বাংলা সংবাদ, ধর্মচিন্তা ডেস্ক
৯ মার্চ ২০২৬, ১০:৩০ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

রমজানে যেভাবে কাটত নবীজির দিনকাল

রমজান শুরু হওয়ার আগ থেকে নবীজি রমজানের প্রস্তুতি নিতেন। তিনি সর্বদা নামাজ, দান-সদকা, কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া, জিকির ও কদর রাতের সন্ধানে ব্যস্ত থাকতেন। রমজানের শেষ দশকে নিজের পরিবারকে ইবাদতের জন্য জাগিয়ে দিতেন।

 

সাহ্রি রমজানে নবীজি (সা.) দিনের বেলা রোজা থাকতেন। তিনি সাধারণত তার কোনো এক স্ত্রীর সঙ্গে সাহ্রি করতেন। সাহ্রিতে অল্প খেতেন, অধিকাংশ সময় খেজুর ও অল্প খাবার গ্রহণ করতেন। শেষে পানি পান করতেন। কখনও কখনও কোনো সাহাবির সঙ্গে সাহ্রি করতেন। সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিতের সঙ্গে সাহ্রির খাওয়ার বর্ণনা হাদিসে পাওয়া যায়।
সাহ্রি শেষে তিনি ফজরের নামাজ আদায় করতেন। সাহ্রি ও ফজরের নামাজের মধ্যে প্রায় ৫০টি কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করার মতো সময়ের ব্যবধান থাকত। সাহ্রির পর ফজরের সুন্নাত নামাজ আদায় করতেন এবং তার রুমে অপেক্ষা করতেন।

 

বেলাল (রা.) জামাতের ইকামত দিলে তিনি তার হুজরা থেকে বের হয়ে ফজরের নামাজের ইমামতি করতেন। সূর্যোদয় পর্যন্ত ইবাদত রমজানে নবীজি (সা.) সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে বসে আল্লাহর জিকির করতেন। প্রায় ২০ মিনিট বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন। তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি জামাআতের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করবে, সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে বসে আল্লাহর জিকির করবে এবং তারপর দুই রাকাত নামাজ আদায় করবে, তার জন্য হজ্জ ও ওমরাহর পরিপূর্ণ সাওয়াব হবে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৫৮৬) স্ত্রীদের সহযোগিতা রমজানে তিনি দিনের বেলা তার স্ত্রীদের সঙ্গে ঘরে থাকতেন, ঘরের কাজে সহযোগিতা করতেন, তাদের সঙ্গে স্নেহ-ভালোবাসা দেখাতেন। এমনকি তিনি কখনো কখনো রোজা অবস্থায় তাঁর স্ত্রীদের চুমু খেতেন।

 

আয়িশা (রা.) বলেন, তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে তোমাদের চেয়ে বেশি সক্ষম ছিলেন। (সহিহ ইফতার মাগরিবের পূর্বে নবীজি (সা.) তাসবিহ ও কিছু দোয়া পাঠ করতেন। মাগরিবের আজান হলে তিনি কোনো স্ত্রীর মাধ্যমে ইফতারের ব্যবস্থা করতেন। নবীজি ইফতারে তাজা খেজুর খেতে ভালবাসতেন। তাজা খেজুর না পাওয়া গেলে শুকনো খেজুর খেতেন। খেজুর না থাকলে তিনি পানি দিয়ে ইফতার করতেন।

 

আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, “নবীজি মাগরিবের নামাজের আগে কিছু তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। তাজা খেজুর না থাকলে শুকনা খেজুর, তা না থাকলে পানি পান করতেন।”(সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৬৯৬)

 

ইফতারের পর তিনি মসজিদে মাগরিবের ফরজ নামাজ আদায় করতেন। নামাজ শেষে ঘরে ফিরে সুন্নাত নামাজ পড়তেন এবং স্ত্রীদের সঙ্গ দিতেন। ইশার আগে ঘরে ইশা-পূর্ব সুন্নত আদায় করতেন, এরপর ইশার নামাজের জন্য বেরিয়ে যেতেন এবং নামাজের ইমামতি করতেন।

 

তারাবি ও বিতর
নবীজি সাহাবিদের নিয়ে মসজিদে তিনবার তারাবি নামাজ আদায় করেছেন। তারাবি নামাজ ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তার চেয়ে অধিকবার পড়েন নি। এরপর ঘরে ফিরে দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ আদায় করতেন। নামাজ শেষে ঘুমিয়ে পড়তেন এবং ঘুম থেকে উঠে বিতির নামাজ আদায় করতেন। আয়িশা (রা.) বলেন, “আল্লাহর রাসুল, বিতর নামাজের আগে আপনি কি ঘুমান?” নবীজি (সা.) বললেন, “আয়িশা, উভয় চোখ ঘুমায়, কিন্তু আমার অন্তর ঘুমায় না।”(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৬)

 

কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া
রমজানে তিনি নিজেকে কোরআন তেলাওয়াত, যিকির, সদকা ও রোজায় ব্যস্ত রাখতেন।
রমজান মাসের শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক রাত্রে জিবরাঈল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতেন এবং তিনি তাঁকে কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৬৩৫)
দান-সদকা তিনি অধিক পরিমাণ দান করতেন, বিশেষ করে রমজানে। সাহাবিরা তাকে প্রবাহমান বাতাসের মতো উদার বলেছিলেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, নবীজি সর্বাপেক্ষা দানশীল ছিলেন। তাঁর বদান্যতা বেড়ে যেতো রমজানের পবিত্র দিনে যখন জিবরাঈল তাঁর সাক্ষাতে আসতেন। জিবরাঈল (আ.) প্রতিরাতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করে কোরআন দাওর করতেন। নবীজি কল্যাণ বিতরণে প্রবাহিত বায়ু অপেক্ষাও অধিক দানশীল ছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩০২)

 

এতেকাফ ও লাইলাতুল কদর
রমজানের শেষ দশকে তিনি মসজিদে এতেকাফ করতেন। জীবনের শেষ বছরে ২০ দিন পর্যন্ত এতেকাফ করেছিলেন। তিনি বিশেষভাবে কদরের রাত পাওয়ার সন্ধানে ইবাদতে করতেন।
তিনি বলেছেন, “তোমরা শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৯৩)
শেষ দশকে তিনি পরিবারকে জাগিয়ে রাখতেন, যাতে তারা ইবাদতে ব্যস্ত থাকে। হজরত আলি (রা.) বলেন, “আল্লাহর রাসুল তাঁর পরিবারের লোকদের রমজানের শেষ দশকে জাগাতেন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৭৯৫)

 

নবীজি রমজানে অধিক পরিমাণে দোয়া করতেন। আয়েশা (রা.) বললেন, আল্লাহর রাসুল, বলুন তো, যদি আমি কদর রাত পেয়ে যাই, তাহলে কী দোয়া করব?
তিনি বললেন, তুমি বলবে, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা‘ফু ‘আন্নি। অর্থাৎ, আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল ক্ষমাকে ভালোবাসেন। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করুন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৮৫০)

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বৃহত্তর চট্টগ্রাম সমিতি মিশিগান এর বর্ণাঢ্য ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্টিত

কমলগঞ্জে ফিল্মি কায়দায় নারীকে অপহরণের চেষ্টা

বিশ্ববাজারে তেলের দামে উর্ধ্বগতি, ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলার ছাড়াল

দুবাইয়ে বোমা হামলায় নিহত বড়লেখার প্রবাসী সালেহ আহমদকে দাফন, গ্রামে শোকের মাতম

ইতিহাসের প্রান্তরে অমলিন পদচিহ্ন: জর্জ ওয়াশিংটন

বাংলাদেশে এ বছর ফিতরা কত?

তাহাজ্জুদ নামাজ নবীজি (সা.) এর অতি প্রিয় আমল

জাকাত কারা পাবেন আর কারা পাবেন না?

তুরস্কে নিরাপত্তা শঙ্কা, নাগরিকদের দেশ ছাড়ার আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের

রমজানে যেভাবে কাটত নবীজির দিনকাল

১০

নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র

১১

দাপুটে পারফরম্যান্সে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারত

১২

বাঙালি কমিউনিটির বিস্তার, সাফল্য এবং সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ সংগঠন বাড়ছে, ঐক্য কি বাড়ছে?

১৩

নতুন অভিবাসীদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে ডেট্রয়েটের বাংলাটাউন

১৪

মিশিগানে জৈন্তাপুর ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের দোয়া ও ইফতার মাহফিল সম্পন্ন

১৫

শহীদ ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল ভারতে গ্রেপ্তার

১৬

‘শিগগিরই কিউবার পতন’: ট্রাম্পের মন্তব্যে বিতর্ক

১৭

বড়লেখায় নিসচা’র আয়োজনে দোয়া ও ইফতার মাহফিল মিলনমেলায় পরিণত

১৮

উত্তেজনার জেরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরেছেন ২০ হাজার মার্কিন নাগরিক: স্টেট ডিপার্টমেন্ট

১৯

হোমল্যান্ড সিকিউরিটিতে নেতৃত্ব পরিবর্তন: নয়েমের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন মুলিন

২০