আলাস্কার যৌথ সামরিক ঘাঁটিতে প্রথমবার মুখোমুখি বৈঠকে বসেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বৈঠক শেষে উভয় নেতা সংবাদ সম্মেলনে হাজির হলেও শান্তি আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করেননি। তবে আলোচনার দাবি-দাওয়ার খসড়া ইতোমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে পাঁচটি মূল দাবি সামনে এসেছে। দখলকৃত ভূখণ্ড ইউক্রেনকে ছাড়তে হবে। ন্যাটো সদস্যপদ প্রত্যাহার করতে হবে। সামরিক শক্তি ভেঙে ফেলতে হবে। একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে যুদ্ধের মূল কারণ স্বীকার করতে হবে। এবং কিয়েভে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে হবে। অর্থাৎ, শান্তি বিনিময়ে পুতিন কার্যত ইউক্রেনকে আধা-স্বাধীন অবস্থায় নামিয়ে আনতে চাইছেন।
অন্যদিকে ইউক্রেন জানিয়ে দিয়েছে—যেকোনো আলোচনার আগে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন। পাশাপাশি তারা দাবি তুলেছে নিরাপত্তার গ্যারান্টি, যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ, শিশু ও যুদ্ধবন্দীদের ফেরত এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা। মূলত নিজেদের টিকে থাকার জন্য আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতির নিশ্চয়তা চাইছে জেলেনস্কির সরকার।
বৈঠক শেষে ট্রাম্প বলেছেন, “অনেক বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। তবে বড় কিছু ইস্যু এখনও মীমাংসা হয়নি। তাই চুক্তি হয়নি, যতক্ষণ না সব মিলে যায়।” তিনি জানান, শিগগিরই ন্যাটোর সঙ্গে এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করবেন। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—পুনর্নির্বাচিত হলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করবেন। সেই অঙ্গীকার পূরণের পথেই এটি তাঁর প্রথম কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
সিনেটর রজার মার্শাল স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ইউরোপকে নেতৃত্ব নিতে হবে। তাঁর মতে, “এটা বাইডেনের যুদ্ধ, ইউরোপের যুদ্ধ। আমেরিকা সাহায্য করবে, কিন্তু দায়িত্ব নিতে হবে ইউরোপকেই।” তিনি পুতিনকে “রক্তপিপাসু যুদ্ধাপরাধী” উল্লেখ করে জানান, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে। তবে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
মার্শালের মন্তব্যেই ইঙ্গিত মিলেছে—ট্রাম্প হয়তো রাশিয়ার সহযোগী দেশগুলোর বিরুদ্ধেও চাপ বাড়াবেন। ব্রাজিল, ভারত, চীন—সবাইকে সেকেন্ডারি স্যাংশনের আওতায় আনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এতে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও কূটনীতির সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এই বৈঠক প্রমাণ করেছে, যুদ্ধবিরতির পথ শুধু কিয়েভ ও মস্কোর হাতে নেই। বরং মার্কিন কূটনীতি ও ইউরোপীয় নেতৃত্বের উপরই এর সমাধান নির্ভর করছে। রাশিয়ার দাবি যেখানে ইউক্রেনকে কার্যত পরাজিত রাষ্ট্রে পরিণত করার ইঙ্গিত দেয়, সেখানে ইউক্রেনের দাবি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে। দুই চরম অবস্থানের মাঝপথে ট্রাম্প সমঝোতার কাঠামো তৈরি করতে চান। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো বাস্তব চুক্তি হয়নি।
আগামী দিনগুলোতে দেখা যাবে—পুতিন কতটা নতি স্বীকার করেন, ইউক্রেন কতটা ছাড় দিতে রাজি হয়, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেমন করে আন্তর্জাতিক চাপকে ভারসাম্যে আনে। এই বৈঠক যুদ্ধ থামানোর প্রথম ধাপ হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি এক নতুন কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সূচনা মাত্র।
মন্তব্য করুন