আব্দুল আজাদ চৌধুরী
৩১ মার্চ ২০২৬, ৫:০৪ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

কর্নেল ওসমানী যেভাবে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হয়ে উঠলেন

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাত বাঙালির ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু হলে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সমগ্র জাতি। ব্যর্থ হয়ে যায় রাজনৈতিক সমঝোতার সব পথ, শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।

 

প্রথম দিকে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে বাঙালি সেনা, ইপিআর ও সাধারণ মানুষ বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও দ্রুতই উপলব্ধি হয় এই যুদ্ধকে সফল করতে হলে প্রয়োজন সংগঠিত নেতৃত্ব ও সমন্বিত কৌশল। সেই প্রয়োজন থেকেই আবির্ভাব ঘটে এক অভিজ্ঞ সামরিক নেতার- কর্নেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর। ১৯১৮ সালে সুনামগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এমএজি ওসমানী। পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বাবার চাকরির সুবাদে আসাম ও সিলেটের বিভিন্ন স্থানে তাঁর শৈশব কাটে।

 

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ভর্তি হন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়-এ এবং ১৯৩৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ভারতীয় সিভিল সার্ভিস ও সামরিক বাহিনীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হিসেবে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই মেধা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা ফ্রন্টে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৫৬ সালে কর্নেল পদে উন্নীত হয়ে সামরিক অপারেশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন।

 

তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হন ওসমানীও। যথাযথ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও উচ্চপদে উন্নীত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন তিনি। অবশেষে ১৯৬৭ সালে কর্নেল পদে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পর তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এ এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করেও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে না দেওয়ায় দেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।

 

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলে দেশজুড়ে গণআন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। এই সময় ওসমানী গোপনে বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। ২২শে মার্চ ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের এক সমাবেশ আয়োজনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সেখানে প্রয়োজনে দেশের জন্য অস্ত্র হাতে লড়াইয়ের শপথ নেন সাবেক সেনারা। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সশস্ত্র সংগ্রামের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হয়।

 

২৫শে মার্চের গণহত্যার পর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ। কিন্তু এই বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে ৪ঠা এপ্রিল হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে এক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে অংশ নেন তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তারা-যাদের মধ্যে ছিলেন জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ এবং কেএম সফিউল্লাহসহ অনেকে। সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়-মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দেবেন কর্নেল এমএজি ওসমানী।

 

এই বৈঠকেই গৃহীত হয় ঐতিহাসিক ‘তেলিয়াপাড়া রণকৌশল’। দেশকে কয়েকটি সামরিক সেক্টরে ভাগ করে যুদ্ধ পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে ১১টি সেক্টরে বিস্তৃত হয়। ১০ই এপ্রিল গঠিত হয় প্রবাসী মুজিবনগর সরকার। ১৭ই এপ্রিল শপথ গ্রহণের পর এই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কর্নেল ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়।
তাঁর নেতৃত্বের পেছনে ছিল দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ, বাঙালি সেনাদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার অবস্থান।
প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর ওসমানী মুক্তিবাহিনীকে দুই ভাগে বিভক্ত করেন-নিয়মিত বাহিনী ও অনিয়মিত গণবাহিনী। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় নিয়মিত বাহিনী, আর ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হয় গেরিলা বাহিনী।

 

এই কৌশলই মুক্তিযুদ্ধকে একদিকে প্রথাগত যুদ্ধ, অন্যদিকে গেরিলা আক্রমণের মাধ্যমে শক্তিশালী করে তোলে। তার দূরদর্শী নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ ক্রমে সংগঠিত ও কার্যকর হয়ে ওঠে।
দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পেছনে কর্নেল এমএজি ওসমানীর অবদান অনস্বীকার্য।
একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা থেকে জাতির সশস্ত্র সংগ্রামের সর্বাধিনায়ক হয়ে ওঠার এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয় বরং এটি এক জাতির সংগ্রামের প্রতীক। কর্নেল ওসমানী তাই ইতিহাসে চিরভাস্বর, একজন দূরদর্শী নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় সেনাপতি হিসেবে।

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মিশিগানে কুলাউড়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমিতির পিঠা উৎসব ও ঈদ পূর্ণমিলনী অনুষ্ঠিত

কর্নেল ওসমানী যেভাবে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হয়ে উঠলেন

ইরান কি আমেরিকার জন্য দ্বিতীয় ভিয়েতনাম

আস্থা, অগ্রযাত্রা ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্তে “বাংলা সংবাদ” আটটি সফল বছর পেরিয়ে নবম বর্ষে পদার্পণ

ডানকিন ডোনাটসের ফ্র্যাঞ্চাইজিকে দেড় মিলিয়ন ডলার জরিমানা

নিউইয়র্কে “হোপ নেভার ডাইস” প্রামাণ্যচিত্রের প্রদর্শনী

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রচারিত হবে রাজীদ সিজনের ‘কাদিশ’

নিউইয়র্কে ৩০ লাখের বেশি অভিবাসী সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ

মার্কিন ফার্স্ট লেডির আমন্ত্রণে ওয়াশিংটনে গ্লোবাল সামিটে ভাষণ দিলেন ডা. জুবাইদা রহমান

নতুন আইআরএস নিয়মে কর ফেরত পেতে দেরি, অনেকের অর্থ ‘ফ্রিজ’

১০

যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের অধিকার সীমিত করতে সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্প প্রশাসন

১১

যুক্তরাষ্ট্রে ট্যাক্স রিফান্ড জালিয়াতি মামলায় ৩ ব্যক্তির কারাদণ্ড

১২

নতুন বই নিয়ে মিশিগানে আসছেন জিলবাইডেন

১৩

প্রবীণদের একাকিত্ব ভাঙছে কমিউনিটি উদ্যোগ ডেট্রয়েটের ব্রাইটমোর পাড়ায় নতুন করে গড়ে উঠছে সামাজিক সংযোগ

১৪

কাকতাড়ুয়া: খড় কাপড়ে মোড়া এক নীরব পাহারাদার

১৫

আইভিএম গবেষণায় বাংলাদেশি চিকিৎসকের সাফল্য

১৬

জুড়ীতে হলুদ তরমুজ চাষে অভাবনীয় সাফল্য তরুণদের কৃষিতে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছেন উদ্যোক্তা খোর্শেদ আলম

১৭

মার্কিন সেনাবাহিনীর জন্য ড্রোনে অ্যামাজন–পেন্টাগন চুক্তি

১৮

ক্রিপ্টো লেনদেনে ড্রোন সংগ্রহ রাশিয়া-ইরানপন্থীদের

১৯

ইরান ইস্যুতে চাপ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজারে

২০