
খুব ভোরে বিছানায় শুয়ে যখন মিশু ভাইয়ের মৃত্যুর খবর জানলাম, তখন মনে হলো, হায় হায়, রকস্টার্টা ব্যান্ডের ক্যাসেটটা তো ফেরত দেয়া হলো না! মানুষের মন বড় অদ্ভুত, সেই ৯২ সালে ধার নেয়া রক ব্যান্ডের ক্যাসেটের স্মৃতির সাথেও সে প্রিয় মানুষদের গেঁথে ফেলে। আমাদের রকগান শোনা শেখা মিশু ভাইদের কাছ থেকে।
এই মিশু ভাইয়ের কথাই না হয় বলি। তারুণ্যে কী যে হ্যান্ডসাম একজন মানুষ ছিলেন! শখের মডেলিং করেছেন সেই সময়ের খ্যাতিমান মডেল মৌ-এর সাথে জুটি বেধে শখের মডেলিংও করেছেন কয়েকটা। সালমান শাহ-নাঈমদের যুগ তখন, নতুন মুখের জোয়ারে মিশু ভাইয়েরও সিনেমার নায়ক হওয়ার অফার ছিল, কিন্তু সিলেটের কুলীন পরিবারের কারো কি আর তখন সুযোগ আছে পরিবারের অনুমতি পাওয়ার! সিনেমার নায়ক না হলেও তিনি ছিলেন, আমাদের ছোট শহরের নায়ক। ব্যান্ডের জোয়ারের কালে, ব্যান্ড বানিয়ে ক্যাসেট প্রকাশ করে ফেললেন! তাঁর মডেল বন্ধু মৌ, সুইটি, ফয়সাল, নোবেলদের নিয়ে এসে সিলেট শহরে ফ্যাশন শো করিয়ে চমক দিয়ে ফেললেন!
ছিলেন আপাদমস্তক রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক কর্মী। সেই উত্তাল সময়ের জাসদ ছাত্রলীগ করা মানুষ, কতজন কতদিকে চলে গেল, কিন্তু মিশু ভাই আমৃত্যু জাসদ, আমৃত্যু বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, আমৃত্যু মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়ে চলা মানুষ। ছিলেন নাটকের লোক। লিটল থিয়েটার সিলেটের একনিষ্ঠ কর্মী। রাজাকারের বিরুদ্ধে গ্রামেগঞ্জে অজস্র পথনাটক করে বেড়ানো তরুণ।
আমেরিকার নাগরিকত্ব নিতে কয়েক বছর নিউইয়র্কে ছিলেন। কিন্তু নিউইয়র্কের মাটিতে তিনি সিলেটকে পাননি। তাই সেই যে ফিরে এলেন ২৫ বছর আগে, আর কখনো থিতু গাড়েননি সিলেটের বাইরে। আজীবন সিলেটেই রয়ে গেলেন। থাকলেন সিলেট ক্লাবে, সম্মিলিত নাট্য পরিষদের নেতৃত্বে, নিজেদের থিয়েটার ঘরে। এম.সি. কলেজের দুপাশ জুড়ে করলেন শতবৃক্ষের বনায়ন, একদিন এই গাছগুলো বড় হয়ে কৃষ্ণচুড়া, রাধাচুড়ার ফুলে ফুলে ছেয়ে দেবে পাহাড়ি পথটা। কোভিডের সময় ‘কলের গাড়ি’ বানিয়ে কী অক্লান্ত পরিশ্রমে ত্রাণ পৌঁছে দিলেন ঘরে ঘরে।
পেশায় সফল ব্যবসায়ী ছিলেন, কিন্তু নেশায় ছিলেন এই নগরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম সিপাহসালার। উনার শেষ টাইমলাইন দেখলাম, মৃত্যুর আগেরদিনও কতগুলো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে হাজির ছিলেন তিনি।
বছরে দু’বছরে সিলেটে যাই, নিজের শহরে নিজেই আগন্তুক। বড় বড় দালান কোঠা, অলিতে গলিতে অপরিচিত মুখ- আমি প্রাণপনে আমার শহরটাকে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজি, শহরটাকে পাই না। সেই প্রান্তিক নেই, সেই এম.সি কলেজ নেই, সেই রাতভর জিন্দাবাজারের আড্ডা নেই। তবু ভাবি, যদি কোথাও কিছু থাকে।
শহর খোলস পাল্টায়, তবু শহরে কিছু মায়াময় মানুষ এখনও থাকেন। তাঁদের কাছে গেলে এখনও জীবনের ঘ্রাণ পাই। ১৬ই ডিসেম্বর সিলেটের শহীদ মিনারের চত্ত্বরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, প্রিয় মানুষদের সাথে দেখা হয়ে যায়।
নাটকের দলগুলো একের পর এক নাটক করছে, নাচের দল নিবেদন করছে তাঁদের সৃষ্টি, আবৃত্তি করছে কোনো অচেনা তরুণ- কিন্তু এই পুরো আয়োজন জুড়ে আছেন আমাদের আশির দশকের প্রাণবন্ত তরুণরা, যারা এখনও আগলে রেখেছেন ঢাকার বাইরের সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এরাই মিশু ভাইদের জেনারেশন।
শহর মানে আমাদের কাছে দালানের সারি নয়, নতুন চকচকে বাতি জ্বালানো রাস্তা নয়, মাতৃশহর আমাদের কাছে ভাই, বোন, পরিবার।
আমাদের পরিবার ক্রমাগত ছোট হয়ে আসছে। আমরা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছি, হারিয়ে যাচ্ছি।
মন্তব্য করুন