মিশিগান সংবাদ

মিশিগানে গ্রাহক সেবার মান উন্নয়নে কাজ করছে সোনালী এক্সচেঞ্জ

একান্ত সাক্ষাৎকারে সোনালী এক্সচেঞ্জের সিইও দেবশ্রী মিত্র

প্রবাসীদের টাকা নিরাপদে দেশে পাঠাতে নিরলস কাজ করছে সোনালী এক্সচেঞ্জ। আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটে শাখা বিস্তারের পাশাপাশি গ্রাহক সেবার মান উন্নয়নে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। সোনালী এক্সচেঞ্জ’র কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির সিইও দেবশ্রী মিত্র। বাংলা সংবাদ’র পাঠকদের জন্য পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।

আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি বাংলা সংবাদ-এ। আপনি আপনার পরিচয় এবং কাজ সম্পর্কে কিছু বলুন।
◊◊ আমার নাম দেবশ্রী মিত্র। আমি সোনালী এক্সচেঞ্জের সিইও হিসেবে কাজ করছি ২০১৯-এর শেষ দিক থেকে। তার আগে আমি সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে কাজ করেছি। ১৯৯৮ সালে আমি সোনালী ব্যাংকে জয়েন করি সিনিয়র অফিসার হিসেবে। তারপর বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে এখন এখানে সোনালী এক্সচেঞ্জের সিইও হিসেবে কর্মরত আছি। আমি সোনালী ব্যাংকের একজন নিয়মিত কর্মী।

সোনালী ব্যাংকের সাথে আপনার যাত্রাটা কিভাবে শুরু হয়?
◊◊ সোনালী ব্যাংকের সাথে আমার যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। আপনারা জানেন, BRC ( Bankers’ Recruitment Committee) তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করতো। সেই প্রক্রিয়ায় আমি ৯৮ সালে সেনালী ব্যাংকে যোগদান করি।

আপনার লেখাপড়ার বিষয়ে জানতে চাই।
◊◊ আমি মার্কেটিং-এ পড়াশুনা করেছি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে। মার্কেটিং-এ মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছি। আমার বর্তমান কাজে মার্কেটিংও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি অংশ।

আপনার ব্যাচেলর ও স্কুল জীবন সম্পর্কে বলুন।
◊◊ স্কুল জীবন আমার খানিকটা বৈচিত্রের মধ্যে কেটেছে। বাবার চাকুরীর সুবাদে আমার স্কুলটা শুরু হয় চট্টগ্রাম থেকে। পতেঙ্গা মেরিন একাডেমীতে বাবা প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেই সুবাদে চট্টগ্রামে আমার জন্ম এবং স্কুল জীবন শুরু হয়, আমি চিটাগাং শাহীন স্কুলে পড়াশুনা করেছি। পরবর্তীতে বাবার রিটায়ারমেন্টের পর আমরা কুমিল্লা চলে আসি। কুমিল্লা আমাদের বাড়ি। সেখান থেকে আমি এস, এস, সি এবং এইচ, এস, সি পাস করি। পরবর্তীতে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মার্কেটিং-এ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করি।

আমেরিকার জীবন শুরুর বিষয়টা জানতে চাই। কিভাবে আপনি আমেরিকায় আসলেন। এটি কি সোনালী এক্সচেঞ্জ থেকে সিলেক্ট করা হলো? আমাদের পাঠকের জন্য পুরো প্রসেসটা যদি জানাতেন।
◊◊ সোনালী এক্সচেঞ্জ আসলে সোনালী ব্যাংকের একটা প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ সোনালী এক্সচেঞ্জ-এর মালিক হচ্ছে সোনালী ব্যাংক। সেই হিসেবে আমি নিজেও সোনালী ব্যাংকের একজন নিয়মিত কর্মকর্তা। ওখানে সিলেকশনের একটি প্রসিডিওর আছে। সেই মোতাবেক সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমাকে সিলেক্ট করে। এখানে আমার পোস্টিং হয়। আমি এখানে আসি, আসার পর পরই করোনা শুরু হয়। করোনাকালীন সময়ে আমেরিকা সবচাইতে ডেঞ্জারজোন ছিলো। নিউইয়র্কে যখন লকডাউন শুরু হয় তখন এখানকার সকল প্রতিষ্ঠানই বাধ্যতামূলক বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের প্রতিষ্ঠানটিও মার্চের ২১/২২ তারিখ থেকে পুরো এপ্রিল মাস বন্ধ ছিলো। মে মাসে রমজান শুরু হয় আমরা ২ রমজান থেকে অফিস কার্যক্রম শুরু করি। তখনও নিউইয়র্কে শত শত লোক প্রতিদিন করোনায় মারা যাচ্ছিল। আমরা কভিডের সকল নিয়ম মেনে অফিস চালু করি এবং সৃষ্টিকর্তার রহমত যে আমরা কেউ তখন করোনায় আক্রান্ত হইনি। যদিও পরবর্তীকালে বিধিনিষেধ শিথিল হবার পর আমাদের কেউ কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু তীব্রতার সময় আমরা সবাই সুস্থ ছিলাম এবং আমরা গ্রাহকদেরকে সেবা দিতে পেরেছিলাম। এটা আমি মনে করি আমাদের জন্য দারুন একটি এচিভমেন্ট।

প্রথম এসেই আপনি একটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেন। কিভাবে মোকাবেলা করলেন?
◊◊ চ্যালেঞ্জ আসলে বিশ্বব্যাপীই ছিলো। একটু কম একটু বেশি। তবে নিউইয়র্কে সবচেয়ে বেশি ছিলো। আমরা এই ব্যাপারে গ্রাহকদের সাথে সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করেছি। করোনা প্রতিরোধে যেসকল পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে সরকার বিধি-নিষেধ জারি করেছে আমরা সেগুলো যথাযথভাবে পালন করেছি। গ্রাহকদেরও এই নিয়ম মানতে আমরা উৎসাহিত করতাম। এতে আমরা সবাই সেভ হয়েছি। কাজ করেছি। ওই সময়ে ২০২১ সালে সোনালী এক্সচেঞ্জের যে ব্যবসা ছিল সেটা সর্বকালের সর্বোচ্চ। আমরা যে কঠিন সময়ে গ্রাহককে সার্ভিস দিয়েছি এইটা তারই একটা প্রমাণ। গ্রাহকরা যে আমাদেরকে ভালোবাসে সেটারও একটা প্রমাণ বলে আমি মনে করি।

সোনালী এক্সচেঞ্জ কত সালে আমেরিকাতে চালু হয় এবং কতগুলো ব্রাঞ্চ আছে?
◊◊ সোনালী এক্সচেঞ্জ ১৯৯৪ সাল থেকে আমেরিকায় কার্যক্রম শুরু করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে সোনালী ব্যাংকের উদ্যোগে নিউইয়র্ক স্টেট গভর্নমেন্ট থেকে আমরা লাইসেন্স সংগ্রহ করি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় রেজিস্টেশন এবং অনুমোদন গ্রহন করি। আমেরিকায় আমাদের মত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে প্রতিটা স্টেটে পৃথক লাইসেন্স লাগে। বর্তমানে নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, মেরিল্যান্ড, ফ্লোরিডা, মিশিগান, জর্জিয়া-এই ছটি স্টেটে আমাদের লাইসেন্স আছে। এগুলোতে আমরা মূলত রেমিটেন্স-এর কাজ করি।

নিউইয়র্কে আপনাদের শাখা কত গুলা?
◊◊ নিউইয়র্কে আমাদের ৭টি শাখা আছে। জর্জিয়ার আটলান্টাতে ১টি, মিশিগানের হ্যামট্রামেকে ১টি এবং নিউ জার্সির পেটারসনে ১টি। এই মুহূর্তে আমাদের মেরিল্যান্ড আর ফ্লোরিডাতে কোন শাখা নাই।

সোনালী এক্সচেঞ্জের সিইও দেবশ্রী মিত্র

আমাদের পাঠকদের জন্য আপনাদের মিশিগান শাখা কার্যক্রম সম্পর্কে বলুন।
◊◊ মিশিগানে আমাদের অফিস সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। মিশিগানে বাংলাদেশি কমিউনিটির উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে সেই তুলনায় আমাদের ব্যবসাটা এখানে ততটা বিস্তার লাভ করেনি এবং সাম্প্রতিক কালে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। আমরা আমাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে, তা কাটিয়ে উঠতে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছি। নিশ্চয়ই খুব দ্রুত মিশিগানের গ্রাহকদের আরেকটু ভালো সার্ভিস দিতে আমরা সক্ষম হব।

সোনালী এক্সচেঞ্জ কী শুধু টাকা পাঠানোর সার্ভিস দিয়ে থাকে নাকি এর বাইরেও যেমন চেক ক্যাশিং বা অন্যান্য কোন সেবা আছে?
◊◊ আমরা শুধুমাত্র বাংলাদেশেই টাকা পাঠাই। অন্য কোনো সার্ভিস চালু নেই।

এখানে অনেকগুলা এক্সচেইঞ্জার আছে তবে কেন সোনালী এক্সচেঞ্জে একজন গ্রাহক আসবে? আপনাদের বিশেষত্ব কি?
◊◊ আসলে একজন গ্রাহক ফাইনান্সিয়াল ডিলিংস-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন তার ব্যাক্তিগত তথ্যাদির নিরাপত্তাকে। আপনারা জানেন সোনালী এক্সচেঞ্জ হলো বাংলাদেশের সোনালী ব্যাংকের একটি অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান। আমি বিশ্বাস করি এখানকার বাংলাদেশি কমিউনিটি সোনালী ব্যাংক সম্পর্কে ধারণা রাখেন। সোনালী ব্যাংকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হিসাবে এবং ইউ এস এ সরকারের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান হিসাবে আমরা সর্বোচ্চ কমপ্লায়েন্স মেইনটেইন করতে সচেষ্ট। যার ফলে নাম, ফোন নম্বরের মতো বেসিক ডাটার সাথে গ্রাহকের পাঠানো টাকা, কফিডেন্সিয়াল ডাটা, সোস্যাল সিকিউরিটি কার্ড নম্বার, আইডি নম্বারসহ সকল ডাটা নিরাপদে সুরক্ষিত থাকে। এই বিষয়ে আমরা সম্ভাব্য সর্বোচ্চ আশ্বাস দিতে পারি। কেননা আমাদের অফিসে ডেডিকেটেড কর্মকর্তা আছেন যিনি শুধুমাত্র এই সার্ভিসটাই দিয়ে থাকেন। এই সার্ভিসের জন্য তিনি অভিজ্ঞ এবং এখানকার ফেডারেল নিয়ম অনুযায়ী প্রশিক্ষিত। তাই গ্রাহকরা সোনালী এক্সচেঞ্জ থেকে সর্বোচ্চ সেবা এবং পূর্ণ নিরাপত্তা পেয়ে থাকেন।

একজন গ্রাহক একটি একাউন্টের মাধ্যমে আপনাদের যেকোনো শাখা থেকে টাকা পাঠাতে পারবে?
◊◊ জি, আমাদের প্রতিষ্ঠান যে জায়গাতেই থাকুক না কেন সবগুলো সেন্ট্রালি ম্যানেজড এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠান একটি আরেকটির সাথে যুক্ত, সুতরাং মিশিগানে একটা একাউন্ট থাকা মানে নিউয়ার্কে বা নিউজার্সি যে কোন জায়গা থেকে টাকা পাঠাতে পারবেন। তাছাড়া আমাদের অ্যাপস তো আছেই।

সম্প্রতি আপনারা অ্যাপস লঞ্চ করছেন সেই সম্পর্কে বলুন।
◊◊ গ্রাহকদের মাঝে মোবাইলের মাধ্যমে সেবা পৌছে দিতে আমরা অ্যাপস চালু করেছি। কিছুদিন আগে অ্যাপসটি বাংলাদেশের সোনালী ব্যাংক এবং আমাদের যৌথ একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্বোধন করা হয়েছে। এটি অ্যাপল এবং এন্ড্রয়েড দুই ভার্সনেই পাওয়া যাবে। গ্রাহকরা নিজ নিজ মোবাইলে ডাউনলোড করে সেটআপ করে নিবেন। তারপর লগ অন করে সহজেই টাকা পাঠানো যাবে। বর্তমানে মানুষ অনেক ব্যস্ত সময় পার করেন। অনেকেই টাকা পাঠাতে আমাদের অফিসে যাবার সময় বের করতে পারেন না। তারা বাসায়, অফিসে কিংবা যে কোনো স্থান থেকে অ্যাপসের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে পারবেন এবং টাকা গুলো সাথে সাথেই আমাদের সিস্টেমে পৌছে যাবে এবং বাংলাদেশে আপনার বেনিফিসিয়ার একাউন্টে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে ক্রেডিট হয়ে যাবে। এখানে কোন হিউমেন ইন্টারভেনশনই থাকবেনা।

অ্যাপস কিংবা সরাসরি আপনাদের সোনালী এক্সচেঞ্জ অফিসে এসে টাকা পাঠাতে চাইলে কোনো ফি দিতে হয় কি না?
◊◊ না, এই মুহূর্তে অ্যাপস কিংবা সোনালী এক্সচেঞ্জ অফিসে এসে টাকা পাঠাতে কোনো ফি’র প্রয়োজন নেই।

গ্রাহকরা কি লিখে সার্চ দিলে আপনাদের অ্যাপসটি পাবে?
◊◊ অ্যাপল স্টোর কিংবা গুগল প্লে-স্টোর-এ “সোনালী এক্সচেঞ্জ” লিখে সার্চ দিলেই চলে আসবে।

বাংলা সংবাদ-এর পাঠকদের জন্য কিছু বলুন।
◊◊ আমি ধরেই নিচ্ছি বাংলা সংবাদ-এর পাঠক সবাই বাংলাদেশি বা বাংলাদেশি বংশদ্ভূত আমেরিকান অথবা এখনও বাংলাদেশি, সুতরাং সবার কাছে আমার অনুরোধ আপনারা দেশে টাকা পাঠানো জন্য ”সোনালী এক্সচেঞ্জ” ব্যবহার করুন। কেননা এটি একটি বড় প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে সোনালী ব্যাংক। সেই ১৯৭০ সালে থেকেই সেবা দিয়ে আসছে ব্যাংকটি। গেলো কোভিড মহামারির সময়ে যখন বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে সেবা দান সেবা কার্যক্রম বন্ধ ছিল তখন সোনালী ব্যাংক তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিলো। এমনকি মিশিগানের করোনাকালীন সেবা সম্পর্কে ইতোমধ্যে আমি জানিয়েছি। আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন, আমরা আপনার টাকার নিরাপত্তা দিব। আমাদের বিজ্ঞাপনগুলোতে হেল্প লাইনের নাম্বার দেয়া থাকে আপনারা যেকোনো প্রয়োজনে সেখানে যোগাযোগ করবেন, আমরা আপনাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য সর্বদা তৈরি আছি।

আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
◊◊ বাংলা সংবাদকেও ধন্যবাদ, আমার কথাগুলো বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে তুলে ধরার জন্য। এতে করে “সোনালী এক্সচেঞ্জ”-এর সাথে গ্রাহকের সম্পর্কের উন্নতি ঘটবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

Back to top button