মো. আব্দুল বাছিত
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১:০৫ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহত হওয়া সাতজন বীর সন্তানের কথা

বাংলাদেশে সব ধরনের সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে কোটার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রচলিত ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। কোটা সংস্কারের দাবি অনেক পুরোনো। ১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রথম কোটা সংস্কারের কথা বলে। এরপর বিভিন্ন সময়ে কোটা সংস্কারের বিষয়ে কথা ওঠে। তবে ২০১৩ সালে এ আন্দোলন তীব্রভাবে শুরু হয়। এরপর ২০১৮ সালেও এ আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। এ আন্দোলনের পক্ষে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও নিরলসভাবে কাজ করেছে। কোটা সংস্কারের দাবির প্রেক্ষিতে আন্দোলনের শুরু থেকেই স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকার এবং তাদের অঙ্গ-সংগঠনের ছিল বিরুদ্ধে অবস্থান। এছাড়াও অনেক সুশীল সমাজ কোটা সংস্কারের দাবিতে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের এই আন্দোলন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করে। সারা দেশে বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতা ফেটে পড়ে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে যোগ দেয় লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী। অবশেষে প্রচণ্ড তোপের মুখে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। কোটা সংস্কারকে আন্দোলনের দাবি বাস্তবায়ন করতে অসংখ্য শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ এমনকি শিশুকেও জীবন দিতে হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কোটা সংস্কার আন্দোলনে এ পর্যন্ত ১৫৮১ জন মানুষ শাহাদাতবরণ করেন। কোটা সংস্কারের দাবিতে নিহত হওয়া এমনই সাতজন সাহসী বীর সন্তানকে নিয়ে আমাদের এই আয়োজন। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন বাংলা সংবাদের স্টাফ রিপোর্টার আব্দুল বাছিত।

 

আবু সাঈদ
কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহত হওয়া আবু সাঈদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি বিশ^বিদ্যালয়ের কোটা আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই তিনি পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তাঁর গ্রামের বাড়ি রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার মদনখালী ইউনিয়নের জাফরপাড়া বাবনপুর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম মকবুল হোসেন। নিহত আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে গুলি করার দৃশ্য দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হলে সারা দেশে আন্দোলন নতুন মাত্রা খোঁজে পায়। শুধু তাই নয়, এ আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চার করে আবু সাঈদের শাহাদাত। বুক উঁচু করে আবু সাঈদ যে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা এ দেশের লক্ষ লক্ষ ছাত্রজনতার অন্তরে আশার সৃষ্টি করে। তারা নতুন প্রাণে উজ্জীবিত হয়। এ উজ্জীবনী শক্তিই রাজপথের আন্দোলনকে নতুন মোড়ে ধাবিত করে। লক্ষ লক্ষ ছাত্রজনতার সাথে আপামর জনগণ মাঠে নেমে আসেন। ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত গণঅভ্যুত্থানে শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে গণভবন থেকে ভারতে পালিয়ে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শহীদ আবু সাঈদ ফ্যাসিবাদের রক্তস্রোতে দাঁড়িয়ে থাকা একটি নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। ছাত্র-জনতার রক্তে গড়া নতুন বাংলাদেশে শহীদ আবু সাঈদ অকুতোভয় ও নির্ভীক সৈনিক হয়ে বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

 

মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ
মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ছিলেন একজন শিক্ষার্থী। তিনি মুক্তপেশাজীবী বা ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি কখনো কোনো সংগঠন কিংবা কোনো আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে প্রতিমাসে আয় করতেন লক্ষ টাকা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় খাবার পানি এবং বিস্কুট বিতরণ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন তিনি। তাঁর মৃত্যু কোটা সংস্কার আন্দোলনের একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে আছে। মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবার নাম মীর মুস্তাফিজুর রহমান এবং মাতা শাহানা চৌধুরী। তাঁর গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। তিন ভাইয়ের মধ্যে মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ ও মুগ্ধ ছিলেন জমজ। তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস-এর (বিইউপি) এমবিএ’র শিক্ষার্থী ছিলেন। ফ্রিল্যান্সিংয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন ভালো ফুটবলার এবং স্কাউট সদস্য। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভ্রমণপিপাসু।

 

ফয়সাল আহমেদ শান্ত
ফয়সাল আহমেদ শান্ত ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের ২নং মুরাদপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তিনি ওমরগণি এম.ই.এস. কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের মহিষাদি গ্রামে। তাঁর পিতার নাম জাকির হোসেন এবং মাতা রেশমা আক্তার। ফয়সল আহমেদ শান্ত ২০০৪ সালের ২৩ মে জন্মগ্রহণ করেন। নিহত হওয়ার দিন গিয়েছিলেন টিউশনি করতে। মাকে বলেছিলেন, টিউশনি শেষ করেই বাসায় ফিরবেন। কিন্তু তিনি ফিরলেন লাশ হয়ে।

 

রেদোয়ান হাসান ওরফে সাগর
রেদোয়ান হাসান ওরফে সাগর ময়মনসিংহ নগরের আকুয়া চৌরঙ্গী মোড় এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী আসাদুজ্জামানের ছেলে। তার মা রহিমা খাতুন দীর্ঘ আট বছর ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত। রেদোয়ান ও আফিয়া তাবাসসুম দুই ভাই–বোনের মধ্যে রেদোয়ান বড় ছিলেন। তিনি ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক চতুর্থ বর্ষে ভর্তিচ্ছু ছিলেন। পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি ময়মনসিংহ নগরে এমএম কম্পিউটার নামে একটি প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন চাকুরি করতেন। হিসাববিজ্ঞানে পড়লেও তথ্যপ্রযুক্তিতে বেশ দক্ষ ছিলেন রেদোয়ান। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার নগরের মিন্টি কলেজ এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। পিতামাতার একমাত্র অবলম্বন ছিলেন রেদোয়ার হাসান ওরফে সাগর। ছেলের চলে যাওয়া তাদের চলার পথকেও যেন স্থবির ও নিস্তব্ধ করে দিয়েছে।

 

এটিএম তুরাব
কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নিহত হন দৈনিক নয়াদিগন্তের সিলেট প্রতিনিধি ও দৈনিক জালালাবাদের স্টাফ রিপোর্টার এটিএম তুরাব। তার গ্রামের বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায়। নিহত হওয়ার মাত্র দুই মাস আগে বিয়ে করেছিলেন এটিএম তুরাব। বিয়ের কিছুদিন পর দেশ ছেড়ে চলে যান তার যুক্তরাজ্য প্রবাসী স্ত্রী তানিয়া ইসলাম। কথা ছিল, তুরাবকেও সেখানে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করবেন তানিয়া, কিন্তু তা আর হলো না। তাঁর মাতা মমতাজ বেগম ছেলের নিহত হওয়ার খবরে বারবার মূর্ছা গিয়েছিলেন। এটিএম তুরাব মায়ের সাথে নগরীর যতরপুর এলাকায় থাকতেন।

 

মোস্তফা জামান ওরফে সমুদ্র
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে রাজধানীর রামপুরায় নিহত হন মোস্তফা জামান ওরফে সমুদ্র। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার মধ্যপাড়া এলাকায়। তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে রাজধানীর রামপুরা এলাকায় থাকতেন। এই বছর তিনি এসএসসি পরীক্ষায় ঢাকার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ব্যবসা শাখা থেকে জিপিএ-৪.৯৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। সমুদ্র মাকে বলেছেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে মাত্র দু মিনিটেই ফিরবে। কিন্তু সে যে আর কখনো মায়ের কাছে ফিরবে না, সেটাই বলে যেতে গিয়েছিল।

 

ফারহান ফাইয়াজ

বাংলাদেশের ছাত্রজনতার দাবি আদায় করতে গিয়ে ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে ধানমণ্ডিতে সংঘর্ষে নিহত হন রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির মেধাবী ছাত্র ফারহান ভূঁইয়া ফাইয়াজ। তিনি কলেজের এইচএসসি ২৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বরপা গ্রামে ফারহান ফাইয়াজের জন্ম। ১৮ বছর হওয়ার পূর্বেই তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান। মৃত্যুর সাথে সাথে তার বিজ্ঞানী হবার স্বপ্নটুকুও কবরস্থ হলো। তাঁর মৃত্যু নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ডেট্রয়েটে মা গ্রোসারী এন্ড সুপার মার্কেট–এর গ্র্যান্ড ওপেনিং, রমজান উপলক্ষে বিগ সেল

কারাগারে গণতন্ত্রের অংশগ্রহণ: শুরু হলো কারাবন্দীদের ভোটগ্রহণ

মিশিগানে সিলেট-৪ আসনের মনোনীত প্রার্থী আরিফুল হকের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত

এপস্টেইন ফাইল: কেন হঠাৎ বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে?

শেষ মুহূর্তে অর্থায়ন মিললেও আংশিকভাবে শাটডাউনে যুক্তরাষ্ট্র সরকার

যাত্রা শুরু করল ‘সারা ব্রাইডাল’, জমকালো আয়োজনে উদ্বোধন

যুক্তরাষ্ট্রে ঘরোয়া ফ্লাইটে রিয়েল আইডি বাধ্যতামূলক, ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর

যুক্তরাজ্যের চীন চুক্তিকে ‘বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত’ বললেন ট্রাম্প

পাকিস্তান ভ্রমণে মার্কিন নাগরিকদের জন্য নতুন নির্দেশনা জারি

জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি প্রেস হিসেবে যোগদান করলেন মেধাবী কর্মকর্তা মো: সালাহ উদ্দিন

১০

মার্কিন ভিসানীতিতে পরিবর্তন: সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ভারতীয়রা

১১

কমলগঞ্জে খেলাফত মজলিসের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী জনসভা – প্রধান অতিথি মাওলানা মামুনুল হক

১২

মুক্তহাতে দুঃসাহসিক আরোহণ, নতুন রেকর্ড গড়লেন অ্যালেক্স হনল্ড

১৩

কী এই ভিসা বন্ড পাইলট প্রোগ্রাম, কেন চালু হচ্ছে?

১৪

খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার নামে রাস্তার নামকরণ অনুমোদন ও পরবর্তীতে বাতিল এবং আমরা প্রবাসী বাংলাদেশিরা

১৫

সহনশীল পাড়া-মহল্লা: ডিপলি রুটেড গার্ডেনস কৃষ্ণাঙ্গ কৃষকদের জন্য বাধা কমাচ্ছে

১৬

বরফের চাদরে নিউইয়র্ক–মিশিগানসহ বহু অঙ্গরাজ্য, গৃহবন্দি কোটি মানুষ

১৭

নীরবে শরীর ধ্বংস করছে ডায়াবেটিস: লক্ষণ বুঝলেই বিপদ এড়ানো সম্ভব

১৮

শীতে বিপর্যয়: যুক্তরাষ্ট্রে তুষারঝড়ে ১১ জনের প্রাণহানি

১৯

নিলামে ইতিহাস: ৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় বিক্রি ডন ব্র্যাডম্যানের ব্যাগি গ্রিন

২০