
১৩ আগস্ট, খাদিমু রাসুল ফাউন্ডেশনের আঙিনা রঙিন এক দৃশ্যে ভরে ওঠে কাফতান পরা পুরুষ এবং ঝলমলে পোশাক ও উজ্জ্বল মাথার ওড়না পরা নারীদের সমাগমে। এটমাগাল তৌবা, সেনেগালের মরিদ মুসলমানদের জন্য শ্রদ্ধেয় সাধু ও নেতা আহমাদু বাম্বার জীবন ও শিক্ষাকে স্মরণ করে পালিত একটি উৎসব। এই দিনে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আগত বিপুল সংখ্যক উপাসক একত্রিত হয়ে উদযাপন করেন। পশ্চিম ডেট্রয়েটের উল্লেখযোগ্য ও ক্রমবর্ধমান সেনেগালিজ অভিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য স্থানীয় ধর্মীয় কমিউনিটিগুলো আধ্যাত্মিক স্থিরতা ও ব্যবহারিক সহায়তার উৎস।
সেনেগাল থেকে ডেট্রয়েট
কমপক্ষে ১৯৯০ এর দশক থেকে ডেট্রয়েট সেনেগালিজ অভিবাসীদের আবাসস্থল। লেখক ও শিক্ষাবিদ আবিব কুলিবালি যখন ২০১০-এর দশকের শুরুতে তার স্ত্রীসহ ডেট্রয়েটে আসেন, তখন তিনি এখানকার ঘরোয়া অনুভূতিতে আকৃষ্ট হন। “ডেট্রয়েটে আমার কিছু পরিচিতজন ছিল। এখানে এসে আমি নিরাপদ অনুভব করেছিলাম। আমি বলেছিলাম, ‘ওহ, এটা তো একটি সেনেগালিজ কমিউনিটি।’ আমি সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের মতো অনুভব করেছিলাম। এখানে অনেক সেনেগালিজ ছিল। এটা আমি আশা করিনি,” বলেন কুলিবালি।
এই ছোট কমিউনিটিটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আগত নতুন অভিবাসীদের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হয়েছে, যাদের সংখ্যা গত পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রাথমিক একটি দল ব্রাজিল হয়ে ডেট্রয়েটে আসে, যেখানে ক্রমশ বৈরী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে সেখানকার বৃহৎ সেনেগালিজ জনগোষ্ঠী ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে পায়ে হেঁটে, বাস ও ট্যাক্সিতে সাতটি দেশ অতিক্রম করে এবং পানামার বিপজ্জনক দারিয়েন গ্যাপ পেরিয়ে এই অভিবাসীদের ঢেউ কয়েক মাস ধরে যাত্রা করে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে পৌঁছায়, যা তারা ২০২০ সাল থেকে শুরু করে করতে থাকে। মহামাদু দিওপ ২০২১ সালে ডেট্রয়েটে আসেন। সেনেগালের কাওলাক থেকে আগত দিওপ যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে সাত বছর ব্রাজিলে বসবাস করেন। খাদিমু রাসুল মসজিদের ইমামের সঙ্গে যোগাযোগ তাকে ডেট্রয়েটে নিয়ে আসে।
“আমি যখন [যুক্তরাষ্ট্রে] আসি, তখন এখানে কাউকেই চিনতাম না। আমার একজন বন্ধু ছিল, যার বন্ধু [ইমাম] ডেট্রয়েটে থাকতেন। তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি যখন সেখানে পৌঁছাবে, তিনি তোমাকে সেখানে থাকতে দেবেন। তারা তোমার যা প্রয়োজন সবকিছুতেই সাহায্য করবে।’ এ কারণেই আমি [ডেট্রয়েটে] এসেছি,” বলেন দিওপ। শিগগিরই দারিয়েন গ্যাপ এড়াতে ইচ্ছুক অভিবাসীদের জন্য একটি নতুন পথ খুলে যায়। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আসা অনেক সেনেগালিজ সেনেগাল থেকে নিকারাগুয়ায় বিমানযোগে গিয়ে সেখান থেকে মধ্য আমেরিকা ও মেক্সিকো পেরিয়ে কম দূরত্বের পথ ধরে দক্ষিণ সীমান্তে পৌঁছান আদামা সো এনদিয়ায়ে তার যাত্রার কথা বলতে গিয়ে তিনটি বিমান,অসংখ্য ট্যাক্সি ও মোটরসাইকেল, এবং দীর্ঘ পথ হেঁটে চলার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন, যা তিনি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর আগে করেছিলেন। এখানে এসে তিনি তার মায়ের সঙ্গে যোগ দেন, যিনি আগেই ডেট্রয়েটে বসবাস করছিলেন।
ডেট্রয়েটকে গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে অনেকেই পরিবার ও কমিউনিটির সহায়তার কথা উল্লেখ করেন। কোরা এনদিয়ায়ে তার একটি উদাহরণ। তিনি বলেন, “আমি প্রথমে ২০২১ সালে নিউ ইয়র্ক সিটিতে এসেছিলাম।এরপর আমি ডেট্রয়েটে আসি, কারণ এটি নিরাপদ এবং কম ব্যস্ত। এখানে এসে আমি দেখেছি এখানে খুব ভালো মানুষ আছে, বিশেষ করে মুসলিম মানুষ—তারা একসঙ্গে থাকে এবং একে অপরকে সাহায্য করে। তারা আপনাকে সাহায্য করে। এখানে অনেক আফ্রিকান মানুষ আছে এবং অন্যান্য দেশ থেকেও মানুষ আছে। এ কারণেই আমি এখানে থেকেছি।যদিও নতুন অভিবাসীদের জন্য সীমান্ত বন্ধ রয়েছে এবং অভিবাসনসংক্রান্ত উদ্বেগ অনেক আশ্রয়প্রার্থীর অবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে,তবুও কর্মী সেইদি সার আশা করছেন যে স্বল্পমেয়াদে ডেট্রয়েটে পশ্চিম আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়বে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঞ্চলে থাকা সেনেগালিজরা ডেট্রয়েটের পথ খুঁজে নেবেন।
“এই মুহূর্তে আমরা আরও মানুষ আসতে দেখছি। সাত মাস বা এক বছর আগে যেমন সংকট ছিল, এখন তেমন মনে হচ্ছে না, কারণ এখানকার কমিউনিটি নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে এবং এখন অন্যদের সাহায্য করছে,” বলেন সার। তিনি ২০২৩ ও ২০২৪ সালের সেই সময়ের কথা উল্লেখ করেন, যখন ডেট্রয়েটে আসা বহু অভিবাসীর জন্য আবাসন ও সেবা দিতে স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্র ও সংস্থাগুলো হিমশিম খাচ্ছিল। “তারা এখন তাদের চাচাতো ভাইদেরও এখানে আসতে বলছে। ‘নিউ ইয়র্কে খুব খরচ বেশি। এখানে চলে এসো। আমি আমার বসের সঙ্গে কথা বলব, আমরা ব্যবস্থা করব। এখন আমরা আরও সাতজনের সঙ্গে থাকছি, কিন্তু তুমি কাজ শুরু করলে, তারপর আমি, তুমি আর অমুক-তমুক মিলে আলাদা হয়ে যেতে পারব।’ এখন তারা নেটওয়ার্কটা জানে, কীভাবে চলতে হয় জানে, কীভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে হয় জানে,” বলেন সার।
আধ্যাত্মিক ও সামাজিক সহায়তা
খাদিমু রাসুল ফাউন্ডেশন শহরের সেনেগাল থেকে আসা নতুন বাসিন্দাদের অনেকের জন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। স্কুলক্রাফট ও ওয়েস্ট আউটার ড্রাইভে অবস্থিত এটি পশ্চিম ডেট্রয়েটের একাধিক ইসলামিক সেন্টারের একটি, যা আফ্রিকান জনগোষ্ঠীকে সেবা দেয়। খাদিমু রাসুল ফাউন্ডেশন উত্তর আমেরিকা জুড়ে থাকা মরিদ কমিউনিটি সেন্টারগুলোর একটি নেটওয়ার্কের অংশ। সুফি তরিকার একাধিক শাখা যা ইসলামের এমন একটি ধারা যা ব্যক্তিগত ধর্মীয় ভক্তির ওপর জোর দেয়—ইসলাম পালনকারী অধিকাংশ সেনেগালিজদের মধ্যে প্রাধান্য পায়। মরিদবাদ এমনই একটি তরিকা, যা ১৮৮৩ সালে আহমাদু বাম্বা প্রতিষ্ঠা করেন, যিনি খাদিমু রাসুল বা নবীর খাদেম নামেও পরিচিত ছিলেন। এই তরিকার অনুসারীদের মরিদ বলা হয়, এবং তাদের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সারা দেশে এমন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা, যা ধর্মীয় শিক্ষা ও পারস্পরিক যত্নকে উৎসাহিত করতে পারে।
আবিব কুলিবালি খাদিমু রাসুল ফাউন্ডেশনের ভূমিকা বর্ণনা করে বলেন, “মরিদরা যে প্রতিটি বড় শহরে যায়, সেখানে তাদের একটি ভবন থাকে। আমাদের একটি মসজিদ, একটি সম্মেলন কক্ষ এবং একটি শ্রেণিকক্ষ আছে, যেখানে মানুষ ধর্ম শিখতে পারে। মানুষ যখন প্রথম আসে এবং থাকার জায়গা থাকে না, তখন আমরা তাদের স্বাগত জানাতে পারি। মাসে একটি দিন আমরা একত্রিত হয়ে একটি ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কোথা থেকে এসেছি, কেন আমরা এখানে আছি, এবং কেন আমাদের একে অপরকে কমিউনিটি হিসেবে সাহায্য করা উচিত। এ কারণেই মানুষ জানে কোথায় যেতে হবে। এটি এমন একটি জায়গা যা আমাদের একত্রিত করে। কখনও কখনও এটিই আমাদের অনেককে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে। আমরা আধ্যাত্মিক সহায়তা, আর্থিক সহায়তা এবং পরামর্শ পেতে পারি।” যদিও সম্পত্তিটি ২০১৪ সালে কেনা ও উৎসর্গ করা হয়েছিল, তবুও সদ্য আগত সেনেগালিজ অভিবাসীরা এই স্থানে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। যেখানে একসময় শুক্রবারের নামাজে উপস্থিতি কম ছিল, সেখানে এখন তা “ঠাসা ভিড়ে পূর্ণ,” বলেন সেইদি সার।কেন্দ্রটি সারা বছর খাদ্য বিতরণ করে এবং রমজান মাসে কমিউনিটির জন্য বিশেষ খাবারের আয়োজন করে। ২০২৩ সালে যখন স্থানীয় অভিবাসন সংস্থাগুলো নতুন আগতদের সংখ্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন খাদিমু রাসুল শহরের নেতাদের নিয়ে একটি টাউন হলের আয়োজন করে।
নেটওয়ার্কিং আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় কার্যক্রমের কাঠামোর বাইরেও সংযোগ তৈরি করে। খাদিমু রাসুলের দাতব্য কার্যক্রম ছাড়াও অনেক কমিউনিটি সদস্য জানান যে তারা একে অপরের কাছ থেকে পরিবহন, কর্মসংস্থান ও আবাসনের ক্ষেত্রে সহায়তা দেন ও গ্রহণ করেন। এই ব্যবহারিক সহায়তার পাশাপাশি, নতুন আগতরা অভিবাসনের কঠিন বাস্তবতা মোকাবিলায় আধ্যাত্মিক সম্পদের গুরুত্বের কথাও বলেন। তার ধর্ম কীভাবে তাকে সাহায্য করে এমন প্রশ্নে আদামা এনদিয়ায়ে থেমে গিয়ে তার সম্মুখীন হওয়া বহু চ্যালেঞ্জের কথা ভাবেন—সেনেগালের কষ্ট, মেক্সিকো হয়ে যাত্রাপথে আটক হওয়া, আইসের নজরদারি কর্মসূচি থেকে আসা উদ্বেগ, এবং কিছু ডেট্রয়েটবাসীর কাছ থেকে পাওয়া খারাপ আচরণ এই সবকিছুর মধ্যে তাকে টিকিয়ে রেখেছে কোরআনের একটি আয়াত, যার অর্থ তিনি ব্যাখ্যা করেন এভাবে—“আজ এমন কিছু খারাপ ঘটতে পারে না, যা আল্লাহর সিদ্ধান্ত নয়।” এনদিয়ায়ে বলেন,“আমার সঙ্গে যা কিছু ঘটেছে, আমি যা মোকাবিলা করেছি—যদি আপনি ধর্মের ওপর ভরসা করেন, তাহলে আপনি সেই পরিস্থিতিগুলোকে ভিন্নভাবে মোকাবিলা করবেন।”
ডেট্রয়েটের জন্য আনার মতো কিছু মূল্যবান
যদিও অনেক সেনেগালিজ খুব অল্প সময়ের জন্যই ডেট্রয়েটে আছেন, তবুও তাদের ধর্মীয় কমিউনিটির আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক সহায়তার ভিত্তি শহরের জীবনে তাদের ইতিবাচক অবদানকে শক্তিশালী করে। নতুন অভিবাসীদের অর্থনৈতিক অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই—তারা ওয়েল্ডার ও নির্মাণকর্মী হিসেবে, কারখানা, লন্ড্রোম্যাট, রেস্তোরাঁ এবং কমিউনিটি সেন্টারে কাজ করেন। অনেকেরই সেনেগাল থেকে অর্জিত সনদ বা কলেজ ডিগ্রি রয়েছে এবং তারা সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের চেষ্টা করছেন। অনেকেই একাধিক কাজ করেন। সেরিন বাসিরু লো ২০২২ সাল থেকে ডেট্রয়েটে বসবাস করছেন। তিনি শহরের সেনেগালিজদের দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে কর্মনিষ্ঠা ও সদয়তাকে উল্লেখ করেন। “মানুষ কখনও কখনও বলে, ‘সেনেগালিজ মানুষরা ভালো। তারা ভালো, এবং তারা কাজে ভালো,’” বলেন লো।
আদামা এনদিয়ায়ে একমত পোষণ করে যোগ করেন যে সেনেগালিজ সংস্কৃতি বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মানকে গুরুত্ব দেয়। তিনি লন্ড্রোম্যাটে এক প্রবীণ নাগরিকের জন্য ভারী কাপড়ের বোঝা তুলে দেওয়ার ঘটনা স্মরণ করেন। যা তার কাছে স্বাভাবিক ছিল, তা ওই নারীর জন্য বিস্ময়কর ছিল; তিনি বলেন, এটাই প্রথমবার কেউ তাকে এভাবে সাহায্য করল। কোরা এনদিয়ায়ে মানুষকে কীভাবে সাহায্য করেন—এই প্রশ্নে গর্বে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। তিনি অন্যদের জন্য রান্না করার ভালোবাসা, চাকরি স্বাস্থ্যসেবার খোঁজে বন্ধুদের জন্য যে অনুবাদ সহায়তা দেন, এবং ইংরেজি ক্লাসে নিবন্ধনের জন্য যাদের তিনি সাহায্য করেছেন—এসবের কথা বলেন।
কোরা তার সহ-সেনেগালিজদের উৎসাহ দেন যেন তারা বুঝতে পারে যে এই মুহূর্তে ডেট্রয়েটের জন্য তাদেরও দেওয়ার মতো কিছু মূল্যবান আছে। তিনি বলেন, “আমি মানুষকে সাহায্য করতে চাই বুঝতে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কী নিয়ে এসেছে।আমরা এখানে শুধু টাকা খুঁজতে আসিনি। আমাদের দেওয়ার সবচেয়ে ভালো জিনিস হলো আমাদের নিজের অভিজ্ঞতা, কারণ আমরা এখন এখানে বাস করছি। আমরা মানুষকে একটি ভালো ও নিরাপদ জায়গা খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারি।”
Resilient Neighborhoods is a reporting and engagement series that examines how Detroit residents and community development organizations are working together to strengthen local neighborhoods. This story was originally produced and published by Model D Media and is reprinted in New Michigan Media newspapers through a partnership supported by the Kresge Foundation.
মন্তব্য করুন