কামাল হোসেন
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:৫২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

নিউইয়র্কে ভ্রমণকারীদের জন্য সেরা ১০টি গন্তব্য

বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহরগুলোর একটি, যেখানে প্রতিটি মোড়ে বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান এবং সবগুলো দেখার জন্য সময় কখনোই যথেষ্ট হয় না। কেউ এখানে আসেন ব্রডওয়ে শো উপভোগ করতে, কেউ বিশেষভাবে কেনাকাটার জন্য, আবার অনেকেই আসেন শুধু পর্যটন আকর্ষণগুলো দেখতে।

নিউইয়র্কের বেশিরভাগ দর্শনীয় স্থান একে অপরের হাঁটার দূরত্বের মধ্যেই অবস্থিত, অথবা সামান্য দূরে, যা এই শহরকে ভ্রমণের জন্য এক আনন্দদায়ক জায়গায় পরিণত করেছে। যদি আপনার হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকে এবং জলপথ ভ্রমণ পছন্দ করেন, তাহলে এনওয়াইসি ফেরি সিস্টেম ব্যবহার করে শহর ভ্রমণ করা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। বছরের যেকোনো সময়, দিন বা রাতের যেকোনো প্রহরেই, নিউইয়র্ক দেখার কোনো শেষ নেই।

 

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

আমেরিকার সবচেয়ে প্রতীকী দৃশ্য, স্ট্যাচু অব লিবার্টি, নিউইয়র্কে প্রথমবার আসা প্রতিটি ভ্রমণকারীর তালিকার শীর্ষে থাকে। এটি ছিল ফ্রান্সের পক্ষ থেকে আমেরিকার জন্য উপহার। ১৮৮৬ সালে নির্মিত এই ভাস্কর্য আজও স্বাধীনতার বিশ্ব প্রতীক এবং আমেরিকার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ভাস্কর্যগুলোর একটি, যার উচ্চতা বেস থেকে মশাল পর্যন্ত ১৫২ ফুট এবং ওজন প্রায় ৪৫০,০০০ পাউন্ড। স্থল থেকে এটি দেখা যায়, বিশেষ করে ম্যানহাটনের দক্ষিণ প্রান্তে ব্যাটারি পার্ক থেকে।

স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে সত্যিকার অর্থে উপভোগ করতে হলে একটি ছোট নৌকা ভ্রমণ করে লিবার্টি আইল্যান্ডে গিয়ে কাছ থেকে দেখা শ্রেয়। সেখানে হেঁটে ভাস্কর্যের চারপাশ ঘোরা যায়, আর যদি আগে থেকে বুকিং থাকে তাহলে ভেতরে প্রবেশ করা যায় পেডেস্টাল বা ক্রাউনে। ক্রাউন দর্শনের জন্য অনেক আগে থেকে বুকিং করতে হয়।

 

সেন্ট্রাল পার্ক

নিউইয়র্কের কংক্রিটের ভিড়ের মাঝে সবুজের এক আশ্রয়স্থল হলো সেন্ট্রাল পার্ক। এটি স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটক উভয়ের জন্যই শান্তি ও প্রশান্তির জায়গা। হাঁটা, সাইকেল চালানো বা ঘোড়ার গাড়িতে ঘুরে পার্কের পথগুলো ভ্রমণ যে কারও নিউইয়র্ক সিটির ভ্রমণ তালিকায় থাকা উচিত। শীতে এখানে উলম্যান রিঙ্কে স্কেটিং উপভোগ করা যায়। শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত এই বিশাল পার্ক অর্ধ মাইল চওড়া এবং আড়াই মাইল লম্বা।

পার্কে রয়েছে বহু আকর্ষণ। বছরজুড়েই এখানে নানা কার্যক্রম চলে, যেমন ৫ কিলোমিটার দৌড়, যোগব্যায়াম ক্লাস, কিংবা চিড়িয়াখানায় পেঙ্গুইনকে খাবার খাওয়ানো। গ্রীষ্মকালে পার্কের ডেলাকর্ট থিয়েটারে অনুষ্ঠিত “শেক্সপিয়ার ইন দ্য পার্ক” নাটক বিনামূল্যে উপভোগ করা যায়, যদিও টিকিট সংগ্রহ করতে হয়।

 

রকফেলার সেন্টার টপ অব দ্য রক অবজারভেশন ডেক

নিউইয়র্কের আকর্ষণের মধ্যে রকফেলার সেন্টার প্রায় প্রতিটি পর্যটকের ভ্রমণসূচিতে থাকে। ম্যানহাটনের মাঝখানে অবস্থিত এই বিশাল বিনোদন ও কেনাকাটার কমপ্লেক্সে রয়েছে এনবিসি টিভি এবং অন্যান্য মিডিয়ার কার্যালয়। এর প্রধান আকর্ষণ হলো ৭০ তলা আর্ট ডেকো স্টাইলের ৩০ রকফেলার প্লাজা। এখানকার “টপ অব দ্য রক অবজারভেশন ডেক” থেকে ম্যানহাটনের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়।

অবজারভেশন ডেকটি ৬৭তম, ৬৯তম এবং ৭০তম তলায় অবস্থিত। এখানে ইনডোর ও আউটডোর ভিউইং স্পেস রয়েছে, যা দিন-রাত উভয় সময়েই দৃষ্টিনন্দন।

শীতকালে ভবনের নিচের অংশে আউটডোর স্কেটিং রিঙ্ক খোলা থাকে, যা পরিবার ও যুগলদের জন্য জনপ্রিয়। এছাড়া থ্যাংকসগিভিংয়ের পর বিশাল ক্রিসমাস ট্রি স্থাপন করা হয়, যা ছুটির মৌসুমে আলোকিত করে পুরো এলাকা। এছাড়াও কাছেই রয়েছে বিখ্যাত ব্রোঞ্জের অ্যাটলাস ভাস্কর্য, যা ফটোগ্রাফারদের জন্য জনপ্রিয় একটি স্থান।

 

মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট

মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট, যা সাধারণত “দ্য মেট” নামে পরিচিত, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় মিউজিয়ামগুলোর একটি। এর সংগ্রহে রয়েছে ২০ লাখেরও বেশি শিল্পকর্ম, যা ৫,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের নানা সভ্যতার ইতিহাস উপস্থাপন করে। মিউজিয়ামের তিনটি শাখা রয়েছে, তবে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো মেট ফিফথ অ্যাভিনিউ। এখানে প্রাচীন মিশরীয় শিল্পকর্ম থেকে শুরু করে আমেরিকান সাজসজ্জা, অস্ত্রশস্ত্র, বাদ্যযন্ত্র, কস্টিউম এবং আধুনিক শিল্পকর্ম পর্যন্ত বিস্তৃত সংগ্রহ রয়েছে।

শুধু প্রদর্শনী নয়, মেট-এ প্রায়ই বিশেষ প্রদর্শনী, পারফরম্যান্স এবং সাংস্কৃতিক ইভেন্ট আয়োজন করা হয়, যা শিল্পপ্রেমীদের জন্য একটি অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

 

ব্রডওয়ে থিয়েটার জেলা

নিউইয়র্ক সিটিতে কোনো ভ্রমণ সম্পূর্ণ হয় না যদি আপনি একটি ব্রডওয়ে শো না দেখেন। ব্রডওয়ে হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মানের লাইভ থিয়েটার অভিজ্ঞতার কেন্দ্রবিন্দু। এখানে ক্লাসিক মিউজিক্যাল থেকে শুরু করে নতুন নাটক ও এক্সপেরিমেন্টাল শো পর্যন্ত নানা ধরনের প্রদর্শনী চলে। সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রযোজনাগুলো সাধারণত মাসের পর মাস আগে থেকেই সোল্ড-আউট হয়ে যায়, তাই অনলাইনে টিকিট বুকিং করাই ভালো।

থিয়েটার জেলা মূলত টাইমস স্কয়ারের আশেপাশে কেন্দ্রীভূত, যেখানে রঙিন আলোকসজ্জা, বিলবোর্ড আর মানুষের ভিড়ে রাত সবসময় জীবন্ত মনে হয়।

 

এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং

এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং নিউইয়র্কের আরেকটি প্রতীকী ল্যান্ডমার্ক। ১০২ তলা বিশিষ্ট এই ভবন ১৯৩১ সালে সম্পন্ন হয়েছিল এবং বহু বছর ধরে এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন। আজও এটি পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ। ৮৬তম তলার অবজারভেশন ডেক থেকে পুরো শহরের প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যায়। পরিষ্কার দিনে একসাথে পাঁচটি রাজ্য পর্যন্ত দেখা সম্ভব। রাতে শহরের আলো ঝলমল করা দৃশ্য এম্পায়ার স্টেটের অবজারভেটরি থেকে দেখলে আলাদা সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। এজন্যই অনেকেই দিনে একবার এবং রাতে আরেকবার এখানে যান।

 

/১১ মেমোরিয়াল মিউজিয়াম

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলায় যেসব মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে /১১ মেমোরিয়াল মিউজিয়াম। মেমোরিয়ালে রয়েছে দুটি বিশাল প্রতিফলন পুল, যা টুইন টাওয়ার যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেই জায়গায় তৈরি। প্রতিটি পুল ব্রোঞ্জ প্যানেলে ঘেরা, যেখানে নিহতদের নাম খোদাই করা আছে। পাশেই অবস্থিত মিউজিয়ামে সেই দিনের ঘটনার বিস্তারিত দলিল, ছবি, ভিডিও এবং ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত গল্প সংরক্ষিত আছে। এটি একদিকে হৃদয়বিদারক আবার অন্যদিকে সম্মান প্রদর্শনের জায়গা।

 

আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি

এই জাদুঘরটি পরিবারের জন্য বিশেষভাবে জনপ্রিয়। এখানে প্রকৃতি, বিজ্ঞান ও মহাবিশ্বের বিস্তৃত প্রদর্শনী রয়েছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো বিশালাকার ডাইনোসরের জীবাশ্ম, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির মডেল, এবং মানব বিবর্তন সম্পর্কিত প্রদর্শনী। এছাড়াও রয়েছে প্ল্যানেটারিয়াম, যা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের কাছেই আকর্ষণীয়। এখানে ভ্রমণ করলে পৃথিবী ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে এক শিক্ষামূলক এবং বিনোদনমূলক অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়।

 

হাই লাইন

হাই লাইন হলো নিউইয়র্ক সিটির একটি অনন্য পার্ক, যা আগে একটি রেললাইন ছিল। সেটিকে আধুনিক নগর উদ্যান হিসেবে রূপান্তরিত করা হয়েছে, যা শহরের রাস্তাগুলোর উপরে উঁচুতে তৈরি। এই সরু সবুজ উদ্যানটিতে নানা ধরনের গাছপালা ও ফুল রোপণ করা হয়েছে। কাচের রেলিং ঘেরা এই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে শহরের স্থাপত্য এবং আশেপাশের দৃশ্য ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়। হাই লাইন বরাবর রয়েছে বসার জায়গা, শিল্পকর্ম এবং দর্শনার্থীদের জন্য খোলা স্থান। সপ্তাহান্তে এখানে ভিড় বেশি হলেও এটি ব্যস্ত শহরের মধ্যে শান্তির একটি আলাদা ঠিকানা।

 

টাইমস স্কয়ার

টাইমস স্কয়ার নিউইয়র্ক সিটির প্রাণকেন্দ্র। বিশাল আলোকিত বিলবোর্ড, ঝলমলে পর্দা আর মানুষের ভিড় একে করেছে নিউইয়র্কের সবচেয়ে প্রাণবন্ত জায়গা। এখানেই প্রতিবছর নববর্ষের রাতে অনুষ্ঠিত হয় বিখ্যাত “বল ড্রপ” অনুষ্ঠান। সেই রাতে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করে এখানে নতুন বছরকে স্বাগত জানান। টাইমস স্কয়ার সব সময়ই ব্যস্ত, তবে সন্ধ্যায় এর আলোর ঝলকানিতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়। এখানকার ভাস্কর্য, রাস্তার পারফরম্যান্স এবং কাছাকাছি মিউজিয়ামগুলোও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

 

ব্রুকলিন ব্রিজ

ব্রুকলিন ব্রিজ নিউইয়র্কের সবচেয়ে ঐতিহাসিক ল্যান্ডমার্কগুলোর একটি। ১৮৮৩ সালে নির্মিত এই সেতুটি ছিল বিশ্বের প্রথম ইস্পাত ঝুলন্ত সেতু। ম্যানহাটন ও ব্রুকলিনকে সংযোগকারী এই সেতু দিয়ে হাঁটা বা সাইকেল চালানো পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ। কাঠের প্ল্যাঙ্কের তৈরি হাঁটার পথ থেকে ম্যানহাটনের স্কাইলাইন, ইস্ট রিভার ও স্ট্যাচু অব লিবার্টির অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। শিল্পী, কবি ও গায়কদের জন্য এই সেতু সবসময়ই অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ডেট্রয়েটে মা গ্রোসারী এন্ড সুপার মার্কেট–এর গ্র্যান্ড ওপেনিং, রমজান উপলক্ষে বিগ সেল

কারাগারে গণতন্ত্রের অংশগ্রহণ: শুরু হলো কারাবন্দীদের ভোটগ্রহণ

মিশিগানে সিলেট-৪ আসনের মনোনীত প্রার্থী আরিফুল হকের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত

এপস্টেইন ফাইল: কেন হঠাৎ বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে?

শেষ মুহূর্তে অর্থায়ন মিললেও আংশিকভাবে শাটডাউনে যুক্তরাষ্ট্র সরকার

যাত্রা শুরু করল ‘সারা ব্রাইডাল’, জমকালো আয়োজনে উদ্বোধন

যুক্তরাষ্ট্রে ঘরোয়া ফ্লাইটে রিয়েল আইডি বাধ্যতামূলক, ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর

যুক্তরাজ্যের চীন চুক্তিকে ‘বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত’ বললেন ট্রাম্প

পাকিস্তান ভ্রমণে মার্কিন নাগরিকদের জন্য নতুন নির্দেশনা জারি

জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি প্রেস হিসেবে যোগদান করলেন মেধাবী কর্মকর্তা মো: সালাহ উদ্দিন

১০

মার্কিন ভিসানীতিতে পরিবর্তন: সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ভারতীয়রা

১১

কমলগঞ্জে খেলাফত মজলিসের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী জনসভা – প্রধান অতিথি মাওলানা মামুনুল হক

১২

মুক্তহাতে দুঃসাহসিক আরোহণ, নতুন রেকর্ড গড়লেন অ্যালেক্স হনল্ড

১৩

কী এই ভিসা বন্ড পাইলট প্রোগ্রাম, কেন চালু হচ্ছে?

১৪

খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার নামে রাস্তার নামকরণ অনুমোদন ও পরবর্তীতে বাতিল এবং আমরা প্রবাসী বাংলাদেশিরা

১৫

সহনশীল পাড়া-মহল্লা: ডিপলি রুটেড গার্ডেনস কৃষ্ণাঙ্গ কৃষকদের জন্য বাধা কমাচ্ছে

১৬

বরফের চাদরে নিউইয়র্ক–মিশিগানসহ বহু অঙ্গরাজ্য, গৃহবন্দি কোটি মানুষ

১৭

নীরবে শরীর ধ্বংস করছে ডায়াবেটিস: লক্ষণ বুঝলেই বিপদ এড়ানো সম্ভব

১৮

শীতে বিপর্যয়: যুক্তরাষ্ট্রে তুষারঝড়ে ১১ জনের প্রাণহানি

১৯

নিলামে ইতিহাস: ৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় বিক্রি ডন ব্র্যাডম্যানের ব্যাগি গ্রিন

২০