ভিয়েতনামের বেন থ্রে শহরটি ১৯৬৮ সালে যখন আমেরিকান বাহিনী নাপাম বোমায় পুড়িয়ে দেয়, তখন এক মার্কিন মেজর বলেছিলেন, ‘শহরটিকে রক্ষার জন্যই ধ্বংস করা দরকার ছিল।’ শুধু বেন থ্রে নয়; দুই দশকের যুদ্ধে এমন শত শত গ্রাম-শহর মার্কিন বাহিনী নাপাম বোমায় পুড়িয়ে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের কালিমা মেখেই তাদের ভিয়েতনাম ছাড়তে হয়। চলমান ইরান যুদ্ধের গতি-প্রকৃতিদৃষ্টে মনে হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পূর্বসূরিদের মতোই ধ্বংসের নেশায় ভিয়েতনাম পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, আমেরিকার মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে খুব বেশি দিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে না ইরান। নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে। ইতোমধ্যে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশই মার্কিন-ইসরায়েলি আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন। তারপরও তেহরান শুধু যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে না; ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে নাকানিচুবানি খাইয়ে চলেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের কাছে সহায়তা চেয়েও তেমন সাড়া পাচ্ছে না। বরং স্পেন, ইতালিসহ কিছু মিত্র দেশ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেু হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কথা তারা আপাতত ভাবছে না। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎস এক কদম এগিয়ে বলেছেনু জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটোর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া জার্মানির সংবিধান অনুযায়ী এমন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় ট্রাম্প মিত্রদের সতর্ক করে দিয়েছেনু মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সহায়তা না দিলে সামরিক জোট ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে অনেকেই ইরান যুদ্ধে ভিয়েতনামের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। ষাটের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়ানোর সময়ও সমরবিদ্যার প্রায় সব দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ছিল শ্রেষ্ঠতর। তারপরও ভিয়েতকং ও উত্তর ভিয়েতনাম বাহিনীর কাছে তাদের নাকানিচুবানি খেতে হয়েছে। ইরান তো সামরিক দিক থেকে ভিয়েতনামের চেয়েও শক্তিশালী।
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প সম্ভবত ভেবেছিলেন, ভেনেজুয়েলার মতো প্রধান নেতৃত্বকে সরিয়ে দিতে পারলেই ইরানের ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়া সহজ হয়ে যাবে। গত তিন সপ্তাহে তেহরানের প্রশাসন সম্বন্ধে তাঁর সব ধারণাই ভুল প্রমাণিত। ভেনেজুয়েলায় ডেলসি রদ্রিগেজের মতো একজন মাদুরোর সময়েও ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তেল ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন। ধারণা করা হয়, সিআইএপ্রধান জন রেটক্লিফের সঙ্গে তাঁর দহরমমহরমও ছিল। ফলে মাদুরোকে সস্ত্রীক তুলে নেওয়ার পরও দেশটিতে প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া হয়নি। ইরানের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ৪৭ বছর ধরে দেশটির নেতৃত্ব এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে ব্যক্তিনির্ভর না হয়। ভেনেজুয়েলার ডেলসির মতো ‘বিকল্প দ্বিতীয়’ ব্যক্তি এখানে নেই। তাই প্রধান নেতা খামেনিকে হত্যার পরও ইরানের নেতৃত্বে ফাটল ধরাতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র।
অস্বীকারের অবকাশ নেই, যুদ্ধ শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তুলনায় অনেক গুণ এগিয়ে। কিন্তু এই যুদ্ধে ট্রাম্পের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। এ যেন যুদ্ধের জন্যই যুদ্ধ। যদিও শুরুতে ট্রাম্প অনেকবার বলেছেন, ইরানে শাসক পরিবর্তনই তাঁর লক্ষ্য। এও বলেছিলেন, যুদ্ধটা বড়জোর কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। সব হিসাবনিকাশকে ভুল প্রমাণিত করে ইরান শুধু যুদ্ধকে চতুর্থ সপ্তাহে টেনেই নিয়ে আসেনি; যুদ্ধমঞ্চকেও আনুভূমিকভাবে গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যেখানেই মার্কিন স্থাপনা রয়েছে, ইরান সেখানেই হামলা করছে।
ওদিকে, সিআইএ ইতোমধ্যে ইরানে কুর্দি বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছে। অন্যদিকে, মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবর, প্রায় আড়াই হাজার যোদ্ধার একটি মেরিন ইউনিট জাপান থেকে মধ্যপ্রাচ্যে রওনা হয়েছে, যা কয়েক দিনের মধ্যে পৌঁছে যাবে। ক্যালিফোর্নিয়া থেকেও একই আকারের আরেকটি মেরিন বাহিনী এপ্রিলে পৌঁছানোর কথা। সামরিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত খারগ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা করছে। উল্লেখ্য, আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ক্ষুদ্র দ্বীপে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল অবস্থিত।
মার্কিন মেরিন বাহিনী পরিকল্পনার খবরে গত ২১ মার্চ ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, খারগ দ্বীপে হামলা চালানো হলে ইরান লোহিত সাগরেও ‘অনিরাপদ’ পরিবেশ সৃষ্টি করবে। পুরো অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ‘আগুন ধরিয়ে দেবে’। সম্প্রতি স্কাই নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সাঈদ খাতিবজাদ বলেছেন, ইরানে স্থলযোদ্ধা মোতায়েন করলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটা ভিয়েতনাম পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
এ অবস্থায় ২১ মার্চ ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে হুমকি দিয়েছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে মার্কিন বাহিনী ইরানের বিদ্যুৎ জ্বালানিকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেবে। জবাবে ইরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি ইরানের জ্বালানিকেন্দ্রে হামলা করে, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ‘চিরতরে ধ্বংস’ করে দেওয়া হবে। ৪৮ ঘণ্টা যেতে না যেতেই ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে তাঁর ‘ভালো’ ও ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আগামী পাঁচ দিনের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা স্থগিত করা হয়েছে। যদিও ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে ইরান। ২৩ মার্চ ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ জানিয়েছেন, ‘অর্থ বাজার ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে চোরাবালিতে আটকে পড়েছে তা থেকে বাঁচতে ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে।’
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে চলমান সামরিক অভিযানের জন্য কংগ্রেসের কাছে দুইশ বিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিল চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ধরনের পদক্ষেপ ইঙ্গিত দেয়, দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল লড়াইয়ের জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছে হোয়াইট হাউস। দীর্ঘস্থায়ী বা স্বল্পস্থায়ী যা-ই হোক, অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান, ইরান যুদ্ধ এমন পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা আমেরিকার জন্য খুব আকর্ষণীয় নাও হতে পারে। ঠিক যেমনটি ঘটেছিল ভিয়েতনামে পাঁচ দশক আগে।
মন্তব্য করুন