ইরশাদ জাহান চৌধুরী
৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:৩৬ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ইরান সংকট: মুক্তি বনাম মালিকানা বদলের অন্তহীন ফাঁদ

ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি এবং তথাকথিত ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর সম্ভাবনা নিয়ে যে উম্মাদনা তৈরি হয়েছে, তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভূ-রাজনৈতিক জটিলতাগুলো নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কেবল ‘সামাজিক প্রগতি বনাম বর্বর রক্ষণশীলতা’—এই সরল সমীকরণে যারা ইরানের অস্থিরতাকে পাঠ করছেন, তারা সম্ভবত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এবং সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের গভীরতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরানের এই সংকটে উল্লসিত হওয়ার সুযোগ কম, বরং গভীর উদ্বেগের কারণ রয়েছে।

 

​ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইরানের সাথে পশ্চিমা শক্তির দ্বন্দ্বের মূলে কখনোই ‘গণতন্ত্র’ বা ‘মানবাধিকার’ ছিল না; বরং তা ছিল সম্পদ এবং আধিপত্যের লড়াই। ১৯৫৩ সালের দিকে ফিরে তাকালে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। তৎকালীন জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক যখন ইরানের তেল সম্পদ জাতীয়করণ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তখন ব্রিটিশ ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ মিলে এক ক্যু-এর মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। সেখানে বসানো হয়েছিল পশ্চিমা অনুগত শাহকে। সেই সময়ও মোসাদ্দেককে ‘অগণতান্ত্রিক’ তকমা দিয়ে শাহের স্বৈরাচারকে ‘আধুনিকায়ন’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। বর্তমানের প্রেক্ষাপট সেই পুরনো স্ক্রিপ্টেরই একটি ডিজিটাল সংস্করণ মাত্র।

 

​ইরানের সাধারণ মানুষ আজ এক ভয়াবহ দ্বিমুখী সংকটের মুখে। একদিকে রয়েছে প্রি-মডার্ন মোল্লাতন্ত্রের কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধ এবং অভ্যন্তরীণ রুদ্ধশ্বাস পরিবেশ, যা জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে দমন করে রেখেছে। অন্যদিকে ওত পেতে আছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের থাবা। এই দুই প্রান্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ইরানের জনগণের জন্য সহজ কোনো পরিত্রাণের পথ খোলা নেই। প্রশ্নটা হলো, মোল্লাতন্ত্র সরালেই কি সেখানে সিভিল লিবার্টি বা নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে? লিবিয়া, ইরাক বা অতি সাম্প্রতিক সিরিয়ার উদাহরণ আমাদের সেই ভরসা দেয় না। বরং আমরা দেখেছি, পশ্চিমা মদতপুষ্ট রেজিম চেঞ্জ শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনে না।

 

​বিশেষ করে সিরিয়ার দিকে তাকালে পশ্চিমা লিবারেলদের দ্বিচারিতা প্রকট হয়ে ওঠে। সিরিয়ায় যখন সাবেক আল-কায়েদা অপারেটিভদের বিজয়কে ‘জনগণের বিজয়’ বলে উদযাপন করা হয়, তখন বোঝা যায় তাদের মূল লক্ষ্য গণতন্ত্র নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট অক্ষকে ভেঙে দেওয়া। ইরানে এই মুহূর্তে সরকার পতনের যে বিজয়োল্লাস দেখা যাচ্ছে, তার প্রধান কারণ হলো ফিলিস্তিন ইস্যু এবং মার্কিন ইউনিপোলার হেজিমনি বা একমেরুকেন্দ্রিক প্রভাব টিকিয়ে রাখার শেষ মরিয়া চেষ্টা। ইরান এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি আধিপত্যের পথে প্রধানতম বাধা। ফলে এই বাধা সরিয়ে দিতে পারলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর জন্য পুরো অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ কুক্ষিগত করা সহজ হবে।

 

​ইরানের জনগণের ক্ষোভ যৌক্তিক হতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষোভকে যখন বাইরের শক্তিগুলো নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে হাইজ্যাক করে নেয়, তখন তা আর মুক্তি আন্দোলনের স্তরে থাকে না। যারা একে স্রেফ প্রগতিশীলতার লড়াই হিসেবে দেখছেন, তাদের বোঝা উচিত যে সাম্রাজ্যবাদের কোনো নৈতিক অবস্থান নেই। তাদের কাছে গণতন্ত্র কেবল তখনই কাম্য, যখন তা তাদের তল্পিবাহক হয়। অন্যথায় সিরিয়া বা ইরাকের মতো ধ্বংসস্তূপ উপহার দিতে তারা দ্বিধা করে না।

 

​পরিশেষে বলা যায়, ইরানের সংকটটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একদিকে অভ্যন্তরীণ শাসনের ব্যর্থতা আর অন্যদিকে বিশ্ব মোড়লদের আধিপত্য বিস্তারের এক মরণপণ লড়াই। এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ইরান যদি বিদেশি হস্তক্ষেপে কোনো নতুন শাসনের অধীনে যায়, তবে তা হয়তো মোড়ক পাল্টাবে কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আনবে না। প্রকৃত মুক্তি তখনই সম্ভব যখন তা কোনো বিদেশি প্রেসক্রিপশন ছাড়া ভেতর থেকে আসবে। নতুবা এক কারাগার থেকে বেরিয়ে অন্য এক আধুনিক ও কর্পোরেট কারাগারে বন্দি হওয়াই হবে ইরানের জনগণের ভবিতব্য।

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নিয়ম

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি: ২২ অভিবাসীর মৃত্যু, উদ্ধার ২১ বাংলাদেশি

চাঁদে যাওয়ার পথে শেষ ধাপে নাসার আর্টেমিস দল

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবায় অনিয়ম-জালিয়াতির অভিযোগ

ইরান সংঘাতের শেষ কবে, জানালেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বিমানবন্দর নিরাপত্তায় আইস মোতায়েনের ঘোষণা ট্রাম্পের

ট্রান্সফার শিক্ষার্থীদের জন্য দুই বছর ফ্রি টিউশন দিচ্ছে ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটি

বৈশ্বিক দাসত্ব ও শোষন নির্মূলে জোরালো জোরালো আহবান জানাল বাংলাদেশ

বিএনপি পরিবার মিশিগান এর উদ্যোগে অ্যাডভোকেট এটিএম ফয়েজকে সংবর্ধনা

বর্ণবাদ নির্মূলে বৈশ্বিক ঐক্য জোরদার ও অনলাইনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রতিরোধে আন্ত: সংলাপের আহবান জানাল বাংলাদেশ

১০

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান, নিউইয়র্ক সহ বিভিন্ন রাজ্যে আনন্দ-চিত্তে ঈদুল ফিতর উদযাপন করলো প্রবাসী বাংলাদেশীরা

১১

বাংলাদেশিদের ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সতর্কবার্তা

১২

মিশিগানে বাংলাদেশী স্টুডেন্ট কমিউনিটির সংবাদ সম্মেলন অনুষ্টিত

১৩

বিশ্বকাপ টিকিটের উচ্চমূল্য, ফিফার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও মামলা

১৪

ইরান যুদ্ধের দায় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ওপর চাপালেন ট্রাম্প

১৫

ঈদের চতুর্থ দিনেও মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতে পর্যটকদের ঢল

১৬

সিলেটের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে ঈদ শুভেচ্ছা জানালেন কাউন্সিলর প্রার্থী মারজান হোসেন

১৭

ঈদে বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কবার্তা দিল যুক্তরাষ্ট্র

১৮

সেনেগালের শিরোপা বাতিল, চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা মরক্কো

১৯

বিশ্বব্যাপী সব মার্কিন দূতাবাসে নিরাপত্তা পর্যালোচনার নির্দেশ ওয়াশিংটনের

২০