশাগত কারণে প্রতিদিন বহু পরিবারের সঙ্গে দেখা হয়। তাঁদের সঙ্গে আলাপচারিতায় বারবার একটি সাধারণ সমস্যা চোখে পড়ে-আমাদের বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেক অভিভাবক কিশোর সন্তানদের নিয়ে উদ্বেগে আছেন। তাঁরা দেখছেন, সন্তানদের আচরণ ও মানসিকতায় অজানা পরিবর্তন আসছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যখন অভিভাবকরা এই পরিবর্তন বুঝতে পারেন, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়।

 

 

কৈশোর-এক সংবেদনশীল পরিবর্তনের সময়, কৈশোর হলো জীবনের এমন একটি ধাপ, যখন শিশুর মধ্যে দ্রুত শারীরিক, মানসিক, আবেগিক ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটে। এ বয়সে কিশোররা নিজেদের পরিচয় খুঁজে পেতে চায়, স্বাধীনতা কামনা করে, আবার একই সঙ্গে বিভ্রান্ত হয়। এই সময় বাইরের প্রভাব-বিশেষ করে খারাপ সঙ্গ, সামাজিক মাধ্যমের অযাচিত প্রভাব, বা ভুল দিকনির্দেশনা-তাদের সহজেই বিপথে নিয়ে যেতে পারে।

 

 

কিছু কিশোর নেশা, গ্যাং বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে; আবার কেউ কেউ অতিমেধাবী ও অতিউৎসাহী হয়ে দ্রুত বড় কিছু হতে চায়। বাস্তবতার সঙ্গে নিজের আকাঙ্ক্ষার ভারসাম্য না রাখতে পারায় হতাশা, আত্মসম্মানবোধের হ্রাস ও মানসিক বিপর্যয় দেখা দেয়। অনেক সময় এই হতাশা থেকে তারা একাকিত্বে ভোগে, আত্মক্ষতি বা আত্মহত্যার চিন্তায় নিমজ্জিত হয়।

 

 

সমস্যা নতুন নয়, তবে পরিস্থিতি এখন আরও জটিল কৈশোরকালীন মানসিক ও সামাজিক সংকট নতুন কিছু নয়। তবে প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান জীবনে বিষয়টি বহুগুণ বেড়েছে। কিশোররা এখন মোবাইল, গেমস ও সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে থাকে। ভার্চুয়াল সম্পর্ক বাস্তব সম্পর্ককে দুর্বল করছে। পরিবারে ব্যস্ত অভিভাবকরা সময় দিতে না পারায় সন্তানরা মানসিকভাবে একা হয়ে পড়ছে। এর ফলে তারা ভুল দিকনির্দেশনার শিকার হচ্ছে এবং সমাজে একটি নীরব হতাশা ছড়িয়ে পড়ছে।

 

 

অভিভাবকদের উচিত সন্তানের আচরণে পরিবর্তনগুলি লক্ষ্য রাখা। কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো- দীর্ঘ সময় একা থাকা বা দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকা, পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলা বা স্কুলে অনুপস্থিতি, পরিবারের সঙ্গে খাবার না খাওয়া, সামাজিকতা এড়িয়ে চলা, হঠাৎ মেজাজ পরিবর্তন, চুপচাপ থাকা বা রাগারাগি করা, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার বা গোপনে কিছু লুকানো।

 

 

এই লক্ষণগুলো উপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে। এমন সময় অভিভাবকের করণীয় হলো-সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা, তার অনুভূতি বোঝা, এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলর বা মনোবিদের সহায়তা নেওয়া।

 

 

ইসলামে কিশোরদের সঠিক পথে গড়ে তোলার জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন-‘প্রত্যেক অভিভাবক একজন রক্ষণাবেক্ষক এবং তাঁর দায়িত্ব হলো অধীনস্থদের সঠিকভাবে পরিচালিত করা।’

 

 

অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সৎ ও ধার্মিক বন্ধুত্বে উৎসাহিত করা, সময়কে অর্থবহ কাজে ব্যবহার শেখানো এবং বিবাহযোগ্য হলে বিবাহে উৎসাহ দেওয়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-“যে বিবাহ করতে সক্ষম, সে যেন বিবাহ করে; এটি দৃষ্টিকে সংযত রাখে ও পবিত্রতা রক্ষা করে।” (সহীহ বুখারি ৫০৬৬)

 

 

একইসঙ্গে সন্তানদের জন্য নিয়মিত দোয়া করা, নামাজ, রোজা ও নৈতিকতার চর্চায় উৎসাহিত করা জরুরি। প্রযুক্তি ব্যবহারে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে-কম্পিউটার বা স্মার্টফোন যেন খোলা জায়গায় ব্যবহৃত হয় এবং ব্যবহার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।

 

 

শুধু পরিবার নয়, কমিউনিটিকেও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। বাস্তবসম্মত কিছু পদক্ষেপ হতে পারে-অভিভাবক ও কিশোরদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা আয়োজন, যেখানে বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক ও আলেমরা দিকনির্দেশনা দেবেন। শিক্ষার্থীদের ফলাফল, আচরণ বা সামাজিক অবদানে স্বীকৃতি ও পুরস্কার প্রদান। ইসলামের মহান ব্যক্তিত্বদের জীবন থেকে শিক্ষণীয় আলোচনা ও আদর্শ তুলে ধরা। কমিউনিটি সেন্টার বা মসজিদে কিশোরদের জন্য বিনোদন, পাঠচক্র ও নেতৃত্ব প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। ইতিবাচক ইসলামী বই, ভিডিও ও নৈতিক গল্পের মাধ্যমে মানসিক বিকাশে সহায়তা করা।

 

 

কৈশোর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের দায়িত্ব হলো-তরুণদের ভালোবাসা, দিকনির্দেশনা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে গড়ে তোলা। ইসলামী আদর্শে শিক্ষিত, আত্মনিয়ন্ত্রিত ও নৈতিক প্রজন্মই পারে এক দৃঢ়, সচেতন ও আলোকিত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। তাই এখনই সময় আমাদের সম্মিলিতভাবে এই প্রজন্মকে রক্ষা করার-কারণ তারাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বারহাম সালিহ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

সিএনএনসহ তিন সংবাদমাধ্যমের মামলা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫ হাজারের বেশি অভিবাসী তৃতীয় দেশে পাঠানো হয়েছে

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের জন্য নতুন নিরাপত্তা সতর্কতা জারি

মেডিকেইডের ওষুধের দাম কমাতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নতুন নীতি ট্রাম্প প্রশাসনের

যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ কর্মী ভিসায় ১ লাখ ডলারের ফি আরও এক বছর

তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে আবার বাড়ল সুদের হার

১৮ সেপ্টেম্বর থেকে গ্রিনকার্ডে নতুন পাবলিক চার্জ নিয়ম

গুগলের বিজ্ঞাপন ব্যবসায় লাগাম, মার্কিন নজরদারিতে প্রতিষ্ঠানটি

বিজিবির অভিযানে মাদক-অস্ত্রসহ ৯১৩ কোটি টাকার পণ্য জব্দ, আটক ২৮১

১০

ডেট্রয়েট থেকে আটলান্টিক সিটি, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির বিস্তৃত উপস্থিতি

১১

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমাতে ডলারের বিকল্প খুঁজছে বিভিন্ন দেশ

১২

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে চীনের সঙ্গে বৈঠকে বসছে যুক্তরাষ্ট্র

১৩

গ্রিন কার্ড স্পনসরশিপে নতুন নিয়ম যুক্তরাষ্ট্রে, যাচাই হবে স্পনসরের ক্রেডিট তথ্য

১৪

সৌদি আরবে ভ্রমণ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

১৫

ডাকযোগে ভোটের পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের উদ্যোগে বাধা

১৬

যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ ভোটের অভিযোগে ৭ গ্রিন কার্ডধারী গ্রেপ্তার

১৭

ছয় বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ছাড়ার হার সর্বোচ্চ

১৮

প্রথমবার প্রকাশ্যে মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের স্বীকারোক্তি যুক্তরাষ্ট্রের

১৯

নবীনদের বরণ, গ্র্যাজুয়েটদের বিদায়: ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে বিজিএসএ’র যাত্রা শুরু

২০