মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের সীমান্ত ছোঁয়া গ্রাম ডোমাবাড়ি। চারদিকে সবুজের বিস্তার, মাঝখানে একখণ্ড জমি আর সেখানেই যেন রচিত হচ্ছে এক নতুন গল্প। গল্পটি শুধু একটি ফসলের নয়, বরং স্বপ্ন, সাহস আর সম্ভাবনার। এই গল্পের নায়ক তরুণ উদ্যোক্তা খোর্শেদ আলম।
যেখানে তার সমবয়সী অনেক তরুণ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার খোঁজে বিদেশমুখী, সেখানে খোর্শেদ আলম বেছে নিয়েছেন নিজের মাটিকে। ভেবেছেন ভিন্নভাবে, দেখেছেন নতুন স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের রঙই আজ ছড়িয়ে পড়েছে তার জমিতে উজ্জ্বল হলুদ তরমুজের রূপে। গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের কচুরগুল ব্লকে ৩৩ শতক জমিতে ‘ল্যানফাই’ জাতের হলুদ তরমুজ চাষ করে তিনি এখন আলোচনার কেন্দ্রে। ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর বপন করা বীজগুলো আজ শুধু ফল নয়, আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় তার এই উদ্যোগ পেয়েছে সফলতার ছোঁয়া।
ক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে খোর্শেদ আলমের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের দৃঢ়তা- “আমাদের জুড়ীর অনেক জমি এখনো ফাঁকা পড়ে আছে। আমি চাই এই জমিগুলো কাজে লাগুক। আমরা যেন শুধু বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন না দেখি, নিজের দেশেই কিছু করার সাহস পাই। কৃষিই পারে বেকারত্ব দূর করতে।”
তার এই কথাগুলো শুধুই ব্যক্তিগত ভাবনা নয়, বরং এক প্রজন্মের জন্য দিকনির্দেশনা। কারণ, হলুদ তরমুজ এখন শুধু একটি নতুন ফসল নয় বরং এটি হয়ে উঠছে সম্ভাবনার প্রতীক। মাত্র ৬০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যেই ফলন, কম খরচে বেশি লাভ, সব মিলিয়ে এটি কৃষকদের কাছে দ্রুত আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, জুড়ী অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া এই ফসলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সঠিক পরিচর্যা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এখানকার কৃষিতে নতুন বিপ্লব সম্ভব। আর সেই সম্ভাবনার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছেন খোর্শেদ আলম।
হলুদ তরমুজের আরেকটি বড় দিক হলো এর পুষ্টিগুণ। ভিটামিন এ, সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর এই ফল ইতোমধ্যেই ভোক্তাদের মন জয় করেছে। ফলে বাজারেও এর চাহিদা বাড়ছে দিন দিন, যা কৃষকদের জন্য আরও আশাব্যঞ্জক।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি দেখা যাচ্ছে তরুণদের মাঝে। খোর্শেদ আলমের সাফল্য দেখে অনেকেই এখন নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। যারা আগে বেকার সময় কাটাতেন, তারাও এখন মাঠে নামার স্বপ্ন দেখছেন, নিজেদের উদ্যোগে কিছু করার স্বপ্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগকে যদি আরও বিস্তৃত করা যায়, তবে শুধু জুড়ী নয়, পুরো সিলেট অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির নতুন জোয়ার বইতে পারে। শেষে খোর্শেদ আলম যেন এক সহজ সত্য তুলে ধরেন- সফলতা অনেক দূরের কিছু নয়। এটি আমাদের মাটিতেই লুকিয়ে আছে। দরকার শুধু সাহস আর পরিশ্রম।
তার এই কথায় যেন প্রতিধ্বনিত হয় এক নতুন বার্তা- আজকের তরুণরা যদি কৃষিকে নতুনভাবে ভাবতে শেখে, প্রযুক্তিকে কাজে লাগায় এবং উদ্যোগী হয়ে ওঠে, তবে কৃষিই হতে পারে তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনের পথ। খোর্শেদ আলমের মতে- স্বপ্ন পূরণের জন্য বিদেশে যেতে হয় না, নিজের মাটিতেই গড়া যায় সফলতার সোনালী ভবিষ্যৎ।
মন্তব্য করুন