ফরহাদ আহমদ
৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:০৬ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ছিল গভীর সামাজিক সংকটে নিমজ্জিত। প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চনা, আলাদা স্কুল-বাস-বাসস্থান সব মিলিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী ছিল চরম বৈষম্যের শিকার। সেই অন্ধকার সময়ের এক আলোকিত মানুষ মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। একটি নাম, একটি আদর্শ, একটি যুগের নৈতিক বিবেক। তিনি নাগরিক অধিকার আন্দোলনকে এক নতুন দিশা দেন। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম শুধু আমেরিকার ইতিহাসেই নয়, বিশ্ব মানবাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও অনন্য অধ্যায়।

 

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের জন্ম ১৯২৯ সালের ১৫ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টা শহরে। তাঁর জন্মনাম ছিল মাইকেল কিং জুনিয়র; পরবর্তীতে তাঁর পিতা জার্মান ধর্মসংস্কারক মার্টিন লুথারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজের ও পুত্রের নাম পরিবর্তন করেন। তাঁর পিতা মার্টিন লুথার কিং সিনিয়র ছিলেন একজন প্রভাবশালী ব্যাপ্টিস্ট পাদ্রি এবং মাতা আলবার্টা উইলিয়ামস কিং ছিলেন চার্চের সংগীত পরিচালক। ধর্মীয় অনুশাসন, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিবেশেই কিং-এর শৈশব কাটে।

 

তবে এই সুরক্ষিত পারিবারিক পরিমণ্ডলের বাইরে তিনি খুব অল্প বয়সেই বৈষম্যের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন। স্কুল, বাস, রেস্তোরাঁ, পানির কল- সবখানেই কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা ছিল। বন্ধুর সঙ্গে খেলতে না পারা, অসম্মানজনক আচরণ এই অভিজ্ঞতাগুলোই তাঁর মনে ন্যায় ও সমতার প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে- মানুষ কেন মানুষের সমান নয়?
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি মোরহাউস কলেজে ভর্তি হন। এরপর ক্রোজার থিওলজিক্যাল সেমিনারি থেকে ধর্মতত্ত্বে ডিগ্রি এবং বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি অর্জন করেন। এই শিক্ষাজীবনেই তাঁর চিন্তাজগৎকে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করে। তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন- মহাত্মা গান্ধীর অহিংস প্রতিরোধ দর্শন, হেনরি ডেভিড থোরোর অসহযোগ তত্ত্ব, খ্রিস্টীয় ভালোবাসা, ক্ষমা ও আত্মত্যাগের আদর্শে। এই তিন ধারার সমন্বয়েই গড়ে ওঠে তাঁর অহিংস আন্দোলনের দার্শনিক ভিত্তি।

 

১৯৫৪ সালে কিং আলাবামার মন্টগোমারিতে ডেক্সটার অ্যাভিনিউ ব্যাপ্টিস্ট চার্চের পাদ্রি হিসেবে দায়িত্ব নেন। ঠিক এক বছর পর, ১৯৫৫ সালের ১ ডিসেম্বর, রোজা পার্কস বাসে শ্বেতাঙ্গের জন্য নির্ধারিত আসন ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে শুরু হয় মন্টগোমারি বাস বয়কট। মাত্র ২৬ বছর বয়সী মার্টিন লুথার কিং এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। প্রায় ৩৮১ দিনব্যাপী অহিংস বয়কটের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বাসে বর্ণভিত্তিক বৈষম্যকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। এই আন্দোলনই কিং-কে জাতীয় পর্যায়ে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের প্রধান মুখপাত্রে পরিণত করে।

 

১৯৬০-এর দশকে তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত হয় একাধিক ঐতিহাসিক আন্দোলন। বার্মিংহাম ক্যাম্পেইন, সেলমা থেকে মন্টগোমারি পদযাত্রা, মার্চ অন ওয়াশিংটন ফর জবস এন্ড ফ্রিডম এই কর্মসূচিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বার্মিংহামে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগার থেকে লেখা “লেটার ফ্রম বার্মিংহাম জেল” আজও রাজনৈতিক ও নৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এতে তিনি ব্যাখ্যা করেন কেন অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে সরাসরি কর্মসূচি নৈতিকভাবে অপরিহার্য।

 

১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত মার্চ অন ওয়াশিংটন ফর জবস এন্ড ফ্রিডম কর্মসূচিতে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের প্রদত্ত “আই হ্যাভ আ্যা ড্রিম” ভাষণটি নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। প্রায় আড়াই লাখ মানুষের সামনে দেওয়া এই ভাষণ বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অহিংস সংগ্রামের শক্তিশালী নৈতিক ঘোষণা হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। লিঙ্কন মেমোরিয়ালের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কিং এমন এক আমেরিকার স্বপ্ন তুলে ধরেন, যেখানে মানুষ ত্বকের রঙে নয়, চরিত্রের গুণে বিচারিত হবে। ভাষণে তিনি স্বাধীনতা, সমতা ও মানবিক মর্যাদার কথা বলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও স্বাধীনতার ঘোষণাকে ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার হিসেবে স্মরণ করান। এই ভাষণটি ছিল নিপীড়িত মানুষের আশা, ক্ষোভ ও স্বপ্নের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর। এই ভাষণ নাগরিক অধিকার আন্দোলনকে নতুন গতি দেয় এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে আজও বিবেচিত হয়।

 

নাগরিক অধিকার আন্দোলনের চাপেই যুক্তরাষ্ট্রে পাস হয়- সিভিল রাইটস অ্যাক্ট ১৯৬৪, ভোটিং রাইটস অ্যাক্ট ১৯৬৫। এই দুটি আইন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্ণবৈষম্য ও ভোটাধিকার হরণের অবসান ঘটায়। দারিদ্র, শ্রমিক অধিকার ও যুদ্ধবিরোধিতায় তিনি সোচ্চার কন্ঠস্বর। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও নৈতিক সাহসের এক ধারাবাহিক ইতিহাস। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র জীবনের শেষ দিকে দারিদ্র দূরীকরণ, শ্রমিক অধিকার এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। তিনি বিশ্বাস করতেন-অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ছাড়া প্রকৃত স্বাধীনতা অসম্ভব। এই অবস্থানের কারণে প্রতিনিয়ত তিনি সরকারের নজরদারি, এফবিআই-এর হয়রানি ও রাজনৈতিক বিরোধিতার শিকার হন। অহিংস আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে কিং বহুবার গ্রেপ্তার হন, নির্যাতিত হন এবং হত্যার হুমকি পান। তবু তিনি বিশ্বাস করতেন- ঘৃণার মোকাবিলা ঘৃণা দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়েই করতে হয়। তাঁর ভাষায়, “অন্ধকার কখনো অন্ধকার দূর করতে পারে না; কেবল আলোই তা পারে।”

 

১৯৬৪ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। তিনি এই পুরস্কার গ্রহণ করেন ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে নয়, বরং অহিংসতার মাধ্যমে মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে। ১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল- এই দিনটি শুধু আমেরিকার ইতিহাসেই নয়, বিশ্ব মানবাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসেও এক শোকাবহ দিন। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত, অহিংসতার প্রতীক মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে এই দিন আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যু ছিল কেবল একজন মানুষের পতন নয়; এটি ছিল ন্যায়, সমতা ও মানবিক বিবেকের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক নির্মম প্রচেষ্টা।

 

সে সময় কিং অবস্থান করছিলেন টেনেসি অঙ্গরাজ্যের মেমফিস শহরে। সেখানে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ স্যানিটেশন শ্রমিকদের চলমান ধর্মঘটের প্রতি সংহতি জানাতে গিয়েছিলেন। এই শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মানবিক মর্যাদার দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায়, মেমফিসের লোরেন মোটেলের দ্বিতীয় তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। ঠিক তখনই একটি রাইফেলের গুলি তাঁর মাথা ও ঘাড়ে আঘাত করে। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। বয়স তখন মাত্র ৩৯ বছর! তাঁর আত্মত্যাগ নাগরিক অধিকার আন্দোলনকে আরও দৃঢ় করে তোলে। মৃত্যুর পরপরই মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের প্রতি সম্মান জানাতে তাঁর জন্মদিনকে জাতীয় ছুটি ঘোষণার দাবি ওঠে।

 

১৯৭০ সালের শুরুতে, বেশ কয়েকটি রাজ্য এবং শহর তাঁর জন্মদিন ১৫ জানুয়ারিকে ছুটির দিন ঘোষণা করে। যদিও ১৯৬৮ সালের প্রথম দিকে কংগ্রেসে ফেডারেল ছুটির জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল, জাতিগত এবং রাজনৈতিক কারণে যথেষ্ট বিরোধিতা ছিল, যা এটি পাস করতে বাধা দেয়। অবশেষে ১৯৮৩ সালে, জানুয়ারির তৃতীয় সোমবারকে ফেডারেল ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করার আইনটি পাস হয় এবং ১৯৮৬ সালে দেশব্যাপী প্রথম পালন করা হয়।

 

এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সোমবার ফেডারেল ছুটির দিন তথা “মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ডে” হিসেবে পালিত হয়। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ছিলেন ন্যায়, সমতা ও মানবিক মর্যাদার এক চিরন্তন প্রতীক। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখিয়ে তিনি ইতিহাসকে শুধু প্রশ্ন করেননি- দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন। বর্ণবাদ, বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যে কোনো সংগ্রামে তাঁর জীবন ও দর্শন এক অনিবার্য অনুপ্রেরণা। বিশ্বজুড়ে তিনি আজও অহিংসতা, ন্যায় ও মানব মর্যাদার এক চিরন্তন প্রতীক

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জীবন রক্ষাকারী স্টেথোস্কোপ আবিষ্কারের কাহিনি

যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাত পরিবেশের শোষণ প্রতিরোধ

প্রথমবারের মতো উদ্ভিদের শ্বাসপ্রশ্বাস প্রক্রিয়া চোখে দেখলো মানুষ

পাখির ভোজ উৎসব দেখে বিজ্ঞানীদের স্বস্তি

৫৪ বছর পর চাঁদে মানুষ পাঠাচ্ছে নাসা

মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শান্তির আদর্শ বাস্তবায়নে প্রয়োজন নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও সুশাসন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় নির্বাচন হোক অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ

মার্চে নিউইয়র্ক অলবানি রুটে পূর্ণ ট্রেন সেবা ফিরছে

সাউথ এশিয়ান কালচারাল সেন্টার জমকালো আয়োজনে দুই বছর পূর্তি উদযাপন

বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন (বাপা) সভাপতি প্রিন্স আলম, সাধারণ সম্পাদক জনি

১০

দুর্নীতির দায়ে দুই দেশের নেতাকে লক্ষ্য করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

১১

নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশে অপতথ্যের বিস্তার, অধিকাংশই ভারত থেকে

১২

মিশিগানের ডেট্রয়েটে বাংলাদেশি কনসুলেট স্থাপনে মার্কিন অনুমোদনের অপেক্ষায়

১৩

এপস্টেইন নথিতে প্রভাবশালী যত ব্যক্তি

১৪

ইরান সংকট: মুক্তি বনাম মালিকানা বদলের অন্তহীন ফাঁদ

১৫

চাঁদে মানব শহর গড়তে ১০ বছরের টাইমলাইন দিলেন ইলন মাস্ক

১৬

নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র

১৭

নির্বাচন ছাড়াই যাঁরা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন

১৮

কানাডার সব পণ্যে ১০০% শুল্ক আরোপের হুমকি ট্রাম্পের

১৯

অভিবাসীদের আতঙ্কের নাম এখন গ্রেগরি বোভিনো

২০