মিশিগান রাজ্যের বিভিন্ন শহরে বসবাসরত বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের একটি অংশ ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। চুরি, ছিনতাই, দোকানভাঙা, গাড়ি সংক্রান্ত অপরাধসহ নিত্যদিনের নানা অপরাধের ঘটনা বিশেষ করে “বাংলা টাউন” হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে কমিউনিটির মানুষের মনে অস্বস্তি ও আতঙ্ক তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় সভা ও কমিউনিটি আলোচনায় বিষয়টি ক্রমেই বেশি করে উঠে আসছে।
মিশিগানের বৃহত্তম শহর ডেট্রয়েটকে দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা ইস্যুর আলোচনায় রাখা হয়। তবে সাম্প্রতিক পুলিশ ও সরকারি পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন চিত্র। প্রাথমিক ডিজিটাল ডেটা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডেট্রয়েটে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা নেমে এসেছে ১৬৫ুএ, যা আগের বছরের তুলনায় কম এবং সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিপজ্জনক গুলিবর্ষণ এবং কারজ্যাকিংয়ের ঘটনাও কমেছে বলে জানানো হয়েছে। ডেট্রয়েট পুলিশ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী গাড়ি চুরি, যৌন সহিংসতা ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধও ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে নিম্নমুখী।
কিন্তু পরিসংখ্যানের এই ইতিবাচক চিত্রের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার মিল পাচ্ছেন না অনেক বাংলাদেশি বাসিন্দা। তাঁদের দাবি, বড় ধরনের সহিংস অপরাধ কমলেও প্রতিদিনের ছোটখাটো অপরাধ—বিশেষ করে চুরি, ছিনতাই, দোকান টার্গেট করা—তাদের দৈনন্দিন জীবনে স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। রাতের বেলায় অপর্যাপ্ত রাস্তার আলো, দুর্বল টহলদারি এবং ধীর প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পুলিশ বলছে সামগ্রিক অপরাধের হার কমছে এবং তারা মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছে। তবে কমিউনিটি নেতাদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের ভাষায়, “হিংসাত্মক অপরাধের গ্রাফ নিচে নামলেও মানুষের মনে ভয় কমেনি। প্রতিদিনের ছোট ছোট ঘটনা আমাদের মানসিক নিরাপত্তাকে নষ্ট করছে।” স্থানীয় অভিজ্ঞতার বর্ণনা এই উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করে। এক তরুণ বাসিন্দা বলেন, “রাতে রাস্তার পাশে সন্দেহজনকভাবে লোকজন ঘোরাফেরা করে। টহল খুব কম দেখা যায়। দোকানেও মাঝেমধ্যে চুরি হয়। ভয়টা মাথা থেকে সরাতে পারি না।” ব্যবসায়ী আনোয়ার জানান, “আমার দোকানে আগুন লাগানোর চেষ্টা হয়েছিল। পুলিশ আসার আগেই আমরা নিজেরা পরিস্থিতি সামলাই। রিপোর্টে অপরাধ কমছে বলা হলেও আমরা বাস্তবে তা অনুভব করি না।” এক হাউজিং কমিউনিটির সদস্য বলেন, “আমার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে ছিনতাইয়ের চেষ্টার মুখে পড়ে। অভিযোগ করেছি, কিন্তু আতঙ্ক এখনও কাটেনি।”
কমিউনিটি সংগঠকদের মতে, “মানুষের মনে ভয় ঢুকে গেলে সেটাও সামাজিক সংকটের অংশ হয়ে যায়।” তারা পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়, রাতের টহল বাড়ানো, সিসিটিভি নেটওয়ার্ক জোরদার করা এবং নিরাপত্তা সচেতনতা কর্মসূচি সম্প্রসারণের দাবি জানিয়েছেন। ব্যবসায়িক এলাকাগুলোর নিরাপত্তা বিশেষভাবে জোরদার করারও আহ্বান জানানো হয়েছে। কিছু সামাজিক সংগঠন ইতোমধ্যে সচেতনতামূলক সভা, নিরাপত্তা নির্দেশিকা বিতরণ এবং পুলিশ-কমিউনিটি সম্পর্ক উন্নয়নে কর্মশালা চালু করেছে। তবু সাধারণ মানুষের অনুভূতি বলছে- সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি দ্বৈত বাস্তবতা: পরিসংখ্যান উন্নতির ইঙ্গিত দিলেও মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা নিরাপত্তাহীনতার গল্প বলছে। আর নিরাপত্তা কেবল সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না—এটি মানুষের মানসিক নিশ্চয়তা, সামাজিক আস্থা এবং চলাফেরার স্বস্তির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অপরাধের গ্রাফ নামলেও বাংলাদেশি কমিউনিটির আতঙ্ক এখনও বিদ্যমান। স্থানীয় লোকজনের চাওয়া নিরাপত্তার দ্রুত উন্নতি।
মন্তব্য করুন