মিশিগান অঙ্গরাজ্যের হ্যামট্রামিক শহরে চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা প্রেসকট, সোবাস্কি ও বাংলা টাউনে পরপর কয়েকটি চুরি, ছিনতাই ও সহিংস ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
সম্প্রতি হ্যামট্রামিকের প্রেসকট এলাকার একটি বাসভবনে রাতে পাঁচ কিশোরের একটি দল চুরির চেষ্টা চালায়। ঘটনাটি ধরা পড়ে বাড়ির সিসি টিভি ক্যামেরায়। ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১২টার দিকে মুখোশ পরিহিত তিনজনসহ মোট পাঁচজন কিশোর বাড়ির আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। তাদের হাতে ভারি অস্ত্রও ছিল। তারা প্রথমে বাসার স্ট্রং উইন্ডোর একটি পার্ট খুলে ফেলে এবং জানালার নিরাপত্তা নেট সরিয়ে দেয়। এরপর জানালা খুলে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করে। ভিতরে থাকা মালিক শব্দ শুনে জানতে চান, “কে এখানে? তোমরা কারা?” প্রশ্ন শুনেই চোরেরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। পুলিশে খবর দিলে দ্রুত একটি টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিস্তারিত তথ্য নেয় এবং সিসি টিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে দ্রুত তদন্তের আশ্বাস দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব ঘটনার পেছনে হ্যামট্রামিক ও ডেট্রয়েটের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা কিশোর গ্যাং জড়িত। কয়েকদিন আগেই সোবাস্কি স্ট্রিটে এক বাঙালি পরিবারের বাড়িতে ঢুকে অস্ত্রের মুখে ২৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও ১৩ হাজার ডলার লুটে নেয় একদল দুর্বৃত্ত। দিনের আলোয় বা সন্ধ্যার পরপরই বাড়ির গ্যারেজ, বারান্দা বা গাড়ির ভেতর থেকে মূল্যবান জিনিস চুরি যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। কেউ কেউ সকালে গাড়ির জানালায় ভাঙচুরের চিহ্ন পেয়ে হতবাক হচ্ছেন।
বাংলা টাউনের জোসেফ কামপাউ স্ট্রিট সংলগ্ন এক জুয়েলারি দোকানের সামনে এক বাঙালি ক্রেতার গলায় থাকা রুপার চেইন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। ছিনতাইকারীরা অস্ত্রের মুখে আরও একজনের পার্স ছিনিয়ে নেয় এবং কয়েকজনকে শারীরিকভাবে আঘাত করে। পুলিশ আধা ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে, যাদের বিরুদ্ধে আগেও একাধিক অভিযোগ ছিল। এ ঘটনায় বাংলাদেশি কমিউনিটিতে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
ডেট্রয়েটের বাংলা টাউন পার্কেও সম্প্রতি রাতে গুলি চালনার ঘটনায় একজন নিহত হন এবং কয়েকজন আহত হন। স্থানীয়রা দাবি করেন, পার্কটি এখন আর নিরাপদ নয়। সন্ধ্যার পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পার্কে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঘটনার পর অনেক পরিবার শিশুদের বাইরে খেলতে দিতে ভয় পাচ্ছেন।
এছাড়া, বাংলা টাউনের এক ইসলামিক সেন্টারে দানবাক্স চুরি যাওয়ার ঘটনায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মর্মাহত হয়েছেন। তাদের মতে, এসব ঘটনা শুধু নিরাপত্তাহীনতাই নয়, বরং সম্প্রদায়ের ওপর সরাসরি আঘাত। বিভিন্ন ঘটনার পর স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন জনগণকে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দিয়েছে। বাড়ির বাইরে পর্যাপ্ত আলো রাখার, সিসি টিভি স্থাপন ও সন্দেহজনক কাউকে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে ৯১১ নম্বরে ফোন করতে বলেছে। তবে বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুলিশের সাড়া পেতে অনেক সময় দেরি হয়, যার ফলে অপরাধীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পুলিশি টহল জোরদার হলেও অপরাধ কমছে না বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন।
বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতারা বলেছেন, এসব ঘটনার বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। নিজেদের এলাকা সুরক্ষিত রাখতে ব্লক ক্লাব গঠন, প্রতিবেশী পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। পাশাপাশি তারা পুলিশের কাছে দাবি জানিয়েছেন, বাংলা টাউনে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে অপরাধ দমন করতে হবে।
হ্যামট্রামিক ও ডেট্রয়েটের বাঙালি কমিউনিটি একসময় যেভাবে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করত, সেই পরিবেশ এখন হুমকির মুখে। তারা চান, পুলিশ ও নগর প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে এলাকাগুলো আবার নিরাপদ হোক, যেখানে তারা রাতেও নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারেন, সন্তানেরা পার্কে খেলতে পারে, ব্যবসায়ীরা নিশ্চিন্তে দোকান চালাতে পারেন।
মন্তব্য করুন